বঙ্গদেশে প্রত্নতত্ত্ব গবেষণার একজন আদি পথপ্রদর্শক
খোঁজ পাওয়া গিয়েছে, এক প্রাচীন মূর্তি রয়েছে গ্রামের মধ্যে। গ্রামবাসীরা সেটাকে সিঁদুর লাগিয়ে পুজো করেন। ঢাকা জাদুঘর থেকে নলিনীকান্ত ভট্টশালী সেটিকে সংগ্রহ করতে গেলেন। কিন্তু গ্রামবাসীরা তাঁদের পুজো করা মূর্তি দেবেনই বা কেন? এদিকে নলিনীকান্তও কম যান না। তিনি ওই মূর্তি চাইলেন। বললেন, জাদুঘরে নিয়ে গিয়ে সেই মূর্তি পুজো করবেন তিনি। তখন গ্রামের মানুষেরা সরল বিশ্বাসে সেটি তুলে দিতেন তাঁর হাতে। আবার, নলিনীকান্ত জানতে পারলেন, কোনো পুরাকীর্তি রয়েছে এক ব্রাহ্মণ পরিবারের তত্ত্বাবধানে। সেখানে তিনি হাজির হলেন গায়ে আদ্দির পাঞ্জাবি, পরনে সাদা ধুতি, গলায় পুঁতির মালা পরে। তিনি নিজেও ব্রাহ্মণসন্তান, শাস্ত্রজ্ঞও বটে। এভাবেই তিনি প্রত্নবস্তুটি সংগ্রহ করলেন। যদি কোনো প্রশাসনিক কর্তাব্যক্তির কাছে প্রাচীন জিনিসের সন্ধান থাকত, সেখানে যেতেন রীতিমতো শার্ট, প্যান্ট, নেকটাই পরে।
এসব প্রায় একশো বছর আগের কথা। নলিনীকান্ত ভট্টশালী ছিলেন তখনকার কিংবদন্তি ইতিহাসবিদ, প্রত্নতত্ত্ববিদ, লিপিবিশারদ, মুদ্রাবিজ্ঞানী এবং নানা বিষয়ে পণ্ডিত। ঢাকা জাদুঘর প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে তাঁর অবদান ছিল সবথেকে বেশি। এখনকার বাংলাদেশের অধীন মুন্সিগঞ্জ জেলায় তিনি জন্মেছিলেন ১৮৮৮ সালের ২৪ জানুয়ারি। এমএ করেছিলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। শিক্ষকতাকেই পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন। পাশাপাশি চালিয়ে যাচ্ছিলেন প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণাও।
১৯১২ সালে পুরোনো ঢাকার নর্থব্রুক হলে বাংলার গভর্নর লর্ড কারমাইকেলের সামনে তিনি একটি বক্তৃতা দেন, যার মাধ্যমে ঢাকায় একটি জাদুঘর স্থাপনের প্রয়োজনীয়তা যুক্তি-তথ্য দিয়ে তুলে ধরেন। এই বক্তৃতায় মুগ্ধ হয়ে লর্ড কারমাইকেল তাঁকে ২০০০ টাকা পুরস্কার দিলেন। নলিনীকান্তের বয়স তখন মাত্র ২৬। ১৯১৩ সালে ঢাকা জাদুঘর স্থাপন করেন লর্ড কারমাইকেল। তাঁর অনুরোধে ১৯১৪ সালে সেখানে নলিনীকান্ত ভট্টশালী কিউরেটর পদের দায়িত্ব নিলেন। ১৯৪৭ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি তারিখে প্রয়াত হওয়া পর্যন্ত তিনি ওই পদেই কর্মরত ছিলেন। ডক্টরেট উপাধিতেও ভূষিত হয়েছিলেন তিনি।
আরও পড়ুন: স্বাধীনতা আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন শরৎচন্দ্র
প্রত্নতত্ত্বের নেশায় তিনি উত্তরবঙ্গ এবং পূর্ববঙ্গের নানা জায়গায় ক্লান্তিহীনভাবে ঘুরে বেড়াতেন। তখন পরিবহন এত উন্নত ছিল না। নানান প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও দমে যাননি তিনি। এইভাবে সংগ্রহ করেছেন প্রচুর মূর্তি, তাম্রশাসন, মুদ্রা, পুঁথি। একবার খবর পেয়েছিলেন, কোনো এক পুকুরে পুরোনো তাম্রশাসনের টুকরো পড়ে আছে। সেটিকে পাওয়ার জন্য চার দিন পুকুরের ধারে বসেছিলেন। কিন্তু জেলেরা জাল ফেলেও সেটিকে উদ্ধার পারেনি। ব্যর্থ মনোরথ হয়ে তাঁকে ফিরে যেতে হয়। বাংলার প্রাচীন ও মধ্যযুগের ইতিহাস এবং প্রত্নতত্ত্বের ওপর বেশ কিছু মূল্যবান বই লিখেছেন নলিনীকান্ত, যেগুলো এখনও গবেষকদের কাজে লাগে। নলিনীকান্ত ভট্টশালীর নাম খুব বেশি প্রচারের আলোয় আসেনি, কিন্তু, বঙ্গদেশে প্রত্নতত্ত্ব গবেষণার একজন আদি পথপ্রদর্শক ছিলেন তিনি, এই নিয়ে সন্দেহের কোনো অবকাশই নেই।
তথ্যঋণ – মধুসূদন মিহির চক্রবর্তী, সুফি মোস্তাফিজুর রহমান।
