ফরাসি বিপ্লবে যোগ দিয়েছিলেন এই বঙ্গসন্তান

কমিটি অফ পাবলিক সেফটির সদস্য

আধুনিক পৃথিবীর ইতিহাসে ফরাসি বিপ্লব এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। উদারনৈতিক গণতন্ত্রের যুগ-সন্ধিক্ষণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয় এই ঘটনাকে। গোটা ইউরোপকে নাড়িয়ে দিয়েছিল ফরাসি বিপ্লব। তার ‘সাম্য, মৈত্রী, স্বাধীনতা’-র বার্তা দুনিয়ার নানা প্রান্তের শোষিত-নিপীড়িত মানুষকে আজও লড়াই করার প্রেরণা জুগিয়ে চলেছে। ফ্রান্সের এই টালমাটাল পর্বে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন এক বঙ্গসন্তানও, হয়ে উঠেছিলেন নেতৃস্থানীয় বিপ্লবী।

ইউরোপের মানুষ তাঁকে জামর নামে চেনেন। ছোটোবেলায় যে কী নাম ছিল, তা বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে গিয়েছে। চট্টগ্রাম অঞ্চলে জন্মগ্রহণ করেছিলেন জামর। সম্ভবত ১৭৬২ সালে। অনেকের মতে তিনি সিদ্দি জনগোষ্ঠীর লোক। আফ্রিকা থেকে তাঁর পূর্বপুরুষ বাংলায় আসেন।

১৭৭৩ সালে চট্টগ্রাম উপকূলে ইংরেজ দাস-ব্যবসায়ীদের হাতে ধরা পড়লেন জামর। তখন মাত্র ১১ বছর বয়স তাঁর। জাহাজে করে তাঁকে নিয়ে যাওয়া হল মাদাগাস্কারে। তারপর ফ্রান্সে। তাঁকে কিনে নিলেন ফরাসি রাজা পঞ্চদশ লুই। ফ্রান্সের রাজতান্ত্রিক স্বৈরাচার তখন প্রায় শেষ সীমায় গিয়ে পৌঁছেছে। চতুর্দশ লুই উপহার হিসেবে জামরকে তুলে দেন প্রিয় রক্ষিতা কাউন্টেস মাদাম দু বারির হাতে। জামরকে আফ্রিকান ভেবেছিলেন মাদাম বারি, ক্রীতদাস হলেও পুত্রস্নেহে পালন করেছিলেন। দীক্ষিত করেছিলেন খ্রিস্টধর্মে। তখনই লুই-বেনোয়া জামর নামে পরিচিত হন চট্টগ্রামের এই তরুণ।

কাউন্টেস মাদাম দু বারি 

জামরের ছিল পড়াশোনায় আগ্রহ। তাতে উৎসাহ দিতেন মাদাম বারি। মন দিয়ে ফরাসি সাহিত্য ও দর্শন অধ্যয়ন করতে থাকেন জামর। এইভাবে পড়ে ফেলেন জাঁ জাক রুশোর লেখা বই। প্রভাবিত হলেন দারুণভাবে। রাজনীতির প্রতি আকৃষ্ট হলেন। গোপনে যোগ দিলেন বিপ্লবী দলে।

রাজা ষোড়শ লুই যখন সিংহাসনে, বিপ্লবে উত্তাল হয়ে উঠল ফ্রান্স। ১৭৮৯ সালের ১৪ জুলাই কুখ্যাত বাস্তিল দুর্গ দখল করলেন জনতা। রাজতন্ত্রের পতন ঘটল। জামর তখন বিপ্লবী নেতা। জ্যাকোবিন ক্লাবের পক্ষ থেকে কমিটি অফ পাবলিক সেফটির গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। 

রাজার ক্ষমতা বিপ্লবীরা কেড়ে নিলে রাজপ্রাসাদ ছাড়তে বাধ্য হলেন মাদাম বারি। অভিজাতদের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ ছিল। বিপ্লবীদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করতে থাকেন। তাঁকে গ্রেপ্তার করেন বিপ্লবীরা, কিন্তু প্রমাণের অভাবে ছেড়ে দেন। এদিকে ১৭৯৩ সালের ২১ জানুয়ারি গিলোটিন যন্ত্রে রাজা ষোড়শ লুইয়ের শিরশ্ছেদ করা হল। 

১৭৯৩ সালে আবার গ্রেফতার হলেন মাদাম বারি। কেউ কেউ বলেন, জামরের অঙ্গুলিহেলনই বন্দি হন তিনি। মাদামের বিচারে সাক্ষী দেওয়ার সময় জামর নিজের পরিচয় সবাইকে জানান। বলেন, তিনি আফ্রিকান নন, বাংলার চট্টগ্রামের ছেলে। ১৭৯৩ সালের ৮ ডিসেম্বর মাদাম বারিকে গিলোটিনে হত্যা করেন বিপ্লবীরা। এই ঘটনার জন্য অনেকে জামরের সমালোচনা করেন। তাঁকে মাতৃস্নেহে বড়ো করেছিলেন কাউন্টেস বারি, লেখাপড়া শিখিয়েছিলেন। তার বদলে মাদামের হত্যাকাণ্ডে জামরের সক্রিয়তা বেশ দৃষ্টিকটু। তবে জামর মনেপ্রাণে একজন বিপ্লবী ছিলেন তা অনস্বীকার্য।

বাস্তিল দুর্গের পতন 

কাউন্টেসের শিরচ্ছেদের পর জামরকে গ্রেফতার করেছিলেন জিরোন্দিন বিপ্লবীরা। ছয় সপ্তাহের মতো বন্দি ছিলেন জামর। তারপর বন্ধুদের সাহায্যে মুক্তি পেয়ে ফ্রান্স থেকে পালিয়ে যান। নিভৃতে গা ঢাকা দিয়ে থাকেন বেশ কিছু বছর। ১৮১৫ সালে ওয়াটারলুর যুদ্ধে নেপোলিয়নের পতন ঘটলে আবার ফিরে আসেন প্যারিসে। এক স্কুলে শিক্ষকতা শুরু করেন। বদরাগী ছিলেন তিনি। ছাত্রদের পেটানোর অভিযোগ ছিল তাঁর বিরুদ্ধে। ১৮২০ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি দরিদ্র এবং নিঃসঙ্গ অবস্থায় মারা যান জামর। শেষকৃত্যে খুব কম সংখ্যক লোক হাজির ছিলেন। মৃত্যুর পর তাঁর ঘরে বিপ্লবী মারাট এবং রোবসপিয়ারের ছবি পাওয়া যায়। জামরের একটি প্রতিকৃতি এঁকেছিলেন ফ্রান্সের মহিলা শিল্পী মারি-ভিক্তোয়ার লেমোয়ান। সেই ছবি স্থান পেয়েছে ল্যুভর মিউজিয়ামে। 

তথ্যঋণ – আহমেদ মুনির, তানভীর আহমেদ। 

Developed by DXDasia