
যোগেন চৌধুরী অনেক শিল্পীর মতোই দীর্ঘ শিল্পী জীবন অতিবাহিত করেছেন। কিন্তু ওঁর নিজের মতন করে রোদ-ঝড়-বৃষ্টি পেরিয়ে, নিজের পথ খুঁজে, কম শিল্পীই প্র্যাকটিস করে যেতে পেরেছেন। যোগেন চৌধুরী অতি ধীরে নিজের এক জগৎ গড়ে তুলেছিলেন। যে জগৎ তাঁর একার নয়, বরং আরও পাঁচজন শিল্পীকে নিয়ে। ওঁর সমসাময়িকদের মধ্যে এমন দৃষ্টান্ত কম।
যোগেন চৌধুরী সেই বিদ্বানদের মধ্যে একজন, যিনি আধুনিক ভারতীয় শিল্পকে পরিণত করেছেন। শিল্প সম্পর্কে ওঁর ধারণা, দৃষ্টিভঙ্গি, বোধ, উপলব্ধি যেমন পাল্টেছে, তেমনই তা থেকে ওঁর স্বতঃস্ফূর্ত শৈলী উঠে এসেছে। আবার অনেকাংশে প্রচ্ছন্ন থেকেছে বিচ্ছেদ যন্ত্রণা, ভৌগোলিক বিভাজন, ক্ষয় ইত্যাদি। একটি চিন্তাশীল মস্তিষ্কের ক্ষেত্রে এমন ঘটনা অনিবার্যভাবেই স্বাভাবিক। সৌন্দর্য দর্শন ও অনুভূতিপ্রবণ মন ওঁর শিল্পকে করেছে পরিবর্তন।
আমরা ওঁর কাজকে প্রাথমিকভাবে তিনটে ‘র’ বর্ণের নিশান দিয়ে পড়তে পারি। রেখা, রং ও রূপ। এর মধ্যে জোরালো মোটা রেখার ব্যবহার সকলেই খেয়াল করেন। একইসঙ্গে সরু ও পাতলা লাইনের বুনন সমানভাবে রয়েছে। এই রেখার থেকেও জরুরি রং। অর্থাৎ খেয়াল করতে হবে শিল্পী কী কী রং বেছে নিচ্ছেন এবং ঠিক কোথায় তার ব্যবহার করছেন।

১৯৩৯ সালে বাংলাদেশে জন্মের পর থেকে দেশভাগ, ছিন্নমূল জীবন এসব অতিক্রম করে ১৯৫১ সালে কলকাতায় চলে আসেন। সেই স্মৃতি ও যন্ত্রণা ওঁকে চিরকাল ভাবিয়েছে, তাড়া করে বেরিয়েছে। ১৯৫৫ থেকে ১৯৬০ সাল পর্যন্ত সরকারি চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে, ফরাসি বৃত্তি পেয়ে প্যারিসের ইকোল-দে-বো-আর্টস এ চিত্রকলা অধ্যয়ন করেন। ফলেই একাডেমিক প্র্যাকটিস করে হাত তৈরি করেছেন আগে। তাই এতদিন লড়তে পেরেছেন। এ কথা সত্যি যে ঐ সময়ের প্রায় সকল শিল্পীরই ছিল ট্রেনিং ও কব্জির জোর।
ভাস্কর প্রদোষ দাশগুপ্ত ১৯৫১ সালে অধ্যাপক পদে যোগ দেন সরকারি আর্ট কলেজে। যোগেন চৌধুরী তাঁরই প্রথমদিকের ছাত্রদের একজন। ফলে স্বাভাবিকভাবেই যোগেন চৌধুরীর মধ্যেও প্রথমদিকে সেই অভিব্যক্তিবাদী শৈলীর প্রভাব ছিল প্রকট। পরে অবশ্য সেসব ধারা বদলে যায়।

যোগেন চৌধুরী বলতেই যে সমস্ত ঢিলেঢালা, ঝুলে যাওয়া চামড়ার রেখাবহুল মানুষের ছবি মনে পড়ে, এর আগে দীর্ঘ সঙ্গী ছিল মডেল স্টাডি, এনাটমি নিরীক্ষা, ফোলিয়েজ স্টাডি, নেচার স্টাডি ইত্যাদির অনুশীলন। আমরা ওঁর কাজকে প্রাথমিকভাবে তিনটে ‘র’ বর্ণের নিশান দিয়ে পড়তে পারি। রেখা, রং ও রূপ। এর মধ্যে জোরালো মোটা রেখার ব্যবহার সকলেই খেয়াল করেন। একইসঙ্গে সরু ও পাতলা লাইনের বুনন সমানভাবে রয়েছে। এই রেখার থেকেও জরুরি রং। অর্থাৎ খেয়াল করতে হবে শিল্পী কী কী রং বেছে নিচ্ছেন এবং ঠিক কোথায় তার ব্যবহার করছেন। সাধারণ শখের অপেশাদার শিল্পীরা এমনি এমনি রং লাগালেও, যোগেন চৌধুরী মানের শিল্পীরা এসব কিছু করেন না। প্রতিটি আঁচড়ের কারণ রয়েছে।
দারিদ্রকে অতিক্রম করতে ও দীর্ঘ কাঁটাতারের দাগ মুছতে যোগেন চৌধুরীর সময় লেগেছে। সেখানে অতিরিক্ত রং ও মেটেরিয়ালের ব্যবহার ওঁর কাছের অপচয় ছাড়া কিছু নয়। তাই লিমিটেড কালার প্যালেট হওয়াই স্বাভাবিক। ফলে কম রঙের ব্যয় ও দীর্ঘ কালির রেখা বা দাগ হয়ে ওঠে যোগেন চৌধুরীর স্টাইল স্টেটমেন্ট। কটা দেশি-বিদেশি শিল্পীর লাইন ড্রয়িং গৃহিত, প্রচলিত ও সমাদৃত হয়েছে বলা মুশকিল। যোগেন চৌধুরীই বাঙালির শেষ সেলিব্রেটেড শিল্পী যিনি বাঙালির আটপৌরে শিল্পকে উচ্চতায় পৌঁছে দিতে পেরেছিলেন।

