
বিদেশ থেকে ফেরা সবাইকে একঘরে করে দেবেন না
আমার হোম কোয়ারেন্টিনের আজ পঞ্চম দিন। আমি সুস্থ এবং নিরাপদ। করোনার উপসর্গ এখনও শরীরে দেখা যায়নি। তবুও লোকে এড়িয়ে চলছে আমায়। ১৪ দিন আমি কোয়ারেন্টিনে থাকব। মেনে চলব রাজ্য সরকারের নির্দেশ। করোনার প্রকোপ শুরু হওয়ার পর বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে আমার মতো ছাত্রছাত্রীরা ভারতে ফিরে আসছেন। আমি ফ্রান্স থেকে বাড়ি ফিরেছি। এরকম পরিস্থিতিতে বাইরে বেরোনো একেবারেই নিরাপদ নয়। কিন্তু, পরিবারের মানসিক শান্তির জন্য তাঁদের কাছে থাকাই এখন জরুরি।
বাইরে থেকে ফিরলে সেলফ কোয়ারেন্টিনে থাকতে হয়। বেশ কিছু প্রতিষেধক ব্যবস্থাও নিতে হয়, যা আমার মতো বেশিরভাগ মানুষই মেনে চলছেন। যারা দূর থেকে এসেছি, তাদের সবাইকে রাজ্য সরকার মেডিকেল পর্যবেক্ষণে রেখেছে বলেই আমার অনুমান। প্রতিদিন মেডিকেল টিমের এক সদস্য বাড়িতে এসে আমার স্বাস্থ্য পরীক্ষা করছেন, বাড়ির জল নিষ্কাশন ব্যবস্থাও খতিয়ে দেখছেন। ফেরার পর থেকে এখন পর্যন্ত যেসব পদক্ষেপ নিয়েছি, তাতে ওঁরা সন্তুষ্ট। আমার বাবা-মা দু’জনেই হার্টের রোগী। তাঁরা যথেষ্ট স্বাস্থ্যবান, কিন্তু তাঁদের ইমিউনিটি দুর্বল। তাই, আরও সাবধান হতে হয়েছে। আমি নিজের ঘরেই থাকি। কথা বলার প্রয়োজন হলে তাঁদের কাছে না গিয়ে সাহায্য নিই ভিডিও কলের।
কয়েক হাজার ছাত্রছাত্রী বাইরে থেকে কলকাতায় ফিরেছে। তাদের মধ্যে দু’তিনজন, যাদের শরীরে কোভিড-১৯ পাওয়া গিয়েছে, দায়িত্বহীনের মতো কোয়ারেন্টিন বিধি মানেনি। এমনকি প্রকাশ্যে অন্য নাগরিকদের সংস্পর্শে এসেছে। তার মানে এই নয় যে আমরা সবাই ওদের মতো বেপরোয়া। কিন্তু কলকাতাবাসী আমাদের বড়ো বেশি সন্দেহ করছে।

আমি বাড়ি ফেরার ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যে অ্যাপার্টমেন্টের সেক্রেটারি আমাকে ফোনে জিজ্ঞেস করেন, আমার স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হয়েছে কিনা। ডাক্তারেরা আমাকে বাড়ি আসতে অনুমতি দিয়েছেন কিনা, সেটাও জানতে চান। আমি বলি, যাদের শরীরে করোনার উপসর্গ পাওয়া যায়নি, তাদের সবাইকে বাড়িতে গিয়ে কোয়ারেন্টিনে থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রত্যেকটা প্রশ্নের জবাব দিই, কারণ বুঝতে পেরেছিলাম, তাঁরা নিজেদের সুরক্ষিত মনে করছে না। মিনিট ১৫ পর আরেকটা ফোন আসে। বলা হয়, “আমরা তোমার বিরুদ্ধে পুলিশে অভিযোগ জানাব। ভালো হয় তুমি যদি এখানে না থাকো”। স্থানীয় বিধায়ককে আমার কথা জানানো হবে বলেও হুমকি দেওয়া হয়।
কিন্তু আমি তো কিছুই লুকোইনি। এয়ারপোর্ট অথবা কোয়ারেন্টিন থেকে পালিয়েও যাইনি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং সরকারের যাবতীয় নির্দেশিকা ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলছি। আমি এবং আমার বাবা-মার কেউই বাড়ির বাইরে যাই না। আমি তো বেরোই না নিজের ঘর থেকেও। এখন সারা বিশ্বে জরুরি অবস্থা চলছে। আমরা বাড়িতে পরিবারের কাছে ফিরতে চাইব এটাই স্বাভাবিক, কারণ সময়টা খুবই অনিশ্চিত।
১৪ দিন ধরে টানা ঘরে মধ্যে থাকা খুবই কষ্টের। আমার মতো যারা এতদিন বাইরে ছিল, তারা একই ছাদের তলায় থেকেও পরিবারের সঙ্গে ঠিকঠাক মিশতে পারছে না। এটা ভীষণই যন্ত্রণার, একরকম মানসিক ট্রমার কাছাকাছি। তার সঙ্গে যোগ হয়েছে আমার নিজের সমাজেরই ঘৃণা এবং ভীতি, যারা আমাকে অপরাধীর মতো এড়িয়ে চলছে।
এটা আতংক ছড়ানোর সময় নয়, বরং সতর্ক থাকতে হবে সবাইকে। আমরা যেমন নিরাপত্তার জন্য বাড়িতে আছি, সমাজেরও দায়িত্ব মানসিকভাবে আমাদের পাশে দাঁড়ানো। মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে গবেষণায় জানা গিয়েছে, কোয়ারেন্টিনে থাকা ব্যক্তিদের মন শান্ত রাখা খুবই জরুরি। আপনাদের সবাকে অনুরোধ করি, করোনা ভাইরাস এবং চারপাশের পরিস্থিতি নিয়ে সঠিক খোঁজখবর নিন। প্রাথমিক কথা এটাই, করোনা ভাইরাস বাতাসের মাধ্যমে ছড়ায় না। একমাত্র বাহকের সংস্পর্শে এলেই করোনায় আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তাই দয়া করে বাড়ি থাকুন। সংক্রমণের এই শৃঙ্খলটা ভাঙতে হবে। ডাক্তার এবং বিজ্ঞানীদের আরও সময় দিতে হবে, যাতে তাঁরা এই রোগ সারিয়ে তুলতে পারেন। বাড়ি থেকে মানসিকভাবে একে অপরের পাশে দাঁড়ানো এখন সবার আগে দরকার। বিশেষ করে যারা অন্য দেশ থেকে ফিরে একঘরে হয়ে আছেন, তাদের জন্য। আসুন, আমরা সবাই একসঙ্গে মিলে এই করোনা ভাইরাসকে দেশছাড়া করি।
