রাষ্ট্রসংঘে জায়গা করে নিল বিশ্বভারতীর ছাত্রী স্রোতস্বিনীর জলবায়ু নিয়ে আঁকা ছবি

রাষ্ট্রসঙ্ঘের এবারের সম্মেলনের থিম-এ অংশ নিয়েছিল বিশ্বের কয়েক হাজার প্রতিযোগী

স্বীকৃতি/পুরস্কার/প্রচার শিল্পীর মনোযোগের কোনও ক্ষতি করে, কী মনে হয়?

“আমার সেরকম কিছু মনে হয় না। কিছুক্ষণ সেলিব্রেশনের পর চাইলে নিজের কাজের প্রতি আরও ফোকাসড্‌ হওয়াই যায়। সেটাই আসল।” কথোপকথনের শুরুতেই এই গুরুগম্ভীর প্রশ্নের পরিপ্রেক্ষিতে ফোনের ওপার থেকে বছর ২১-এর তরুণীর সাবলীল উত্তর। স্রোতস্বিনী সিনহা। বিশ্বভারতীর কলাভবনের স্নাতক স্তরের চতুর্থ বর্ষের ছাত্রী। সম্প্রতি রাষ্ট্রসংঘের জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক সম্মেলনে জায়গা করে নিয়েছে তাঁর আঁকা ছবি।

সম্প্রতি ইউনেস্কোর ফিউচার অব এডুকেশন ইনিশিয়েটিভ, আর্টিস্টস লিটারেসিস ইনস্টিটিউট এবং ওপেন সোসাইটি ফাউন্ডেশনের সহযোগিতায় অ্যারিজোনা স্টেট ইউনিভার্সিটি দ্বারা ‘টার্ন ইট অ্যারাউন্ড ফ্লাশকার্ড’ তৈরি করা হয়েছে। গ্লাসগোতে অনুষ্ঠিত ২০২১ সালের রাষ্ট্রসঙ্ঘের জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক সম্মেলন কপ-২৬ এ ‘টার্ন ইট অ্যারাউন্ড ফ্লাশকার্ড’-এর সেটে বিশ্বের বিশ্বের ২৫ বছরের কম বয়সি কয়েক হাজার শিল্পীর মধ্যে থেকে মাত্র ৮০ জনের ছবি নির্বাচিত হয়। রাষ্ট্রসঙ্ঘের এবারের সম্মেলনের থিম ‘টার্ন ইট অ্যারাউন্ড’-এ বিশ্বের কয়েক হাজার প্রতিযোগীর মধ্যে স্রোতস্বিনীর আঁকা ‘প্রকৃতি বনাম মানুষ’ সিরিজের একটি ছবি নির্বাচিত হয়।

স্রোতস্বিনীর আঁকা এই ছবিটিই জায়গা করে নিয়েছে রাষ্ট্রসংঘের জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক সম্মেলনে

সারা বিশ্বের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে জলবায়ু পরিবর্তন, প্রাকৃতিক বিপর্যয়, পরিবেশের অবক্ষয়। বিশেষত ছোটোদের, তরুণ প্রজন্মের মনে ছাপ ফেলেছে এই বিষয়টি।  সুইডেনের গ্রেটা থুনবার্গই এর উপযুক্ত উদাহরণ। তবে, স্রোতস্বিনী তাঁর জলবায়ু সংক্রান্ত ছবিগুলি এঁকেছিলেন কোনও পরিকল্পনা না করেই অর্থাৎ জলবায়ু নিয়ে কোনও আন্দোলন অথবা রাষ্ট্রসংঘে তাঁর ছবি নির্বাচিত হবে এ আশা থেকে নয়। প্রাকৃতিক, সামাজিক, মানবিক যেকোনও ধরনের ‘ক্রাইসিস’ নিজে নিজেই জায়গা করে নেয় শিল্পীর চেতনায়, রং-এ, তুলিতে। “আলাদা করে কোনও প্রস্তুতি বা পরিকল্পনা ছিল না, সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে এই প্রতিযোগিতার কথা জানতে পারি। ২০২০-তে লকডাউন চলাকালীন বাড়িতে বসে প্রচুর কাজ করেছি। এরমধ্যে ‘প্রকৃতি বনাম মানুষ’ বিষয়ক দশটি কাজের একটি সিরিজও রয়েছে। তার মধ্যে থেকেই একটি ছবি ‘টার্ন ইট অ্যারাউন্ড ফ্লাশকার্ড’-এ প্রকাশিত হয়েছে।” বলেন স্রোতস্বিনী।ছোটো থেকেই স্রোতস্বিনী ভালোবাসেন চারকোল, কালি, অ্যাক্রিলিক আর ডিজিটাল প্রিন্টস। তাঁর ছবিতে কালো রং নির্দেশ করে জলবায়ুর অন্ধকার দিকটি। লাল রং বোঝাতে চায়, আমরা এমন এক বিপদের সম্মুখীন হচ্ছি, যা নিয়ে আমাদের কোনও পূর্ব অভিজ্ঞতা নেই।  তাঁর এই শিল্প মনোভাবের অনুপ্রেরণা মা-বাবা। কারণ, দু’জনই শিল্পী। স্রোতস্বিনী বাবা কৃষ্ণেন্দু সিনহা কলকাতার রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিপার্টমেন্ট অব ভিসুয়াল আর্টসের অতিথি অধ্যাপক। আর মা অপর্ণা সিনহা রাইগাছি উচ্চবিদ্যালয়ের কলা বিষয়ক শিক্ষিকা। তাঁদের সংস্পর্শে বড় হওয়ার ফলেই প্রকৃতি নিয়ে কাজ করতে ছোট থেকেই ভালো লাগত বলে তিনি জানান।

‘প্রকৃতি বনাম মানুষ’ বিষয়ক সিরিজের অন্য দুটি ছবি

যে কোনও প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে ধ্বংস হওয়ার পরও প্রকৃতি যেভাবে সহনশীলতা দেখিয়ে নিজেকে পুনরুদ্ধার করার ক্ষমতা দেখায়, বিশেষত ধ্বংসাত্মক বন্যা বা দাবানলের পর ছোট ছোট গাছপালা ও ফুল প্রস্ফুটিত হয়ে প্রকৃতি ফের বেঁচে থাকার সহনশীলতার পরিচয় দেয়- স্রোতস্বিনীর ছবিতে খুব সুন্দরভাবে তা তুলে ধরা হয়েছে। যা রাষ্ট্রসঙ্ঘের কপ-২৬ এর এবারের থিমের সঙ্গে মিলে গিয়েছে। সেজন্যই সারা বিশ্বের হাজার হাজার প্রতিযোগীর মধ্যে থেকে তাঁর ছবি নির্বাচিত হয়েছে। যা অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং ছিল বলে স্রোতস্বিনীর দাবি। এটা তাঁর কর্মজীবনের অন্যতম মাইল ফলক বলেও দাবি করেন তিনি। তাঁর এই সাফল্যের পিছনে বাবা-মায়ের ভূমিকার পাশাপাশি কলাভবনের অধ্যাপক অধ্যাপিকাদের ভূমিকাও অনস্বীকার্য বলেও তিনি জানান। ভবিষ্যতে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করার পর শিল্পকেই নিজের কর্মজীবন হিসেবে বেছে নেওয়া কথা অকপটে জানান স্রোতস্বিনী।

 

 

Developed by DXDasia