কেন গল্প বলতে হবে ছোটোদের?

গল্পের মাধ্যমে পড়ালে ছোটোরা শিখতে পারে অনেক সহজে

গল্প শোনা আদিম যুগ থেকে চলে আসছে। এই তো সেদিনের কথা। কথক ঠাকুর গল্প বলেছেন, একদল মানুষ শুনেছেন। গল্প শুনতে আমরা ভালোবাসি। ছোটো বয়স থেকেই গল্প শোনা শুরু হয়। শিশু জন্মের পর থেকে নানা শব্দ শোনে। কখনও মায়ের গলায় গান, কখনও দিদিমা, ঠাকুমার মুখে গল্প। শব্দের মানে না বুঝুক, না বুঝুক, বাচনভঙ্গি ওকে রাগ, দু:খ, আনন্দ, হাসি, ভালোবাসার অনুভূতি বুঝিয়ে দেয়। ছোটোদের সঙ্গে কথার আদান-প্রদানে নিশ্চয়ই দেখেছেন, অনেকেই হাত পা নাড়িয়ে নিজের জানা কথা পরিবেশন করে। মানে ছোটোরা ওদের মনের কথা বর্ণনা করে বলে, বর্ণনা করতে ভালোবাসে। ইংরেজিতে যাকে narration বলা হয়। অর্থাৎ বিবরণ। যে কোনো বিষয়কে ছোটোদের সামনে তুলে ধরতে হলে কাহিনির মধ্য দিয়ে বললে ছোটোদের মনে প্রবেশ করাটা তুলনায় সহজ হয়। আলবার্ট আইনস্টাইনকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল একবার, ছোটোদের বুদ্ধিমান করে তোলার উপায় কী? তার উত্তরে আইনস্টাইন বলেছিলেন যে ছোটদের বুদ্ধিদীপ্ত করে তুলতে তাদের রূপকথার গল্প শোনাতে হবে। আরও বুদ্ধিমান করতে হলে আরও রূপকথার গল্প বলতে হবে। 

ছোটোরা রূপকথা শুনতে ভালোবাসে। এই গল্প শুনতে শুনতে ছোটোরা কখনও কল্পনায় ভেসে ভেসে এগিয়ে যায়, কখনও নিজের যুক্তি দিয়ে নতুন ভাবনায় পৌঁছে যায়। ছোটোরা ভালোবাসে জীবন থেকে উঠে আসা লোক-কথার গল্প শুনতেও। রূপকথা, লোককথায় সব সময়ই খারাপ শক্তি, পরাক্রান্তের পরাজয় হয়। তুলনায় দুর্বল, কিন্তু শক্তিতে ক্ষীণ, তার জয় হয়। বা বড়ো-শক্তিকে ব্যঙ্গ করে ছোটো-শক্তি। এই ধরনের কিছু বার্তা লুকিয়ে থাকে এই সব গল্পের অনেক গভীরে। ফলে এর মধ্যে দিয়ে তৈরি হয় বোধ। ধরা যাক, উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর ‘টুনটুনি ও রাজার গল্প’ যখন ছোটোরা শুনছে, শিশু মন কিন্তু টুনটুনি হয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। সে কিন্তু টুনটুনির সঙ্গে চলতে চলতে উপায় বার করতে চেষ্টা করছে। এইভাবেই শব্দ শোনে, শব্দ চেনে, শব্দ শেখে। এইভাবেই ছোটোদের মস্তিষ্কে অনেক শব্দ (বিশেষ্য ছাড়া) গেঁথে যায়। শব্দ জমা হতে থাকে মনের শব্দভাণ্ডারে। পরে সে আবার প্রয়োগ করে সেই সব শব্দ। তাই শুধু রূপকথা নয়, ছোটোরা গল্পের মধ্যে দিয়ে নিজেদের কল্পনাকে ভাষা দিয়ে ধরার চেষ্টা করে বারবার। গল্পের মধ্য দিয়ে সিলেবাসের গুরুগম্ভীর বিষয়কে শেখানো হলে হয়তো ছোটোরা পড়ায় মন দিতে পারে। আসলে listening বা ‘শোনা’ শিক্ষণ পদ্ধতির একটি বড়ো পদ্ধতি।

গল্প মানেই বর্ণন (narration) বিবরণ. তাই গল্পের মধ্য দিয়ে কিছু শেখালে ছোটোরা আগে মনে মনে ছবি আঁকে। তখনই তার যুক্তিবোধ সজাগ হয়। মনের মধ্যে যুক্তিবোধ (reasoning) জোরালো হয়। ছোটোরা অনেক সহজেই বিষয়টিকে মনে রাখতে পারে। পরীক্ষায় দেখা গেছে, ছড়া যেমন খুব তাড়াতাড়ি মুখস্ত হয়, তেমনই কাহিনিভিত্তিক কবিতা ছোটোরা বেশি তাড়াতাড়ি মনে রাখতে পারে। এই ভাবনাকে মাথায় রেখে গল্প দিয়ে প্রশ্নের অঙ্কের বিষয়টিকে যদি উপস্থাপন করা যায়, অঙ্কের ভয় ছাড়াই বিষয়টিতে প্রবেশ করবে। 

