
রাজ্যস্তরে ‘খেল সম্মান’-এর পাশাপাশি বিহার সরকারের তরফে ‘অজাত শত্রু’ পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন সাহেব
প্রতিবন্ধকতা বাধা হতে পারেনি, মনের জোরে একের পর এক জয়ের শিরোপা আদায় করে নিয়েছেন। কখনও ফুটবল, কখনও ক্রিকেট, কখনও আবার অ্যাথলেটিক্স, মাঠ কাঁপিয়ে বারবার শিরোনামে উঠে এসেছে কাঁকিনাড়ার সাহেব হুসেন (Saheb Hussen)।
ছোটোবেলা থেকেই সাহেবের দৃষ্টিশক্তির সমস্যা। মাত্র ১৬ বছর বয়সে প্রায় ৭৫ শতাংশ দৃষ্টিশক্তিহীন হয়ে পড়েন সাহেব। সেই থেকে বিশেষভাবে সক্ষম তিনি। আর সেই সক্ষমতার জোরেই জাতীয় স্তরে ৪৫ টি সোনার পদক জয় করেছে। রাজ্য স্তরে ২০১২ সালে রাজ্যপালের থেকে পুরস্কৃতও হয়েছে। পাশাপাশি ২০২০ সালে মুখ্যমন্ত্রীর তরফ থেকে এই প্রতিভাবান খেলোয়াড়ের হাতে তুলে দেওয়া হয় ‘খেল সম্মান’। এছাড়াও বিহার সরকার তাঁকে ‘অজাত শত্রু’ পুরস্কারে ভুষিত করে।

২০১৮ সালে, কেরলে দৃষ্টিহীনদের জাতীয় ফুটবল প্রতিযোগিতাতে বাংলার হয়ে খেলেছেন তিনি। ফুটবলে সাহেব গোলকিপার। অন্যদিকে দৃষ্টিহীনদের জাতীয় ক্রিকেট প্রতিযোগিতাতেও বাংলার প্রতিনিধিত্ব করেছেন তিনবার। যথাক্রমে ২০১৭ সালে দিল্লি, ২০১৮-তে হায়দ্রাবাদ এবং ২০১৯ সালে মধ্যপ্রদেশ। ক্রিকেটে সাহেব অলরাউন্ডার।
ছোটো থেকেই খেলাধুলোর প্রতি সাহেবের ছিল অদম্য আগ্রহ। ফুটবল, ক্রিকেট খেললেও তার প্রথম পছন্দ অ্যাথলেটিক্স। ২০০৪ সাল থেকে শুরু হয় তার অ্যাথেলেটিক্সের সফর। ওই সময় কাঁকিনাড়া নারায়ণপুর ইউনাইটেড ক্লাবে কোচ গোলক মণ্ডলের কাছে তাঁর খেলোয়াড়ি শিক্ষার শুরু। ২০০৪ সাল থেকে অ্যাথলেটিক্সের সঙ্গে যুক্ত হলেও প্যারা অ্যাথলেটিক্সে যোগ দেন ২০১২ সালে। ধীরে ধীরে ৪০০ ও ৬০০ মিটার দৌড়ে পটু হয়ে ওঠেন সাহেব।
দৃষ্টিহীনদের প্রতিযোগিতায় ‘বি ১২’ গ্রুপে অংশ নিতে হয় সাহেবকে। আর প্যারা অ্যাথলেটিক্স প্রতিযোগিতায় ‘টি ১২’ গ্রুপে। ভারতের প্যারা অ্যাথলেটিক্সে দৃষ্টিহীন খেলোয়াড়দের মধ্যে একেবারে প্রথম সারিতে আছেন সাহেব। ২০১৬ সালে হরিয়ানায় জাতীয় আসরে ১০০ (১১.৩২ সেকেন্ড), ২০০ (২২.৪৫ সেকেন্ড) ও ৪০০ (৫৩.৩৬ সেকেন্ড) মিটার দৌড়ে রেকর্ড গড়েছিলেন তিনি। সে রেকর্ড এখনও অক্ষত। যদিও ২০০ মিটার দৌড়ে ওঁর জীবনের সেরা সময় (২২.