
বঙ্কিমচন্দ্রের ‘রাজসিংহ’ উপন্যাসের কথা মনে আছে? রূপনগরের রাজকুমারী কীভাবে মহারাণা রাজসিংহের প্রেমে পড়েছিলো, তা মনে রাখার মতোই বিষয় বটে। সে যুগের শিল্পীর হাতে আঁকা ছবি থেকে ফটোগ্রাফি, পত্রমিতালি হয়ে আজকের দিনে একটি ডিজিটাল পৃষ্ঠা — সব জায়গাতেই কিন্তু প্রেমের ফাঁদ পাতা থাকতে পারে। প্রেম না হোক ভালোলাগা, সেখান থেকে যোগাযোগ, তারপর বন্ধুত্ব এবং আরও কিছু বেশি। হ্যাঁ, আজকের ডিজিটাল যুগের ডেটিং-অ্যাপের কথাই বলছি। “Love at first sight” কথাটি কিন্তু আজকের প্রজন্মের ক্ষেত্রে ঠিক ততখানি প্রযোজ্য নয়, যতখানি প্রযোজ্য “Love at first swipe” কথাটি।
Match.com (১৯৯৩)-কে-ই পৃথিবীর প্রথম যথার্থ ডেটিং ওয়েবসাইট হিসেবে ধরা হয়। এরপর প্রযুক্তির বিকাশের সঙ্গে সঙ্গেই নানান বিবর্তনের মাধ্যমে ভৌগোলিক অবস্থানভিত্তিক প্রথম ডেটিং অ্যাপটির লঞ্চ হয় ২০০২ সালে জার্মানির বার্লিন শহরে। এলজিবিটিকিউ মানুষদের পারস্পরিক যোগাযোগের স্বার্থে প্রথম বৈপ্লবিক পদক্ষেপ এই ‘PlanetRomeo’ অ্যাপটিই। তারপর প্রযুক্তি-ব্যবসার প্রতিযোগিতা এবং সামাজিক বিপ্লবের ফসল হিসেবে একে একে চলে আসে- OkCupid (২০০৪), Grinder (২০০৯), Badoo (২০১০), Flip (২০১০), QuackQuack (২০১০), Tinder (২০১২), Blued (২০১২), Hinge (২০১২), Bumble(২০১৪), TrulyMadly (২০১৪), Happen (২০১৪), Woo (২০১৪), Aisle (২০১৪) প্রভৃতি ডেটিং অ্যাপগুলি। উদ্ধৃত সমস্ত ডেটিং অ্যাপই আমাদের দেশে কম-বেশি ব্যবহৃত এবং জনপ্রিয়।
কেন আমি ডেটিং অ্যাপ-এর সঙ্গে ‘সামাজিক বিপ্লব’ কথাটি যোগ করলাম, সে প্রসঙ্গে আসি। এখানে বলে রাখি, সমাজ ও ব্যক্তি জীবনে ডেটিং অ্যাপের প্রভাব — এই বিষয়টির আলোচনা মূলত ভারতীয় সমাজের প্রেক্ষিতে রেখেই এগোবে। একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে ‘অফলাইন’ ব্যাপারটির জায়গা আমদের জীবন-অভ্যেসের মধ্যে অনেকখানি কমে এসেছে। আজকের ডিজিটাল ইন্ডিয়াতে ফর্মফিলাপ, পড়াশোনা, ক্লাস, পরীক্ষা, জিনিসপত্রের বেচাকেনা, অফিসের কাজ, চিকিৎসা, খেলাধূলা, বিনোদন -এ সবকিছুই কিন্তু অনলাইনে করা সম্ভব হচ্ছে। বিশেষ করে সম্প্রতি করোনা মহামারির মধ্যে এই প্রবণতা সবচেয়ে বেশি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সুতরাং সময়ের দাবি মেনে ভার্চুয়াল মাধ্যমে বন্ধুত্ব, প্রেম, এমনকি বিয়ে সম্ভব হবে নাই-বা কেন?

একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে ‘অফলাইন’ ব্যাপারটির জায়গা আমদের জীবন-অভ্যেসের মধ্যে অনেকখানি কমে এসেছে। আজকের ডিজিটাল ইন্ডিয়াতে ফর্মফিলাপ, পড়াশোনা, ক্লাস, পরীক্ষা, জিনিসপত্রের বেচাকেনা, অফিসের কাজ, চিকিৎসা, খেলাধূলা, বিনোদন -এ সবকিছুই কিন্তু অনলাইনে করা সম্ভব হচ্ছে।
আজকের নিউক্লিয়ার ফ্যামিলির যুগে অ্যারেঞ্জ ম্যারেজ ব্যাপারটি বড্ড বেশি পরিবারতান্ত্রিক এবং ‘সেকেলে’। বর্তমান প্রজন্মের অনেকেরই ‘বিবাহ’ ব্যবস্থার প্রতিই কোনোও আস্থা নেই। আবার আমাদের দেশে সমকামী তথা এলজিবিটিকিউ মানুষদের কাছে ‘বিবাহ’ ব্যাপারটি একটি প্রহসন মাত্র। কিন্তু আবার এটিও সত্যি যে কোনোও মানুষই একা থাকতে পারে না; সাময়িক থেকে দীর্ঘকালীন কোনো সঙ্গ, বন্ধুত্ব, ঘনিষ্ঠতা কিংবা প্রেম সকলেরই জীবনে কমবেশি কাঙ্খিত। সেই জায়গা থেকে দেখতে গেলে আজকের দিনে ডেটিং অ্যাপগুলির গুরুত্ব কিন্তু যুগান্তকারী। এ প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে অধ্যাপক (ড. এপিজে আবদুল কালাম গভঃ কলেজ, নিউটাউন) এবং নাট্যব্যক্তিত্ব (ভাণ থিয়েটার গ্রুপ) গৌরাঙ্গ দণ্ডপাট জানাচ্ছেন, “আমরা আমাদের সময় ভাবতুম, সেট করে ডেট হয় না। ইদানীং অনেকের মনের গেট, ডেট করেই খুলছে বলে শুনছি। মনের আলোবাতাস খেলছে, এইটি হচ্ছে জীবন। তা যদি অ্যাপে আসে ক্ষতি কী! কত দূরের থেকে রোমাঞ্চিত হচ্ছে যুগল, বাপ-কাকা- জ্যাঠা টেরই পাচ্ছেন না, ভাবলেই শিহরণ হয়! মন্দ বলতে, প্রেম-ট্রেমের প্রকৃতি বিচ্ছেদের সম্ভাবনা থেকেই যাচ্ছে। আর, দূরত্ব ঘুচলে, পর্দা উঠলে রোমান্সেরও পর্দা ফাই হওয়ার সম্ভাবনা।”
ডেটিং অ্যাপগুলির ব্যবহার ব্যক্তিগত এবং সামাজিক স্তরে রক্ষণশীলতা এবং লিঙ্গবৈষম্যকে অনেকাংশেই প্রতিহত করতে সক্ষম হয়েছে। সমকামী, বিষমকামী এবং উভকামী -এ সমস্ত যৌনতার মনুষই কিন্তু ডেটিং অ্যাপের সুবিধা পাচ্ছেন। Tinder-এর সহ প্রতিষ্ঠাতা হুইটনি উলফি হার্ড ২০১৪ সালে যখন Bumble অ্যাপটিকে বাজারে আনলেন, তখন তথাকথিত পুরুষতান্ত্রিক কোর্টশিপের ধারণাটি আঘাত পেলো, কারণ Bumble অ্যাপটির মাধ্যমে একজন নারীই প্রথম অ্যাপ্রোচ করতে পারবেন তার আপাতভাবে বেছে নেওয়া মানুষটিকে। নারীর যৌন-স্বাধীনতার বা বলা যায় সমতার এমন প্ল্যাটফর্মকে অস্বীকার করা যাবে কী করে? অন্যদিকে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সমান্তরাল-যৌনতার মানুষেদেরও যৌন-স্বাধীনতা তথা সামাজিক মেলামেশার সিংহদ্বার খুলে দিয়েছে এই PlanetRomeo, Grinder, Tinder, Blued, QuackQuack-এর মতো অ্যাপগুলি। ২০১৭ সালের আগে পর্যন্তও যে সমাজে সমকামিতা সাংবিধানিক অপরাধ বলে গণ্য হতো এবং এখনও পর্যন্ত যে সমাজে সমকামিতা অস্বস্তির কারণ, সেখানে ডেটিং অ্যাপের মাধ্যমে সম-মনস্কদের পারস্পরিক যোগাযোগের এই সুযোগ অভাবনীয়।
ডেটিং অ্যাপের আরও কিছু ইতিবাচক দিক রয়েছে। যেমন—
