
ভারত-জার্মানির নানান যৌথ উদ্যোগের ৫০ বছর
আমাদের দেশের জিডিপির চার শতাংশ প্রাণিসম্পদ থেকে আসে। মোট কৃষি সংক্রান্ত জিডিপির ২৫ শতাংশ প্রাণিসম্পদের অবদান। দেশের জিডিপির এক শতাংশ আসে মাছ চাষ থেকে। অর্থাৎ প্রাণী ও মৎস্য সম্পদ দেশীয় অর্থনীতিতে একটা গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। দুধ উৎপাদনে ভারত এখন বিশ্বে প্রথম। দেশের গড় দুধ উৎপাদন বর্তমানে প্রায় ২২ কোটি টন। পাশাপাশি ডিম ও মাংস উৎপাদন মানুষের চাহিদা অনুযায়ী বেড়েছে। প্রতিবছর আমাদের দেশে প্রায় ১২ কোটি মুরগির ডিম, প্রায় ৯২ লক্ষ টন মাংস এবং ৩৩ হাজার টন উল উৎপাদিত হচ্ছে। অর্থাৎ দেশের এই বিপুল প্রাণিসম্পদের পুষ্টি, রোগ নিরাময়কে নিশ্চিত করতে প্রয়োজন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সফল প্রয়োগ। তাই প্রাণী বিজ্ঞান সংক্রান্ত পঠনপাঠন ও গবেষণার উপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে দেশে।
সেই লক্ষ্যেই বেলগাছিয়ায় পশ্চিমবঙ্গ প্রাণী ও মৎস্য বিজ্ঞান বিশ্ববিদ্যালয় (West Bengal University of Animal & Fishery Sciences) হয়েছে। ১৯৯৫ সালে এদেশের দ্বিতীয় প্রাণী চিকিৎসা সংক্রান্ত ও মৎস্য বিজ্ঞান বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে স্থাপিত হয়েছে এই বিশ্ববিদ্যালয়। ১৯৯০ সালে তামিলনাড়ু চেন্নাইতে প্রথম প্রাণীচিকিৎসা সংক্রান্ত (ভেটেরিনারি) বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি হয়। বিভিন্ন রাজ্যে এখন ২৬টির মতো ভেটেরিনারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
প্রাণী চিকিৎসাবিজ্ঞানের ক্ষেত্রে দুই দেশ যৌথ উদ্যোগে কাজ আগে কখনও করেনি। পশ্চিমবঙ্গ প্রাণী ও মৎস্য বিজ্ঞান বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়াও ভারতের আরও দুটি প্রাণী চিকিৎসাবিজ্ঞান বিশ্ববিদ্যালয় এবং জার্মানির তিনটি ভেটেরিনারি বিশ্ববিদ্যালয় একযোগে কাজ করার জন্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়েছে।
প্রযুক্তি এবং বিজ্ঞান উভয়ের সমন্বয়ে উন্নতি হয় শিক্ষা ব্যবস্থার। তাই সেই লক্ষ্যে গত ৫০ বছর ধরে ভারত এবং জার্মানি যৌথ উদ্যোগে বহু ক্ষেত্রে কাজ করেছে। সেই হিসেবে ২০২৪ সাল ভারত এবং জার্মানির যৌথ উদ্যোগের ৫০তম বছর। তাই এই বছর কৃষি, চিকিৎসা বিজ্ঞান, তথ্য প্রযুক্তি-সহ বিভিন্ন স্তরে উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে যাতে দুই দেশ যৌথভাবে কাজ করতে পারে। এদেশের প্রধানমন্ত্রী এবং জার্মানির চ্যান্সেলর অনুষ্ঠান করেছেন এই বিষয়ে।

