
‘একরৈখিক’ প্রেম দিবস কতটা বাঙালির? কতটা হুজুগের?
ভ্যালেন্টাইন’স ডে কতটা ভারতীয় আর কতটাই বা বাঙালির! এ নিয়ে বিস্তর বিতর্ক ও মতপার্থক্য আছে। একটু ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যাক ‘প্রেম দিবস’ আসলে কী! আনুমানিক ২৬৯ সালে ইতালির রোম নগরীতে সেন্ট ভ্যালেইটাইন নামে একজন খৃষ্টান পাদ্রী ও চিকিৎসক ছিলেন। ধর্ম প্রচার-অভিযোগে তৎকালীন রোমান সম্রাট দ্বিতীয় ক্রাডিয়াস তাঁকে বন্দি করেন। কারণ তখন রোমান সাম্রাজ্যে খ্রিষ্টান ধর্ম প্রচার নিষিদ্ধ ছিল। বন্দি অবস্থায় তিনি জনৈক কারারক্ষীর দৃষ্টিহীন এক মেয়েকে চিকিৎসার মাধ্যমে সুস্থ করে তোলেন। এতে সেন্ট ভ্যালেইটাইনের জনপ্রিয়তার প্রতি ঈর্ষান্বিত হয়ে রাজা তাঁকে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেন। সেই দিনটি ছিল ১৪ ফেব্রুয়ারি। অতঃপর ৪৯৬ সালে পোপ সেন্ট জেলাসিউও ১ম জুলিয়াস ভ্যালেইটাইন স্মরণে ১৪ ফেব্রুয়ারিকে ভ্যালেন্টাইন’স দিবস ঘোষণা করেন। উৎপত্তির ইতিহাস এতটুকুই।
পৃথিবীর যে-কোনো মানুষ যে-কোনো উৎসব পালন করতে পারেন। তাতে আপত্তি জানানোর কোনও কারণ নেই। কিন্তু সমস্ত উৎসব পালনের গোড়ায় কিছু চিন্তাধারা কাজ করে। একটু গভীরে গিয়ে ভাবলে দেখা যাবে, সমস্ত উৎসবের পিছনে থাকে একপ্রকার ব্যবসা। যে দিনটি ঘিরে উত্তাল সারা বিশ্ব (বাঙালিদের কাছে সরস্বতী পুজোর দিনটিও দ্বিতীয় প্রেম দিবস)। সামান্য কিছু বছর যদি পিছিয়ে যাই, দেখব আশি-নব্বইয়ের দশকে প্রতিদিন উৎসবের ঘনঘটা তেমন ছিল না। ১৪ ফেব্রুয়ারি আর পাঁচটা দিনের মতোই কেটে যেত। একবিংশ শতাব্দীর বিশ্বায়নের পর বাঙালিদের যাপনও সঙ্গে সঙ্গে অনেকখানি পাল্টে গেছে। মোবাইল, টেলিভিশন-কেবল, ইন্টারনেট, ফাস্টফুডের অধিক ব্যবহারের পর অর্থনীতিও বদলে গেছে। সঙ্গে বদলেছে মন-মানসিকতা। ব্যবসার আড়ালে বাসা বেঁধেছে একগুচ্ছ প্রলোভন। মানুষ যত দিশাহীন হয়েছে, ততই বেড়েছে বেঁচে থাকার জন্য ‘উপকরণ’-এর চাহিদা।

সাহিত্যিক স্বপ্নময় চক্রবর্তী মনে করছেন, “আমাদের দেশে মাঝে মাঝেই নতুন নতুন দেবতা আসেন। দেবতাদের সঙ্গে সঙ্গে নতুন পুজোও আসে। সবটার পিছনেই কিন্তু ব্যবসা রয়েছে। উৎসব হলে বাজারদর বেড়ে যায়, সেটা ব্যবসায়ীরা জানেন। উচ্চবিত্তদের থেকে যে জিনিস ছড়ায়, তা তাড়াতাড়ি সমাজের সর্বত্র পৌঁছে যায়। সেলিব্রিটিদের পোশাক বা চুলের স্টাইল একজন সামান্য দরিদ্র পরিবারের ছেলে-মেয়েও অনুকরণ করছে। এরকম বিশেষ দিন নিয়ে আমার সত্যিই কোনও মাথাব্যথা নেই।”
কথায় আছে ‘হুজুগে বাঙালি’। অনুকরণ না হলেও, অনুসরণ করা তার অন্যতম স্বভাব। অবশ্যই তার ভালোমন্দ সবদিকই বিচার্য। কিন্তু ‘প্রপোজ ডে’, ‘চকোলেট ডে’, ‘রোজ ডে’ বা ‘ভ্যালেন্টাইন’স ডে’ নিয়ে ব্যস্ত থেকে আমরা ভুলে যেতে চাই আমাদের অতীত। আমাদের শাশ্বত ধারণাগুলো। একদল মানুষ যদিও মনে করেন, গরিবপ্রধান দেশে উৎসব নিয়ে এত হুল্লোড় কীসের! এ কথার পিছনেও কোনও যুক্তি নেই। বিষয় সেটা না। হঠাৎ ‘গজিয়ে ওঠা’ বিশেষ দিবস পালনের পিছনে যে যে ‘কেন’গুলো কাজ করছে, তার বিভিন্ন দিক নিয়ে কি ভাবব আমরা? ভাবলে কতটুকু?
