খাদ্য-অখাদ্য, কথা-বার্তা, শিল্প-শিক্ষা, ভাষা-আশা — বাংলা কি কিছু কম পড়িয়াছে?

নির্বাচনে হারানো তো গেল হিন্দুত্ববাদী বিপর্যয়কে, তবে এখানেই কি যাত্রার বিরতি?

মাদের এক বন্ধু মনে করেন, পৃথিবীর সেরা কবিতার একটি, তাঁর মতে শ্রেষ্ঠ বাংলা কবিতা বা ছড়াটি লিখেছিলেন সুকুমার রায়। এই কলমচির উপর বিদ্বান বঙ্গবাসী ক্রোধে নীল হয়ে যাবেন, এই আশঙ্কা নিয়েই বন্ধুর মতটি লিখছি; সেই গুম্ফ-শ্মশ্রুধারী বন্ধুর দৃঢ় অভিমত, বাংলাকে বুঝতে এই লাইনগুলির শরণাপন্ন হতেই হবে, যেমন, ‘দাদা গো! দেখছি ভেবে অনেক দূর —/ এই দুনিয়ার সকল ভাল,/ আসল ভাল নকল ভাল / সস্তা ভাল দামীও ভাল / তুমিও ভাল আমিও ভাল,/ হেথায় গানের ছন্দ ভাল,/ হেথায় ফুলের গন্ধ ভাল/ মেঘ-মাখানো আকাশ ভাল,/ ঢেউ-জাগানো বাতাস ভাল, …’। অনুপম কাব্যটি যতই এগোতে থাকে, পাঠকের হৃদয়ে কেমন যেন একটা বাঙালি প্রলেপ লাগে, একটা ‘একটুকু ছোঁয়া লাগে’ ভালোলাগা, কেমন যেন আধো হাসি আধেক কান্না। কবির আলাপ চলতেই থাকে, ‘গ্রীষ্ম ভাল, বর্ষা ভাল/ ময়লা ভাল ফরসা ভাল/ পোলাও ভাল কোর্মা ভাল/ মাছপটোলের দোল্‌মা ভাল’, আর বাঙালিয়ানা নিজেকে মেলে ধরে আমাদের নিজস্ব ভুবনে। এই বঙ্গচেতনায় কেউ বাদ পড়েনি, কেউ মন্দের তকমা নিয়ে মনখারাপ করে ঘোরে না, আমরা সবাই ভালো আমাদের এই ভালোর রাজত্বে…। এখন আপনি, মাননীয় পাঠক, প্রশ্ন করতে পারেন, এই অধম লেখককে বা নিজেকে — কী হে, সেকালের তুলনায় একালে বাঙালিয়ানায় কি কিছু কম পড়িয়াছে?

অনেকেরই মতে, উত্তরটা হলো, একটা বিরাট হ্যাঁ। এই মতের সমর্থকরা বলছেন, খাদ্য-অখাদ্য, বেশ-পরিবেশ, কথা ও বার্তা, ঢং ও ঢাং, শিল্প ও শিক্ষা, ভাষা ও আশা, সবেতেই বাংলা ‘কিছু কম পড়িয়াছে’। সেকালে মেকলে সাহেব ছিলেন, তিনি ইংরেজি শিক্ষা দিয়ে ইঙ্গ-বঙ্গ বানাতে চেয়েছিলেন, সেই প্রকল্পে মিত্র মশাই হয়েছিলেন মিস্টার মিটার, চট্টোপাধ্যায় সেজেছিলেন চ্যাটার্জি, আর দত্তমশাই বনেছিলেন মি. ডাট। একশো ষোলো বছর আগে বঙ্গবঙ্গ বিরোধী আন্দোলনে, বিদেশি বর্জনে সে ইঙ্গ-বঙ্গ জেন্টলম্যানরা কোণঠাসা হয়েছিলেন। পরে অসহযোগ, আইন অমান্য, সশস্ত্র বিপ্লবীদের রুধিররঞ্জিত আত্মবলিদান, ‘ভারত ছাড়ো’-র দীর্ঘ পথ বেয়ে ভারতের সঙ্গে সঙ্গে বঙ্গ অন্তরাত্মাও আপন হতে বাহির হয়ে বাইরে দাঁড়িয়ে চিনেছিল নিজেকে। রবীন্দ্র-নজরুল, সুকুমার-সত্যেন্দ্রনাথ, অতুলপ্রসাদ-রজনীকান্ত-দ্বিজেন্দ্রলাল খচিত সরণি বেয়ে পৌঁছেছিল সুকান্ত হয়ে শক্তি-সুনীল-সলিলে। ‘সেই সময়’-এ খোঁজা হচ্ছিল বঙ্গের শিকড়, খণ্ডিত স্বাধীনতার বেদনা-বিধুর বাঙালি অনেক অশ্রু, এক নদী রক্ত আর দেড় কোটি উদ্বাস্তু কোলে নিয়ে গেয়েছিল, ‘আজ নয় গুন গুন গুঞ্জন প্রেমে/ চাঁদ ফুল জোছনার গান আর নয়/ ওগো প্রিয় মোর, খোলো বাহু ডোর/ পৃথিবী তোমারে যে চায়…’।