প্রাণী চিকিৎসাবিজ্ঞানের ক্ষেত্রে দুই দেশ যৌথ উদ্যোগে কাজ আগে কখনও করেনি। সে ব্যাপারে তাই কাজ করার জন্য উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের এই প্রাণী বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়াও ভারতের আরও দুটি প্রাণী চিকিৎসাবিজ্ঞান বিশ্ববিদ্যালয় এবং জার্মানির তিনটি ভেটেরিনারি বিশ্ববিদ্যালয় একযোগে কাজ করার জন্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়েছে। রাজ্যের প্রাণী ও মৎস্যবিজ্ঞান বিশ্ববিদ্যালয়ের বেলগাছিয়া ক্যাম্পাসের কমিটি রুমে ভারত ও জার্মানি দুই পক্ষের মধ্যে মউ- চুক্তির আদান প্রদানও হয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গের প্রাণী বিশ্ববিদ্যালয়টি ছাড়া অন্য দুটি ভেটেরিনারি বিশ্ববিদ্যালয় হল দক্ষিণ ভারতে তামিলনাড়ু ভেটেরিনারি অ্যান্ড অ্যানিম্যাল সায়েন্সেস ইউনিভার্সিটি এবং উত্তর ভারতে পাঞ্জাবের গুরু অঙ্গদদেব ভেটেরিনারি অ্যান্ড অ্যানিম্যাল সায়েন্সেস ইউনিভার্সিটি। এই তিনটি ভারতীয় প্রাণী বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে জার্মানির লাইপজিগ ইউনিভার্সিটি, ফ্রিয়ই ইউনিভার্সিটি এবং হ্যানোভারের ইউনিভার্সিটি অফ ভেটেরিনারি মেডিসিন একযোগে কাজ করবে। ছাত্র-শিক্ষক আদানপ্রদান, পাঠ্যসূচি পরিমার্জন, যৌথ গবেষণা, সেমিনার, কর্মশালা, বিশেষ প্রশিক্ষণ ইত্যাদি হল এই উদ্যোগের লক্ষ্য।

ইন্দো জার্মান যৌথ উদ্যোগের কো-অর্ডিনেটর অধ্যাপক সিদ্ধার্থ জোয়ারদার বঙ্গদর্শন.কম-কে বলেন, “এ-ব্যাপারে আমাদেরই উদ্যোগ সবচেয়ে বেশি ছিল। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে জার্মানির লাইপজিগ বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ চলছিল। আমরা গবেষণা এবং শিক্ষার প্রয়োজনে ফান্ডিং আরও কীভাবে পেতে পারি, সে বিষয়ে আলোচনা করেছি।”
বৃহত্তর স্বার্থে এই যৌথ উদ্যোগ কীভাবে কাজ করবে? অধ্যাপক জোয়ারদার বলেন, “ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশনের ‘এক স্বাস্থ্য ভাবনা’ নিয়ে আমরা উদ্যোগ নেব অর্থাৎ কৃষি, প্রাণিসম্পদ এবং পরিবেশের স্বাস্থ্যের খেয়াল একই সঙ্গে রাখা হবে। দুই দেশেই কিছু কিছু ক্ষেত্রে একই ধরনের রোগ জীবাণু আছে। বিশেষ করে প্রাণী বাহিত মানুষের রোগের ক্ষেত্রে। এছাড়াও অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধের যে সমস্যা চলছে, সেটা নিয়েও আমরা যৌথভাবে কাজ করব।”
বাস্তবিকই এই মুহূর্তে সারা পৃথিবীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হচ্ছে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধ। ডাক্তাররাও এ নিয়ে চিন্তিত। আমাদের দেশে বহুল পরিমাণ অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার কতটা ভয়ানক হতে পারে, সে নিয়ে অনেক দিনই চর্চা চলছিল। প্রথম সারির এই সমস্যা শুধু আমাদের দেশের নয়, সারা ইউরোপের সমস্যা, জার্মানির সমস্যা। এই বিষয়ে দুই দেশের যৌথ উদ্যোগে গবেষণা করলে অনেক নতুন তথ্য সামনে আসার সম্ভাবনা রয়েছে।

