
সম্প্রতি পদ্ম-পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করেছেন বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়, অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায়
শুরু করা যাক, রামনাথ তর্কসিদ্ধান্তের প্রসঙ্গ টেনে। সকলেই আজ এই বাঙালি শিক্ষককে ভুলে গেছেন। তাঁর গুরুকূলের ছাত্রছাত্রীদের ব্যয়ভার তিনি নিজেই বহন করতেন। রাজা বা ধনী ব্যক্তিদের থেকে কোনও অর্থ সাহায্য নিতেন না। একবার কলকাতায় মহারাজ নবকৃষ্ণের সভায় এক দিগ্বিজয়ী পণ্ডিত এসেছেন। নবদ্বীপের প্রধান নৈয়ায়িক শিবনাথ বিদ্যাবাচস্পতি এবং বাঁশবেড়িয়ার ডাকসাইটে পণ্ডিত জগন্নাথ তর্কপঞ্চানন সেই পণ্ডিতের কাছে একে একে পরাজয় স্বীকার করলেন। বাংলার মান যায় যায়। রাজসভা থেকে খবর গেল শিক্ষক রামনাথের কাছে। রামনাথ সাধারণত পাণ্ডিত্যের দেখনদারি পছন্দ করতেন না। কিন্তু স্বভূমির পণ্ডিত সমাজের মান রক্ষায় তাঁকে যেতেই হল। তাঁর পরাক্রমী পাণ্ডিত্যের কাছে হার মানলেন সেই দিগ্বিজয়ী পণ্ডিত। নবদ্বীপ এবং বাংলার মুখ রক্ষা হল। রাজা নবকৃষ্ণ খুব খুশি। আপ্লুত মহারাজ প্রচুর ধনরত্ন দিতে চাইলেন রামনাথকে। সেই পুরস্কারকে ‘কাকবিষ্ঠা’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন রামনাথ। (তথ্যঃ এক ভুলে যাওয়া বাঙালি শিক্ষকের কাহিনি- শুভাশিস মৈত্র, ৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৭, বঙ্গদর্শন)
পুরস্কার প্রত্যাখ্যানের ইতিহাস আজকের নয়। কিন্তু বিষয়টা যখন বাঙালির হয়, তখন গোটা দেশ উত্তাল হয়ে পড়ে। কারণটা স্বাভাবিকভাবেই বিশ্বজুড়ে বাঙালিদের ছড়িয়ে থাকা এবং আবিশ্ব বাংলা ভাষাকে সগর্বে প্রচার করা। যদিও সময় বদলানোর সঙ্গে সঙ্গে পাল্টে গেছে বাঙালিদের চরিত্র। কিন্তু আবেগ আর নস্টালজিয়া বাঙালিদের পিছু ছাড়েনি। শিকড় আরও বেশি করে জাঁকিয়ে বসেছে মননে, অভ্যাসে। এই শিকড়কে উপড়ানো খুব কঠিন।
মঙ্গলবার সন্ধেয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে ভারতের অন্যতম সর্বোচ্চ সম্মান পদ্মশ্রী, পদ্মভূষণ, পদ্মবিভূষণের তালিকা প্রকাশ করা হয়৷ প্রতিবারের মতো জ্বলজ্বল করছিল কয়েকজন বিশিষ্ট বাঙালি ব্যক্তিত্বের নাম। কিন্তু কিছু কিছু সময় আসে, যখন পুরস্কারপ্রাপ্তির চেয়ে বড়ো হয়ে ওঠে পুরস্কার প্রত্যাখ্যানের খবর। গীতশ্রী সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়, রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য এবং সংগীতশিল্পী পণ্ডিত অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায় প্রত্যাখ্যান করেছেন পদ্মশ্রী এবং পদ্মভূষণ।