ব্যাকরণ ক্লাসে ব্যাকরণের সূত্র ধরে পড়ানো হয়ে থাকে। কেউ উদাহরণ থেকে সংজ্ঞায় যান, কেউ সরাসরি সংজ্ঞা বলেই উদাহরণ বলেন। বানান শেখানোর সময় ণত্ব, ষত্ব প্রত্যয় শেখাতে গিয়ে নিয়মের মধ্যে দিয়ে মনে রাখানোর চেষ্টা করা হয়। সমাস শেখাতে গিয়ে নিয়মের জটাজালে আটকে রাখা হয়। ছোটোদের কখনই শেখানো হয় কি এই পাঠের মজা? বা গল্পের মধ্যে বানানের কথা বলা? ফলে বাংলা বানান হল ‘ওরে বাবা’ র দলে। তৎসম, তদ্ভব এই শব্দ ভাণ্ডার নিয়ে গল্প বলা হলে ছোটরা আপনা থেকেই বুঝবে কোন বানানে ‘ন’, কোথায় ‘ণ’। গল্প বানাতে হবে। এই বিষয়ে বাংলা দেশের সেলিনা হোসেনের ‘বর্ণমালার গল্প’, সফিক রহমানের ‘ভূতের ছানা মূর্ধন্য’ বই দুটি বেশ। 

বাংলার পরীক্ষার খাতা নিয়ে পর্যালোচনা করা গেলে দেখা গেছে নির্মিতি অংশে (creative writing) ছোটোরা ধাক্কা খাচ্ছে। ক্লাসে গল্পের জাদু ছোঁয়া ওরা পুরোপুরি শিখে উঠতে পারে না। অনুচ্ছেদ , চিঠি, রচনা, ভাবসম্প্রসারণ, সংলাপ শেখাতে গল্পের মধ্যে দিয়ে এগিয়ে নিয়ে গেলে সহজে ছোটোরা নিজেদের মতো করে ভাবনা প্রকাশ করবে। একটু উঁচু ক্লাসে যখন ভাবসম্প্রসারণ শেখে তখন, ওদের তত্ত্বকথা না শিখিয়ে, গল্পের মতো করে বলা হলে ওরা হয়তো মজা পেতে পারে। যেমন – একটি স্কুলে প্রতিযোগিতার বিষয় ছিল, ডাল থেকে পদ্ম ফুল তোলার। জনা দশেক মেয়ে নাম দিয়েছেন। নয়জন মেয়ে একবার দু’বার কাছে গিয়েও ডাল থেকে তুলল না কাঁটার ভয়ে। তারপর আরেকটি মেয়ে কাঁটার খোঁচা খেয়েও তুলল ফুলটি। পুরস্কৃত হল। অর্থাৎ কোনো কাজে জয়ী হতে গেলে কষ্ট, পরিশ্রম না করলে পাবে না। এইবার শিক্ষার্থীরা লিখতে পারবে সহজে। নিজেরা অনেক শব্দ খুঁজে পাবে। সম্প্রতি দু’-তিনজন ছাত্রের সঙ্গে কথা বলতে বলতে জানলাম, ওদের ক্লাসে দশ থেকে পনেরোটি ভাবসম্প্রসারণ বেছে দেওয়া হয়, মুখস্ত করতে বলা হয়। ভাবনা এই পদ্ধতিতে রুদ্ধ হয়। অনেকের মতে অনেক বিষয় নিয়ে ওদের পড়তে হয়, এই পাঁচ/দশ নম্বরের জন্য এত খাটাবে? আমরা ভুলে যাই creative writing-এ নিজস্বতা থাকলে সেটা পরবর্তীকালে অন্য কাজে বড়ো সহায়ক হবে। 

গল্প বলে, গল্প শুনে, গল্প তৈরি করে ছোটোরা নিজেদের মুন্সিয়ানাকে প্রকাশ করতে পারে। ক্লাসে যেদিন ‘দূষণ’ নিয়ে পড়ানো হবে, সেদিন শিক্ষিকা বোর্ডে অনেক শব্দ লিখে একজন একজন করে ডেকে তাদের গল্প বানাতে বলতে পারেন বা নিজে গল্প শুরু করে ছোটোদের দিয়ে গল্প সম্প্রসারণ করাতে পারেন। জমে উঠবে ক্লাস। দেখা যাবে, অমনোযোগী ছাত্রটিও এতে অংশ গ্রহণ করছে। আসলে গল্পের মধ্যে দিয়ে বিষয়টি উপস্থাপন করলে খুব সহজভাবেই শিশুর মনযোগ আকর্ষণ করা যায়। পরীক্ষায় দেখা গেছে দু-একজন মনসংযোগ রাখতে পারে না। কেউ বা শুনতে শুনতে নিজের জানা গল্প জুড়ে দেয়। তখন ছোটোদের গল্পের মূল ধারাতে আবার আনতে হবে। অন্যের ‘বলা’ শোনায় আগ্রহী করতে হবে। তবে হ্যাঁ, তার কথাও শুনতে হবে মন দিয়ে। গল্পের মূল স্রোতে গল্পটি চালনা করা শেখাতে হবে। এর সঙ্গে রাখা যেতে পারে কিছু আঁকা/ কিছু ছবি। ধরা যাক স্বরবর্ণ ও ব্যঞ্জন পড়ানোর সময় একটা গল্প বলা হল। যেমন-দুটো বাড়ি পরপর থাকবে। একটির সঙ্গে আরেকটি যুক্ত থাকবে। লেখা হবে একটিতে স্বরবর্ণ ও আরেকটিতে ব্যঞ্জনবর্ণ । ব্যঞ্জনবর্ণের বাড়িতে ২৭/২৮ ঘর করতে হবে । একটি ঘরে এক একটি বর্গের বর্ণরা থাকবে। ছোটোদের গল্পের মাধ্যমে বললে উচ্চারণও ঠিক থাকবে মনে রাখবে। 