গবাদি পশুপাখিতে অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগ বা মাছের খাদ্যে ভেজাল ইত্যাদি অনেক সমস্যা ভারতের মতো উন্নয়নশীল দেশে। অসাধু ব্যবসায়ীদের এইসব কাজ রোগব্যাধি তৈরি করছে সাধারণ মানুষের শরীরে। বর্তমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নতুন দিগন্ত এনে দিয়েছে তথ্যপ্রযুক্তির ক্ষেত্রে। সেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে ব্যবহার করা যেতে পারে ভেটেরিনারি এবং চিকিৎসা বিজ্ঞানে। এই নিয়ে দুই দেশের ছয়টি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ওয়ার্কশপ করার পরিকল্পনা চলছে। বৃহত্তর মানব সমাজে বিশেষ করে চাষী ভাইদের কাছে যাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা পৌঁছে যায়, সে লক্ষ্য রয়েছে। সেজন্য আগামী মার্চ মাসে ভারত সরকার আয়োজিত ওয়ার্কশপে এই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করা হবে। আগামী দিনে অতিমারিকে যাতে আগেই চিহ্নিত করা যায়, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে সেই ভাবে কাজে লাগানো নিয়ে আশাবাদী অধ্যাপক জোয়ারদার। প্রাণী বাহিত মানুষের রোগগুলির ক্ষেত্রে আগাম সর্তকতা যাতে নেওয়া যায় সেটা দেখা হবে। অর্থাৎ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির হাত ধরে একটা নয়া দিগন্ত খুলে যাবার সম্ভাবনা রয়েছে।
আরও পড়ুন: বিজ্ঞান গবেষণায় দেশে প্রথম কলকাতা
তিনি আশা করেন, আগামীদিনে প্রাণী সম্পদের ক্ষেত্রে আরও বিকাশ ঘটবে এই মউ চুক্তির ফলে। তিনি বলেন, “ভেটেরিনারিকে গুরুত্ব দেওয়ার জন্য ভারত সরকার এটাকে আলাদা মন্ত্রকের হাতে তুলে দিয়েছে। আমাদের দেশের জীববৈচিত্র্য অনেক বেশি, তাই রোগ জীবাণু বা এসবের নমুনাও অনেক বেশি। এবার এসব নিয়ে জার্মান অধ্যাপক বা স্কলাররা এসব নিয়ে গবেষণা করবে। নতুন কিছু সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যাবে।”
দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতিকে সুবিধাজনকভাবে ত্বরান্বিত করতে প্রাণিসম্পদ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই অগ্রগতির নেপথ্যে বিজ্ঞানভিত্তিক প্রাণী পালন এর অন্যতম শর্ত। সে জন্য দরকার প্রাণী উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত ঝকঝকে, আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত প্রযুক্তিবিদ। পঠনপাঠন এবং গবেষণায় বেশি গুরুত্ব দিলেই এমন ঝকঝকে প্রযুক্তিবিদ পাওয়া যাবে। তাই দুই দেশের অধ্যাপক, গবেষক, ছাত্র-ছাত্রীদের যৌথ কাজ অনেক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়াবে।
ইন্দো-জার্মান এই যৌথ উদ্যোগকে বাস্তবায়িত করার পেছনে বার্লিনে অবস্থিত ভারতীয় দূতাবাসের বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। ড. জোয়ারদার দূতাবাসে কর্মরত বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক কাউন্সেলর ড. রামানুজ বন্দোপাধ্যায়কে এইজন্য কৃতজ্ঞতা জানান। এই মউ-সাক্ষরকে রাজ্যের ভেটেরিনারি শিক্ষা প্রসারণের একটি মাইলস্টোন হিসাবে বর্ণনা করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক শ্যামসুন্দর দানা। অনুষ্ঠানে ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের নিবন্ধক অধ্যাপক পার্থ দাস-সহ অন্যান্য আধিকারিক এবং অধ্যাপক ও ছাত্ররা।

