গপ্পে মাতালেন বিখ্যাত সেই গল্পকথক ‘টুপ’ ওরফে গডফ্রে ডানকান
টুপ যখন বলেন, চুপ করে শুনতে হয়। কলকাতায় ঘুরে গেলেন দুনিয়া বিখ্যাত সেই গল্পবলার কথক ‘টুপ’। যাঁর নাম গডফ্রে ডানকান। যাঁর গল্প শুনতে ছোটবড়ো সবাই ভালোবাসে। এই কথা ভেবেই কলকাতার ব্রিটিশ কাউন্সিল আয়োজন করেছিলেন বড়োদের গল্প বলা শেখার কর্মশালা। গত ২৩ নভেম্বর অনুষ্ঠিত হল। সকাল ১০টা থেকে ২.৩০টা। তারপর, সন্ধ্যায় ছিল গল্প শোনার আসর। দুটিই মুগ্ধ করেছে। ব্রিটিশ কাউন্সিলকে ধন্যবাদ। গডফ্রে পাঁচ বছর আগে এসেছিলেন কলকাতায় গল্প বলতে। আবার এলেন।

গডফ্রে ডানকান, যার ছদ্মনাম টুপ। জন্ম ও বেড়ে ওঠা ইংল্যান্ডে। ওঁর বাবা গায়ানার মানুষ। কর্মসূত্রে তাঁর ইংল্যান্ডে আসা। গডফ্রে বললেন ৭ বছর বয়সে গায়ানায় বেড়াতে যাওয়ার স্মৃতি। ছোটো ছেলেটির ভালো লেগে যায় জায়গাটি। হয়তো মাটির টানেই। ওখানকার প্রাকৃতিক পরিবেশ ওকে আজও আচ্ছন্ন করে রাখে। গায়ানায় গিয়ে বাড়ির বড়োদের কাছে গল্প শুনতেন । গডফ্রে গল্প শুনে মুগ্ধ হতেন। পরে সেই গল্প অনায়াসে শুনিয়েও দিতে পারতেন বড়োদের। ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করেও তিনি কাঁধে তুলে নেন এই গল্প বলার ঝুলি। হ্যাঁ, গল্পের ঝুলিতে আছে আফ্রিকান লোকগাথা, চিনের লোককথা, রামায়ণ, মহাভারতের গল্প, পঞ্চতন্ত্র, বিক্রমাদিত্য-বেতাল। গডফ্রে শেখালেন গল্পকে একই রেখে কীভাবে ভিন্ন পরিবেশেও বলার ভঙ্গিমা কাছে টানতে পারে শ্রোতাদের। গল্প বলার নানা পদ্ধতি নানা ধরনের মজার খেলার মধ্যে দিয়ে শেখালেন। তিনি শেখালেন, ‘language is rhythm, and rhythm is language like music like poetry like song.’ আমাদের শেখালেন, গল্প বলার সময় নিজেকে মেলে ধরতে হবে। চরিত্রটিকে মেলে ধরতে গিয়ে তার সঙ্গে একাত্ম হতে হবে। ছোটোদের গল্প শোনাতে শোনাতে চরিত্র , ঘটনার মধ্যে নিয়ে আসতে হবে। রিডিং পড়া আর গল্প বলা যে আলাদা– সে কথাও মজা করে বোঝালেন।
টুপ গল্প শুরু আগে একটা বাজনা বাজান, সে অনেকটা ছোটোবেলায় পড়া অরণ্যদেবের ডাক পাঠানোর বাজনার মতো। তালে তালে কথক সবাইকে একই সূত্র যেন বেঁধে ফেলেন তখনই। শুরু হয় গল্প। শোনালেন এক বুড়ি তার মেয়ের বাড়ি নেমন্তন্ন খেতে গিয়ে পথে সাপ, নেকড়ে, বাঘের সামনে পড়লেন। এবং তাদের হাত থেকে বাঁচার জন্য বুদ্ধি করে সবাইকে বললেন যে তিনি দুর্বল রোগা মানুষ। মেয়ের বাড়িতে খেয়ে-দেয়ে মোটা হয়ে যখন আসবেন তখন যেন তাকে খায়। মেয়ের বাড়ি থেকে ফেরার পথে বাঘ, নেকড়রের থেকে রক্ষা পেতে কুমড়োর মধ্যে মেয়ে তাকে ঢুকিয়ে দিল। তারপর, গড়িয়ে দিল সেই কুমড়ো। গড়াতে গড়াতে চলল। আর পথে দেখা হল নেকড়ে, বাঘ, সাপের সঙ্গে। কুমড়োর ভিতর থেকেই নানা কথা বলে ঠকিয়ে বুড়ি চলল নিজের বাড়ির দিকে। মনে পড়ে গেল, উপেন্দ্রকিশোরের ‘কুঁজো বুড়ির কথা’। যেখানে লাউ চলেছে আর বুড়ি বলছে “লাউ গড়-গড়, লাউ গড়-গড়/খাই চিঁড়ে আর তেঁতুল,/ বীচি ফেলি টুলটুল।/ বুড়ি গেল ঢের দূর!” মনে হল, দেশে দেশে ভাষা বদলে যায় কিন্তু গল্প পরিযায়ী পাখির মতো, কোন সীমানা মানে না।