পাশেপাশেই অবশ্য বদলে যেতে থাকে চেনা সুর। রাজনৈতিক বাঙালির রক্তে আবার লাগে বিপ্লব-দোলা। রাশিয়ান সমাজবাদের জারক রসে জারিত বাঙালি কমিউনিস্ট অশ্রুসাগরে আশার ভেলা ভাসায়। তারপর কত তর্ক, শতশত বিতর্ক আর প্রতর্ক। কংগ্রেস-পন্থী সিপিআই, বিপ্লববাদী সিপিএম, চিনা চেয়ারম্যান আমাদেরও চেয়ারম্যান, শ্রেণিশত্রুর শোনিত-রঞ্জিত বিপ্লবের পবিত্র ছুরিকার প্রবাহে ভাসতে ভাসতে কং-পন্থী নকশাল, নক-পন্থী কংশাল, ঘনঘোর দশক সত্তর বেয়ে কবে যে জ্যোতি জ্বলে উঠল বঙ্গে, যা অনির্বাণ থেকেছে সাড়ে তিন দশক। বাঙালিও এই সময়েই বিরিয়ানির ভক্ত, বঙ্গ-গৌরবের অভাবে বচ্চনে মন, বাঙালি শিল্পপতি যেন ডুমুরের ফুল। দুনিয়ার সর্বহারাদের এক করতে গিয়ে কখন যে নিজেরাই সাংস্কৃতিক সর্বহারা হয়ে গিয়েছি, কে জানে! তাই বঙ্গ-ভোটে গুজরাতি অনুশাসন শোনাতে যখন ‘মোটাভাই’ আসেন, আমরা হয়তো মানছি না, কিন্তু তেমন কিছু বলছি না! মমতা যেদিন বলে উঠলেন, ‘বহিরাগত’, চেতনায় কি পড়ল চাবুক? দল বেঁধে তো হারানো গেল হিন্দুত্ববাদী বিপর্যয়কে, তবে এখানেই কি আমাদের যাত্রা বিরতি?

কথা হচ্ছিল কলকাতার এক বিখ্যাত চিকিৎসক ডা. অরিন্দম বিশ্বাসের সঙ্গে। ডাক্তারবাবু ‘বাংলা পক্ষ’ সংগঠন করছেন। তিনি তুললেন শিল্প ও শিল্পপতির প্রসঙ্গ। বলছিলেন, কেন বাঙালি শিল্পপতিরা উৎসাহিত হচ্ছেন না, বাড়তে পারছেন না? এ রাজ্যে মাঝারি বা বড়ো পুঁজির অধিকাংশই যে অবাঙালি, সেই কথাটা ডা. বিশ্বাস বলছিলেন যথেষ্ট আত্মপ্রত্যয় নিয়ে। তাঁর কথায়, অবাঙালিরা এ রাজ্য থেকে টাকা কামিয়ে চলে যাবে, আর আমরা বসে বসে দেখব? সারা দেশ থেকে টাকা কামাতে বাংলায় আসছে, আর বাঙালিরা গরিব হয়ে যাচ্ছে। এমনই একজন অবাঙালি জুতো ব্যবসায়ীর একটি বিজ্ঞাপন দেখালেন ডা. অরিন্দম বিশ্বাস, যেখানে বিরাট একটি জুতোর নীচে রবীন্দ্রনাথের ছবি, তাঁর মৃত্যুদিনে শ্রদ্ধা জানাতে। এটা বাঙালি মানবে? প্রশ্ন ডাক্তারবাবুর। এসব নিয়ে ফেসবুকে কথা বলছেন তিনি। ডা. বিশ্বাস বলছেন, দরকারে বাংলায় প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ করা হোক, চালু হোক ইনার লাইন পারমিট। 

বাংলা পক্ষ যেসব কথা তুলছে, সেগুলি নিয়ে ভাবা দরকার। তবে মনে রাখতে হবে, বাঙালি কেবল দক্ষিণবঙ্গের সমভূমির জাতীয়তা নয়, তা ছড়িয়ে আছে আজকের পুরো পশ্চিমবঙ্গে, উত্তরবঙ্গ-সহ। বাঙালি রয়েছেন অসম, ত্রিপুরা-সহ ভারতের নানা অংশে, রয়েছেন বাংলাদেশ-সহ সারা বিশ্বে ছড়িয়ে। কেউ যেন বাদ না পড়ে যান। সবাই এই নব বঙ্গ জাতীয়তার অংশ হোন, এটাই শুভ পক্ষ। 

শুরু করেছিলাম সুকুমার রায় দিয়ে। ওই স্বল্পায়ু কবির আরেকটি পদ্যের কয়েক লাইন মনে পড়ে? রাজা বলে, “কেইবা শোনে যে কথাটা ঘুরছে মনে,/ মগজের নানান কোণে — আনছি টেনে বাইরে তায়,/ সে কথাটা বলছি শোনো, যতই ভাব যতই গোণ,/ নাহি তার জবাব কোনো কূলকিনারা নাইরে হায়!/ লেখা আছে পুঁথির পাতে, ‘নেড়া যায় বেলতলাতে’,/ নাহি কোনো সন্দ তাতে — কিন্তু প্রশ্ন ‘কবার যায়?’

সেই বিলিতি ভক্তির সময় থেকে আজ পর্যন্ত, বাঙালি বেলতলায় বারবার যায়, কখনো কালো সাহেব হবার আশায়, কখনো-বা বোম্বাইয়া হিরোর মতো বেশভূষায়। পরানুকরণের সেই ট্র্যাডিশন সমানে চলছে। সুকুমার জানিয়েছিলেন, ‘হরে দরে হয়তো মাসে নিদেন পক্ষে পঁচিশ বার’ নেড়া বেলতলায় যায়। নেড়া গিয়েছিল, নেড়া যাচ্ছে, নেড়া যাবে। আমরা নেড়া না-কি?

*মতামত লেখকের ব্যক্তিগত। 
কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে আঘাত করা এ লেখার উদ্দেশ্য নয়।

Developed by DXDasia