২৬ সেকেন্ড) ২০১৮ সালে দুবাইয়ে প্যারা ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়নশিপ। সে প্রতিযোগিতায় চতুর্থ হয়েছিলেন সাহেব হুসেন। ২০১৮ সালে, কেরলে দৃষ্টিহীনদের জাতীয় ফুটবল প্রতিযোগিতাতে বাংলার হয়ে খেলেছেন তিনি। ফুটবলে সাহেব গোলকিপার। অন্যদিকে দৃষ্টিহীনদের জাতীয় ক্রিকেট প্রতিযোগিতাতেও বাংলার প্রতিনিধিত্ব করেছেন তিনবার। যথাক্রমে ২০১৭ সালে দিল্লি, ২০১৮-তে হায়দ্রাবাদ এবং ২০১৯ সালে মধ্যপ্রদেশ। ক্রিকেটে সাহেব অলরাউন্ডার।

ভাটপাড়ায় রিলায়েন্স জুট মিলের কোয়াটারে দিদি-জামাইবাবুর কাছে থাকেন সাহেব। জামাইবাবু ওই জুটমিলের কর্মী। তাঁর আয়েই চলে পাঁচজনের সংসার। “করোনার সময় জুটমিল বন্ধ থাকায় সংসারের অবস্থা খুবই শোচনীয় হয়ে পড়ে, কোনোরকমে সরকারি রেশনের ভরসায় দিন কেটেছে। তবু হাল ছাড়িনি, খেলাটাকে যেভাবে হোক বাঁচিয়ে রেখেছি”, দৃঢ়তার সঙ্গে কথা বললেন সাহেব হুসেন।
পরিবারে অর্থের জোগান ছিল চিরকালই সীমিত। জীবন চালাতেই যেখানে নাভিশ্বাস ওঠে, সেখানে আবার খেলাধুলা! নুন আনতে পান্তা ফুরোনো কোনো পরিবারের কাছে সে কেবলই বিলাসিতা মাত্র। ঠিক এই সময় সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয় ‘গোয়া স্পোর্টস ফাউন্ডেশন’। “কিন্তু করোনার প্রকোপে ক্ষতিগ্রস্থ হওয়ায় ‘গোয়া স্পোর্টস ফাউন্ডেশন’ এখন আর আমাকে স্পনসর করে না। তাতেই কিছুটা অসুবিধা হচ্ছে”, এমনটাই জানালেন সাহেব।
তবুও হাল ছাড়তে নারাজ সাহেব হুসেন। ভালো মানের খাবার, ভালো জুতো ছাড়াই লড়াইটা জিইয়ে রেখেছেন তিনি। সামনেই প্যারা এশিয়ান গেমস, তার জন্য জোরকদমে চলেছে প্রস্তুতি। যদিও সাহেব অনেক লম্বা রেসের ঘোড়া। তার লক্ষ্য তাই এশিয়ান গেমস ছাড়িয়ে ২০২৪-এর অলিম্পিক। সাহেবের ইচ্ছেশক্তির জোর যে ঠিক কতটা তার আভাস মেলে তাঁর কথাতেই, “অলিম্পিকে দেশের হয়ে পদক জয়ই আমার আসল লক্ষ্য। তার জন্য সবরকম কঠিন পরিস্থিতির সঙ্গে মোকাবিলা করতেও আমি প্রস্তুত।”
করোনার কারণে নির্ধারিত সময় বদল না হলে আজকের দিনে এশিয়ান গেমসের ময়দানে থাকতেন সাহেব হুসেন। আবারও বাংলার মুখ হয়ে উঠতেন তিনি। পরিস্থিতি যতোই প্রতিকূল হোক না কেন দিন বদলের স্বপ্নটুকু বুকে নিয়ে আগামীর জন্য নিজেকে গড়ে তোলার কাজে সদা তৎপর বাংলার ছেলেটি। সাহেব হুসেন থেকে বাংলার খেলার জগতে ‘সাহেব’ হয়ে ওঠার সফরটা তাঁর চলছেই।
ছবি সৌজন্যে – সাহেব হুসেনের ফেসবুক প্রোফাইল
সাহেব হুসেনের পাশে থাকতে যোগাযোগ করুন এই নম্বরে – ৮৬১১৭৬৩৩৪৫