আধুনিক ছবিকে যে ইনকমপ্রিহেন্সিবেল বা দুর্বোধ্য হতেই হবে, এ বিশ্বাস ওঁর ছিল না। ফলেই ওঁর ছবি স্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন হয়েছে। এই সহজ-সরল ছবি যেমন সাধারণ তালিমহীন দর্শকের মনকে জয় করেছে, তেমনই শিল্পপিপাসু মানুষের ভাবনার রসদ জুগিয়েছে। যোগেন চৌধুরী শুধু একজন চিত্রী নন। স্কলার, শিক্ষক, চিন্তক, প্রশাসক এবং পথনির্মাতা।
আরও পড়ুন: মানিদার কথা ও তাঁর শিল্পকাজমানুষ
নিজেকে বিশ্ব দরবারে প্রতিষ্ঠিত করার সঙ্গে সঙ্গে কলাভবনের চাকরির সূত্রে অগণিত ছাত্রদের তৈরি করেছেন। পশ্চিমী আধুনিকতাবাদ ও ভারতীয় শিল্পের যোগ ও ব্যবধান সম্পর্কে চিন্তা করেছেন, লিখেছেন। আবার চারুবাসনার মতন সংস্থা নির্মাণ করেছেন। পশ্চিমবঙ্গ চারুকলা পর্ষদের কর্মসূচি কেমন হবে উপদেশ দিয়েছেন। অগণিত নবীন শিল্পীকে যথাসাধ্য সহায়তা করেছেন, এগিয়ে দিয়েছেন। তা সত্ত্বেও অপূর্ণ থেকে যায় শিল্পী জীবন। আমরা মনে করি দীর্ঘদিন বাঁচলেই বুঝি জীবনের সবটা আস্বাদন করা হয়ে যায়। সাধারণ মানুষের সব সাধ পূর্ণ হলেও যোগেন চৌধুরীর মতন শিল্পীর সাধ্য অনেক বেশি, বাঁচার সাধও তাই অনেকের চেয়ে বেশি। শিল্পী তো সাধক। সে এত তুচ্ছ মৃত্যুতেই থেমে যান না।
দারিদ্রকে অতিক্রম করতে ও দীর্ঘ কাঁটাতারের দাগ মুছতে যোগেন চৌধুরীর সময় লেগেছে। সেখানে অতিরিক্ত রং ও মেটেরিয়ালের ব্যবহার ওঁর কাছের অপচয় ছাড়া কিছু নয়। তাই লিমিটেড কালার প্যালেট হওয়াই স্বাভাবিক।

রবীন্দ্রনাথের সেই ‘প্রাণ’ কবিতার শুরুটা মনে পড়ছে, ‘মরিতে চাহি না আমি সুন্দর ভুবনে, মানবের মাঝে আমি বাঁচিবারে চাই।’ শিল্পীর মৃত্যু নেই এসব পোশাকি ঝুটা প্রবাদ। বাস্তবের সত্যি এই যে যোগেন চৌধুরী আর নেই। ওঁর ‘যো’ সই করা ছবি আর নির্মিত হবে না। যা রইলো তা ভারতীয় শিল্প সংরক্ষণের প্রক্রিয়ার বেহাল অবস্থায় খুব জোর একশো বছর থাকবে। তারপর? কালের নিয়মে হারিয়ে যাবে ‘যো’ নাম। যেমন আমরা মনে রাখিনি রবিন মণ্ডল, প্রকাশ কর্মকার, বিজন চৌধুরীদের মতন ওঁর সমসাময়িকদের। শিল্প ইতিহাস শুধু এসব নথি বয়ে নিয়ে যাবে।

এসব কঠিন কথার মাঝেও যোগেন চৌধুরীর কাজ কালকের পূর্ণিমার চাঁদের মতন ঝকঝকে থাকবে এই বিশ্বাস আমাদের থাকবে। যোগেন চৌধুরী চিরকাল না থাকলেও, ওঁর চারুবাসনায় আমরা ছবি সাজিয়ে ওঁর জন্যই অপেক্ষা করবো, যথারীতি উনি দেরি করবেন। কিংবা কোনো বিশেষ আলোচনা সভায়, একটা চেয়ার খালি থাকবে মাইক অফ থাকবে। আমরা চাইলেও আর আমাদের যো-কে ছুঁতে পারব না।