★ যে ছেলেটি বা মেয়েটি সরাসরি কাউকে অ্যাপ্রোচ করতে সংকোচ বোধ করে, সে কিন্তু ভার্চুয়াল মাধ্যমে অনায়াসেই সেই সঙ্কোচকে কাটিয়ে সাবলীল হতে পারে।
★ ডেটিং অ্যাপে ব্যবহৃত কিছু শহুরে (urban) শব্দ অনেকেরই শব্দ ভাণ্ডার সমৃদ্ধ করতে সাহায্য করে। যেমন- Sapiosexual, Pansexual, NSA (Non String Attachment), SM (Sadomasochism), BDSM (Bondage and Discipline, Dominance and Submission, Sadochism and Masochism), NSFW (Not Safe For Work) ইত্যাদি।
★ নারী-পুরুষ নির্বিশেষে অনেক যৌনকর্মী কিন্তু তাদের ক্রেতাদের সঙ্গে সহজেই যোগাযোগ করতে সক্ষম হন। একই কথা খাটে বডি ম্যাসাজ কিংবা বিউটি সার্ভিসের পেশায় যুক্ত মানুষদের ক্ষেত্রেও।
★ ডেটিং অ্যাপে ‘Looking for’ কলমের বিকল্পগুলি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। Chat, Date, Friends, Networking, Sex, Right Now, Relationship, Open to Possibilities — এই বিভিন্ন বিকল্পগুলি থেকে যে কেউ তার কাঙ্খিত বিষয়টি বা বিষয়গুলি অনায়াসেই বেছে নিতে পারেন।
★এলজিবিটি অ্যাক্টিভিস্ট অভীক চক্রবর্তীর মতে, “এখানে কেউ আসে হুক-আপ করতে, কেউ আসে বন্ধুত্ব করতে, আবার কেউ আসে সম্পর্ক খুঁজতে। আমি এখানে সিম্পলি হুক-আপ করতেই আসি এবং সেটা নিয়েই আমি খুশি।”
পদ্মবনে যেমন সাপ লুকিয়ে থাকে, তেমনি ডেটিং অ্যাপের নেতিবাচক দিকগুলিকেও উপেক্ষা করা যায় না এবং কখনও কখনও সেগুলি অত্যন্ত বিপজ্জনকও হয়ে উঠতে পারে। যেমন—
★তথাকথিত সুন্দর চেহারা এবং সুন্দর প্রোফাইলের অধিকারীরাই সবচেয়ে বেশি মানুষের মনোযোগ আকর্ষণ করতে পারেন। বাকিদের ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতা অনেক সময়ই হীনমন্যতার কারণ হয়ে উঠতে পারে।
★ডেটিং অ্যাপে ফেক প্রোফাইলের ব্যবহার এবং প্রেমের জালে ফাঁসিয়ে শারীরিক ও মানসিক শোষণ, বা আর্থিক প্রতারণার উদাহরণ কিন্তু কম নয়।
★মুক্ত ভাবনার জায়গা থেকে ডেটিং অ্যাপগুলির ব্যবহার শুরু হলেও, রক্ষণশীলতার চোরাস্রোত বয়ে চলে। জাতি, বর্ণ বা সামাজিক অবস্থানের ভিত্তিতে বৈষম্যকরণের অভিজ্ঞতার মুখোমুখি অনেকেই হয়ে থাকেন।
★ন্যুড ছবি শেয়ার করাকে কেন্দ্র করে ব্ল্যাকমেল এবং সাইবার ক্রাইমের ঘটনাও ঘটে থাকে।
★ডেটিং অ্যাপের মাধ্যমে যথেষ্ট বিকল্পের সহজলভ্যতা কোনো দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্ক গড়ে ওঠার পক্ষে অনেক সময় অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়।
★ডেটিং অ্যাপে যথার্থ বন্ধুত্ব এবং সম্পর্কের পরিবর্তে বেশিরভাগ মানুষই শারীরিক আকর্ষণের পিছনে ছুটে বেড়ায়। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে শরীরের অবজেক্টিফিকেশন হয়ে থাকে। কারো কারো মতে এগুলি আসলেই ’sophisticated brothel’ ছাড়া কিছুই নয়।
★নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন চিত্রশিল্পী জানান, “আমি আর কখনোই কোনো ডেটিং অ্যাপ ব্যবহার করবো না, কারণ সেখানে বেশিরভাগ মানুষই বড্ড স্টিরিওটাইপ। তাদের প্রথম প্রশ্নই হয়, ‘U got a place?”
★যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্রী অস্মিতা সান্যালের মতে, “ডেটিং অ্যাপের ব্যবহার অনেকটা নেশার মতো। এমনকি মদ-সিগারেটের চেয়েও খারাপ হতে পারে তা।”
★স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাতা সুদীপ পাল জানাচ্ছেন, “এসব অ্যাপ থেকে বিশেষ লাভ পাওয়া যায় না। কারণ অ্যাপ কোম্পানিগুলি মূলত ব্যবসা করছে। টাকা দিয়ে আপগ্রেড না করালে অ্যাপগুলি থেকে যথেষ্ট সুবিধা পাওয়া সম্ভব নয়। আসলে সবটাই ব্যবসা। একদিকে যেমন অ্যাপ কোম্পানিগুলি ব্যবসা করছে, সেই সঙ্গে Oyo মালিকেরাও।”
★কারো কারো মতে এই অ্যাপগুলিই বহুগামিতা, প্রতারণা, বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক, বিবাহবিচ্ছেদ ইত্যাদির একটা বড়ো কারণ।
★ডেটিং অ্যাপগুলির মাধ্যমে বিনামূল্যে কিংবা স্বল্পমূল্যে ‘যৌনসুখ’ সহজলভ্য হয়ে যাওয়ায় বিভিন্ন যৌনপল্লিগুলোতে ক্রেতাদের ভিড় কমে যাচ্ছে, ফলে যৌনকর্মীদের উপার্জনের ওপর অনলাইন ডেটিং অ্যাপগুলির প্রভাব পড়ছে। এ ব্যাপারে যৌনকর্মী নিশা জানাচ্ছেন, “যদি ফ্রিতেই মিলে যায়, তাহলে টাকা দিয়ে আসবে কেন? দুপুরবেলা আমাদের পাড়ায় ভিড় কমে গেছে। পরে আরও কী হবে কে জানে!”
★এলজিবিটি অ্যাক্টিভিস্ট স্বরূপ সাহার মতে, “ডেটিং অ্যাপ যেমন কমিউনিটির মানুষদের পারস্পরিক যোগাযোগের সেতু, তেমনিভাবেই কমিউনিটির বাইরের হেটেরোসেক্সুয়াল পুরুষেরাও কিন্তু নিছক শারীরিক মজা নিতেই এই অ্যাপগুলির সুবিধে তুলছে। কারণ আমাদের সমাজে এখনও একজন পুরুষের পক্ষে যৌন সংসর্গের জন্য একজন মহিলাকে অ্যাপ্রোচ করা যতটা কঠিন, একজন পুরুষকে অ্যাপ্রোচ করা তার চেয়ে কম কঠিন।”
বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা এবং নেতিবাচকতা নিয়েও কিন্তু ডেটিং অ্যাপ ব্যবহারকারীর সংখ্যা উত্তরোত্তর বেড়েই চলেছে। ব্যক্তিভেদে এবং স্থানভেদে এই অ্যাপগুলি ব্যবহারের অভিজ্ঞতা বিভিন্ন হতে পারে। যেমন, এই অ্যাপগুলির ব্যবহার মূলতঃ শহরকেন্দ্রিক, তাই মফস্বলে কিছুটা হলেও গ্রামগুলিতে এগুলি প্রায় একেবারেই অচল। আবার সব শহরের চরিত্র একরকম হয় না। সেই বিভিন্ন প্রভাবগুলিও প্রতিফলিত হয়ে থাকে সেইসব শহরের ডেটিং অ্যাপ ব্যবহারকারীদের ক্ষেত্রে। কিন্তু এতকিছুর মধ্য দিয়েও যে কথাটি বারবার ঘুরে ফিরে আসছে তা হল, এই ভার্চুয়াল দুনিয়ায় আমরা প্রত্যেকেই কি ক্রমশ এতই একা হয়ে পড়ছি যে, ডেটিং অ্যাপের ওপর আমাদের নির্ভরতা বেড়েই চলেছে! অনেকেই তো আবার এগুলিকে নিছক টাইমপাসের উপকরণ হিসেবেই ব্যবহার করে থাকেন। এখন ভাবুন তো, এরকমই একজন ক্যাজুয়াল ব্যক্তির সঙ্গে একজন সিরিয়াস ব্যক্তির যদি যোগাযোগ হয়, তবে তাদের মধ্যেকার রসায়ন কতটা অনিশ্চত হতে পারে! হয়তো এভাবেই বসন্তে ফোটা কত ফুল ঝরে যায় বৈশাখে। তবু প্রত্যেক শীতের শেষেই ডিজিটাল বসন্তের হাওয়া এসে লাগবেই ডেটিং অ্যাপের জানালা দিয়ে।
____
মতামত লেখকের নিজস্ব