প্রাপ্তির মতোই বাঙালির পুরস্কার প্রত্যাখ্যানের ইতিহাস ঐতিহ্যবাহী এবং সমৃদ্ধশালী৷ ‘রাষ্ট্র’ নামক প্রতিষ্ঠানকে এককথায় ‘না’ বলতে পারার ধক দেখিয়েছিলেন অনেক কৃতি বাঙালিই। এর আগে পদ্ম-প্রত্যাখ্যান করেছিলেন নাট্যাচার্য শিশিরকুমার ভাদুড়ি (১৯৫৯), অভিনেতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় (১৯৭০), সংগীতশিল্পী তারাপদ চক্রবর্তী (১৯৭৪), সংগীতশিল্পী হেমন্ত মুখোপাধ্যায় (১৯৮৮), অভিনেতা উৎপল দত্ত (১৯৯১), সংগীত পরিচালক সলিল চৌধুরী (১৯৯২), নাট্যকার বাদল সরকার (১৯৭২, ২০১০), শাস্ত্রীয় সংগীত শিল্পী বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত (২০১১)। স্বমহিমায় আজও উজ্জ্বল তাঁরা। কেউ নিজস্ব আদর্শ, নিজস্ব রাজনীতি এবং প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতিকে অস্বীকার করেছিলেন।

উৎপল দত্ত এবং বাদল সরকার প্রত্যাখ্যান করেছিলেন পদ্ম-পুরস্কার
এই লেখাকে অযথা ‘দলীয় রাজনীতি’-র বক্তব্য দিয়ে ম্লান করতে চাই না। বরং একটু অন্যভাবে আলোচনা করা যাক। সমাজের বিশিষ্টজনেরা মনে করছেন, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়কে তাঁর ৯০ বছর বয়সে ‘পদ্মশ্রী’ দেওয়াটা অত্যন্ত অপমানজনক। ওঁর আগেই এই সম্মান পাওয়া উচিত ছিল। সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় এদিন খানিক অভিমানের সুরেই বলেছেন, এই পুরস্কার তিনি গ্রহণ করবেন না। বহু আগেই তাঁর পুরস্কার পাওয়া হয়ে গিয়েছে। সংগীতজগতে এর আগে কারা পদ্মশ্রী পুরস্কার পেয়েছেন, সেই তালিকা কমবেশি সকলেই জানেন৷ সেখানে গীতশ্রীর জীবনের একেবারে শেষ পর্যায়ে এসে এই পুরস্কার দেওয়া খানিক ‘দায়সারা’-ই লাগে। কে এই সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়? তাঁর সংগীতে বাংলা গর্বিত হয়েছে। কিন্তু এর বাইরেও রয়ে গিয়েছে গায়িকার আরও একটি পরিচয়। সেই পরিচয়ের নাম প্রতিবাদী৷ একজন মানুষ হিসাবে তাঁর আদর্শের দিকটি স্পষ্ট হয়েছে আরও। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন যুদ্ধের হাত থেকে বাঁচতে কলকাতা তথা পশ্চিমবঙ্গে আগত লক্ষ লক্ষ উদ্বাস্তুদের জন্য সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় অন্যান্য বাঙালি শিল্পীদের সঙ্গে গণ আন্দোলনে যোগ দেন এবং মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য অর্থ সংগ্রহ করেন। বাংলাদেশের জন্য বিশ্বব্যাপী সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে কাজ করেন তিনি। এমনকি বাংলাদেশী সংগীতশিল্পী সমর দাস, যিনি বাংলাদেশে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র স্থাপন করেছিলেন তাঁর সাহায্যার্থে বিভিন্ন দেশাত্মবোধক গান রেকর্ড করেন নিজের উদ্যোগে। কারাগারে বন্দি নয়া বাংলাদেশের নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের মুক্তি উপলক্ষে সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের গাওয়া ‘বঙ্গবন্ধু তুমি ফিরে এলে’ গানটি মুক্তি পায়। এবং ভীষণ জনপ্রিয় হয়। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর, প্রথম একুশে ফেব্রুয়ারির উদযাপন উপলক্ষে ঢাকায় পল্টন ময়দানের একটি উন্মুক্ত কনসার্টে অনুষ্ঠান করা অন্যতম প্রথম বিদেশি শিল্পীদের মধ্যে একজন ছিলেন কিংবদন্তি সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের দেওয়া বহু পুরস্কারই তিনি পেয়েছেন, কিন্তু কেন্দ্রীয় সরকারের তরফে কোনও পুরস্কার পাননি।