Advance Organizers শিক্ষকদের শিক্ষণ পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করেছেন, সেখানে narrative একটি বিশেষ পদ্ধতি। এই পদ্ধতিতে সব বিষয় পড়ার আগে গল্প বলে পড়ানোর রীতির কথা আছে। গল্পের মধ্যে দিয়ে একটি ক্লাসে ছোটোদের মনে পাঠ পৌঁছানো যায় শুধু নয়, ছোটোরা গল্পে অংশগ্রহণ করে, নিজেদের শব্দভাণ্ডার কে সমৃদ্ধ করে, সহজভাবে বিশ্লেষণ ক্ষমতাও বাড়িয়ে তোলে।

বড়োরা শুধু গল্প বলবে না, ছোটোদের গল্প শুনবেও। ছোটোদের বাচনভঙ্গিতে আড়ষ্টতা থাকবে, এক বন্ধু যা বলল, সে কথাই আরেকবার বলবে, তবুও বলতে দিতে হবে। বলতে বলতে তার নিজস্বতা প্রকাশ পাবে। এরপর সবাই মিলে গল্পটি লিখবে। নিজেরা যখন এই গল্পটি লিখে ফেলবে ,তখন শিশুরা নিজেদের নিজেরা আবিষ্কার করবে। ছোটো বয়স থেকে শেখাতে হবে, ‘আপনাকে এই জানা আমার ফুরাবে না’। 

বাংলা বা যে কোন ভাষা , অঙ্ক, বিজ্ঞান, ইতিহাস, ভূগোল গল্প  বলে বলে এগিয়ে নিয়ে গেলে ওরা ভাব বিনিময় করতে পারে। নদী পড়াতে গিয়ে ছোটোদের বলা হল নদীর বৈশিষ্ট্য নিয়ে গল্প বলতে। নদীর স্রোত, জোয়ার ভাঁটা, বাঁধ ইত্যাদি নিয়ে গল্প বলে দিলে, নদীকে অনেকটাই ছোটোরা চিনবে। গল্পে নদীর প্রাণীদের মুখে কথা দিয়ে বিষয়টিকে মজার করতে হবে। গল্পের হাত ধরে ছোটোদের স্পষ্ট ধারণা হবে নদী সম্পর্কে। এবার ওদেরও নদী নিয়ে গল্প বানাতে বলতে হবে, বলতে বলতে ওদের  শব্দভাণ্ডার বেড়ে যাবে। মুখস্ত না করেও স্পষ্ট করে বিষয়টিকে তুলে ধরতে পারবে। লিখতেও পারবে।

গল্পে আছে এক জাদু। যত শুনবে ছোটোরা ততই নিজের অনুভূতি দিয়ে নতুন কিছু গড়ে তোলার তাগিদ খুঁজে পাবে।

জটিল সময় ছোটোরা বড়ো হচ্ছে। স্বচ্ছ ধারণায় এগিয়ে নিয়ে যেতে ছোটদের ভাবতে দিতে হবে। ভাবাতে গেলে শোনাতে হবে গল্প। যেমন ধরা যাক, বাংলায় সন্ধি, সমাস, প্রত্যেয়ের মধ্যে যে মিল আছে (শব্দ গঠনে) তা ওদের গল্প করে করে বলতে হবে। পদ প্রকরণে বিশেষ্য বলছে সে শব্দের রাজা, ক্রিয়া বলছে আমি মহারাজা, ওদের নানা কথোপকথনে ছোটোরা যখন আনন্দ পাবে, তখন আপনাআপনি ছোটোরা বিষয়টি বুঝে যাবে। ছোটোদের গল্প লিখতে বলা যেতেই পারে, ‘স্বরসন্ধি, ব্যঞ্জন সন্ধি, বিসর্গ সন্ধি তিনবন্ধু’, তারপর লেখো।

দেখবেন যে লেখা আপনি পাবেন, এমন মজার কাহিনি আগে কখনও শোনেননি।

Developed by DXDasia