নয়ের দশকের আগে এই দিনটি নিয়ে বিশেষ মাথাব্যথা ছিল না বাঙালিদের। সপ্তদশ শতাব্দীতে ইংল্যান্ডে ভ্যালেন্টাইন’স ডে পালন করা শুরু হয়। একে একে ইউরোপের অন্যান্য দেশে ও আমেরিকাতেও। ভারতের কিছুই যায়-আসেনি তাতে। নয়ের দশকে অর্থনৈতিক মুক্তির পর বিশ্বায়নের যে জোয়ার এল, তার স্রোতে পশ্চিমী দেশগুলির অনেক সংস্কৃতি ও আচার-আচরণের সঙ্গে ভ্যালেন্টাইন’স ডে-ও ঢুকে পড়ল বাঙালির মনে। যদিও কমবয়সিদের মধ্যেই প্রভাব ফেলেছিল বেশি। সময় যত গড়িয়েছে এই দিন তত বেশি ডালপালা মেলেছে।

লেখা প্রসঙ্গে বারবার মনে পড়ছে ২০১৮ সালের ৬ সেপ্টেম্বরের কথা। যেদিন ভারতবর্ষ নতুন করে উত্তাল হল, নতুন দিশা দেখল। কিন্তু দেখা গেল, তাতে খুশি হলেন মাত্র ৪০ শতাংশ মানুষ। এই দিন আসলে ৩৭৭ ধারা বাতিল হওয়ার দিন। ধারায় লেখা ছিল- সমকামিতা ‘অপ্রাকৃতিক অপরাধ’। প্রকৃতির বিরুদ্ধে কোনও মানুষ, মহিলা বা পশুর সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করলে তা অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে৷ এবং এই অপরাধে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হবে বা ১০ বছর হাজতবাসের সঙ্গে জরিমানা৷ মধ্যযুগীয় এই ৩৭৭ ধারা বাতিল হওয়ার পর কেটে গেছে প্রায় দুই বছর। অথচ ঠিকঠাক কোনও আলো দ্যাখেনি রামধনুর মানুষরা। ভ্যালেন্টাইন’স ডে এখনও ৯০ শতাংশ মানুষের কাছে নারী-পুরুষের ভালোবাসার দিন। সেখানে কোথাও সমপ্রেম বা উভপ্রেম নিয়ে কথা বলা হয় না। এমনকি বাঙালির দ্বিতীয় ভ্যালেন্টাইন’স ডে সরস্বতী পুজোতে সোশ্যাল মিডিয়ায় একের পর এক পোস্ট – শাড়িতে-পাঞ্জাবিতে ভালোবাসা। বিষয়টা যদি শাড়িতে-শাড়িতে বা পাঞ্জাবিতে-পাঞ্জাবিতে হয়? সেটা কি তবে ভালোবাসা নয়? কেন ১৪ ফেব্রুয়ারি হয়ে উঠবে না সকল শ্রেণির সকল ভালোবাসার দিন?
এ প্রসঙ্গে অভিনেত্রী সুদীপ্তা চক্রবর্তী বলছেন, “একটা সময় আমাদের বাবা-মায়েরা কিন্তু লুকিয়ে প্রেম করতেন। কারণ সে-সময় ছেলে-মেয়ের প্রেম করাটা পরিবার বা সমাজ গ্রহণ করত না। পরে আস্তে আস্তে এই প্রেম স্বাভাবিক হয়েছে। সেরকমই এখন অনেক বাড়িতেই সমপ্রেম গৃহীত হয়নি। সমাজের কথা তো ছেড়েই দিলাম। আমার মনে হয় ১৫-১৬ বছর পর সমপ্রেমও সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠবে। যেহেতু অনেকেই এই বিষয় নিয়ে অবগত নন, তাই তাঁদের বুঝতে একটু সময় লাগবে। আমাদেরও উচিত বোঝানোর এবং প্রেম দিবস সে-রকমভাবেই পালন করা উচিত। যাতে বিশেষ কোনও এক শ্রেণি বা বিশেষ কোনও এক লিঙ্গের হাতে চলে না যায় এই সমাজব্যবস্থা।”
শান্তভাবে ভাবলে মাথাতে সেই ‘হুজুগ’ শব্দটিই আসে। আর স্বপ্নময় চক্রবর্তীর কথা প্রসঙ্গে আসে ‘ব্যবসা’। দৈনন্দিন সমাজব্যবস্থায় কোথায় বদল আনতে পারল ১৪ ফেব্রুয়ারি? আমরা ভাবি না। ক্যালেন্ডারের তারিখে আটকে যাওয়া ‘বিশেষ দিন’ মনে করিয়ে দেয় শ্রেনি-চেতনা, লিঙ্গ-চেতনা। ভালোবাসা – বাঙালিরা নিজের মতো গড়েপিটে নিক। শুধু, তাতে যেন গোঁড়ামি না থাকে। ভাঁড়ামো না থাকে। ভালোবাসা প্রতিদিন গোলাপে ফুটুক – ঝরে যাক – আবার ফুটুক।