পশ্চিমবঙ্গ সরকারের দেওয়া বহু পুরস্কারই পেয়েছেন গীতশ্রী সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়
অন্যদিকে রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী এবং বর্তমানে সিপিএমের পলিটব্যুরোর সদস্য বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের ‘আদর্শ’ নিয়ে আজও আবেগাপ্লুত হন বাংলার বিশিষ্টজনেরা। রাজনীতির বাইরেও তিনি ছিলেন একজন সাহিত্যপ্রেমী এবং সংস্কৃতিমনস্ক। খাদ্য আন্দোলন, ভিয়েতনামে আমেরিকার কার্যকলাপের সক্রিয় বিরোধিতার মতো নানান দেশ ও বিদেশের স্মরণীয় ঘটনায় তাঁর ভূমিকা অনস্বীকার্য। ১৯৯১-এর নির্বাচনের পরের সময়ে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে তাঁর মতানৈক্য দেখা দেয়। সেই ভ্রষ্টাচারের বিরূদ্ধে প্রতিবাদ করে তিনি মন্ত্রীসভা থেকে বেরিয়ে আসেন এবং রচনা করেন ‘দুঃসময়’ নাটক। আজীবন বুদ্ধদেববাবু পুরস্কারের আড়ালে থেকেছেন। বলেছেন, মানুষের মধ্যে মিলেমিশে থাকাই তাঁর একমাত্র আদর্শ। তাই ‘পদ্মভূষণ’ তালিকায় নিজের নাম দেখে তা প্রত্যাখ্যান করে বিবৃতিতে লিখেছেন, “পদ্মভূষণ পুরস্কার নিয়ে আমি কিছুই জানি না। আমাকে এ নিয়ে কেউ কিছু বলেনি। যদি আমাকে পদ্মভূষণ পুরস্কার দিয়ে থাকে, তা হলে আমি তা প্রত্যাখ্যান করছি।” হিন্দুত্ববাদীদের ‘বিপদ’ সম্পর্কে বারংবার রাজ্যকে অবহিত করেছেন বাংলার এই শেষ কমিউনিস্ট মুখ্যমন্ত্রী। জীবনের উপান্তে এসে তাদের দেওয়া সম্মান নেবেন না, সেটাই হয়তো স্বাভাবিক।

রাজনীতির বাইরেও বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য ছিলেন একজন সাহিত্যপ্রেমী এবং সংস্কৃতিমনস্ক
অপরপক্ষে শাস্ত্রীয় সংগীতশিল্পী পণ্ডিত অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায়ও প্রত্যাখ্যান করেছেন পদ্মশ্রী। ফারুখাবাদ ঘরানার এই শিল্পী তাঁর নিজের জগতে ইতিমধ্যেই প্রবাদপ্রতিম। নিখিল বন্দ্যোপাধ্যায়, রবিশংকর, আলি আকবর খান, আমজাদ আলি খানের মতো শিল্পীদের সঙ্গে কাজ করেছেন। মঙ্গলবার এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, পদ্মশ্রী পুরস্কার পাওয়ার সময় পেরিয়ে গিয়েছে। অনেকদিন আগেই তাঁর পদ্মশ্রী পাওয়া উচিত ছিল। এখন এত দিন পরে এসে পদ্মশ্রী পাওয়াটা তাঁর মতো প্রবীণ শিল্পীর জন্য সম্মানজনক নয়।
জীবনের উপান্তে শিল্পীকে পুরস্কার দেওয়ার দায়সার হোক কিংবা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে প্রত্যাখ্যানের গল্প হোক — বাঙালিদের জেদের কাছে নত হতে হয়েছে অনেককেই। তবুও এই প্রত্যাখ্যান তালিকায় যে দুটি নাম বারবার চলে আসে, তাঁরা বাঙালি না হলেও প্রতিটা যুগে প্রতিটা ভাষাকে পথ দেখান। ‘নোবেল’ প্রত্যাখ্যান করেছিলেন জাঁ পল সার্ত্রে এবং লে ডাক থো। ১৯৬৪ সালে জাঁ পল সার্ত্রে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারের জন্য মনোনীত হলেও আনুষ্ঠানিক সম্মানের প্রতি তাঁর অনীহার কারণে সেই নোবেল পুরস্কার তিনি গ্রহণ করেননি। অন্যদিকে, ভিয়েতনামের লে ডাক থো ১৯৭৪ সালে আমেরিকান কূটনীতিক হেনরি কিসিঞ্জারের সঙ্গে যৌথভাবে ভিয়েতনামে যুদ্ধবিরতির মধ্যস্ততার জন্য নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য মনোনীত হলেও শেষ পর্যন্ত তাঁর দেশে শান্তি ফিরে না আসায় তিনি নোবেল পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করেছিলেন।

পদ্ম-পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করেছিলেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়
অন্যদিকে বাংলার আরেক প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুও প্রত্যাখ্যান করেছিলেন ভারতের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মান ‘ভারতরত্ন’। প্রত্যাখ্যান করার পর বিবৃতিতে জানিয়েছিলেন, “কমিউনিস্টরা মানুষের মাঝখানে থেকেই কাজ করেন। রত্ন পাওয়ার জন্য কাজ করেন না।” উৎপল দত্ত ১ সংগীত নাটক অকাদেমি পুরস্কারে সায় না দিয়ে ‘দেশব্রতী’ পত্রিকায় লিখেছিলেন ‘শাহেনশা, তোমার পুরস্কার তোমারই থাক’।

জ্যোতি বসুও প্রত্যাখ্যান করেছিলেন ভারতের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মান ‘ভারতরত্ন’
২০২২ সালের জানুয়ারি মাস। এখনও নতুন বছরের রেশ কাটেনি। ঠিক এমন সময় আলোচনার বিষয় পুরস্কারপ্রাপ্তির নয়, প্রত্যাখ্যানের৷ এখনও কিছু বাঙালি আছেন, যাঁরা আদর্শের কাছে মাথা নত করেননি। হয়তো অভিমান করেছেন, কিন্তু লোভ দেখাননি। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে গুণীজনেরাই শিখিয়ে এসেছেন, কিছু কিছু সময় প্রতিবাদ না করলে শিরদাঁড়া নুইয়ে পড়ে। তখন অনেক চেষ্টা করলেও তা সোজা করার উপায় থাকে না। গোপাল কৃষ্ণ গোখলে বলেছিলেন, “বাংলা আজ যা ভাবে, ভারত তা কাল ভাবে।” তাছাড়া আমাদের মাথার উপর তো রবীন্দ্রনাথ আছেনই। ১৯১৫ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নাইট উপাধি পান। কিন্তু ১৯১৯ সালে পঞ্জাবের জালিওয়ানওয়ালাবাগে ব্রিটিশ পুলিশের গুলিতে তিনশোর বেশি মানুষ মৃত্যুবরণ করায় তিনি এই হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে তৎকালীন ব্রিটিশ সরকার প্রদত্ত নাইট উপাধি বর্জন করে পথ দেখিয়েছিলেন।
উল্লেখ্য, দশকের পর দশক ধরে কলকাতার বাসিন্দা উচ্চাঙ্গ সংগীতশিল্পী রাশিদ খানকে ‘পদ্মভূষণ’ দেওয়া হল। তালিকায় তাঁকে উত্তরপ্রদেশের প্রতিনিধি হিসেবে দেখানো হয়েছে। যদিও তিনি আগে নানান জায়গায় বলেছেন, নিজেকে ‘বাঙালি’ ভাবতেই বেশি ভালোবাসেন।
*মতামত লেখকের সম্পূর্ণ নিজস্ব। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে আঘাত করা এ লেখার উদ্দেশ্য নয়।
