
ক্যারাটে, ফুটবল, হাই জাম্প, লং জাম্পে ফুটে উঠছে প্রতিভা
রিকশা চালাতে চালাতে অসুস্থ হয়ে পড়েন ওদের বাবা। শেষে মারা যান। ওদের মা কলকাতার সল্টলেকের একটি হোটেলে কাজ করেন। ওরাও সল্টলেকের বস্তিতে ডাস্টবিন থেকে কাগজ কুড়োত। সেখান থেকে ওরা তিন ভাই এখন শিলিগুড়ির একটি আশ্রমে। গত কয়েকমাস ধরে ক্যারাটে, দৌড় প্রতিযোগিতা, সবেতেই ওরা নজর কাড়তে শুরু করেছে।
রোজ সকালে উঠে সল্টলেকের বস্তি থেকে রাস্তা ও ডাস্টবিনের কাগজ কুড়োনোর জীবন এখন ওদের নেই। ওদের কেউ ক্যারাটেতে জেলা স্তরের প্রতিযোগিতায় সোনা জিতে আনছে, কেউ আবার অন্য পুরস্কার। সরকারি বিভিন্ন অনুষ্ঠান যেমন বইমেলা থেকে শুরু করে পুলিশের অনুষ্ঠান সবেতেই ওরা বাজিমাত করছে।
ওদের একজন মিঠুন রায়, বয়স ১৪। পড়ে সপ্তম শ্রেণীতে। আরেক ভাই পলাশ রায়, বয়স ১২, পঞ্চম শ্রেণীর ছাত্র। আর ছোটজন সুজিত রায়, বয়স ১১, পঞ্চম শ্রেণী। ওরা সবাই থাকত সুন্দরবনে। ২০০৯ সালে আয়লা ঝড় হলে ওদের বাড়িঘর উড়ে যায়। ২০১৩ সালে ওদের বাবা ওদের নিয়ে চলে আসেন সল্টলেকের বস্তিতে। বাবার নাম বুধু রায়। সংসার চালাতে বুধু রিকশা চালাতে শুরু করেন। কিন্তু রিকশা চালানোর কঠোর পরিশ্রম করতে করতেই বুধু কঠিন ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়। চিকিৎসার জন্য ছিল না কোনও টাকা। মারা যান অবশেষে। ওদের সংসার চালাতে ওদের মা-কে একটি হোটেলে কাজ নিতে হয়। আয়লার থেকেও যেন সংসারে বেঁচে থাকার এ এক অন্যরকম ঝড়। শেষে ওরা নজরে পড়ে কলকাতার পরমানন্দ যোগানন্দ যোগা আশ্রমের এক সন্ন্যাসীর। শেষে সেখান থেকে সেই আশ্রমের শাখা অফিস শিলিগুড়ি টিকিয়াপাড়ায় পাঠানো হয় ২০১৬ সালে।
শিলিগুড়ি আসার পর থেকে ওদের লড়াই শুরু হয় অন্যভাবে। ওদের প্রতিভা আছে। কিন্তু তার বিকাশ হবে কী করে? সেই ভাবনা থেকে আশ্রমের সঞ্জয় মহারাজের সঙ্গে যোগাযোগ হয় তরুণ সমাজসেবী শক্তি পালের। শক্তি এবং অন্যরা এগিয়ে আসেন ওদের জন্য। নৃত্যশিল্পী মালবিকা সরকার ওদের নৃত্য প্রতিভা বিকাশের জন্য পরিশ্রম শুরু করেন বিনে পয়সায়। ওদের ভর্তি করে দেওয়া হয় ক্যারাটে প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে। সেখানে সুজিত ক্যারাটের হোয়াইট বেল্ট সহ অন্য দিকে নিজেকে দক্ষ করে তোলে নিয়মিত তালিম নিয়ে। গত বছরই সুজিত জেলা স্তরের প্রতিযোগিতায় ক্যারাটে শিখে চ্যাম্পিয়ন হয়ে সোনা জিতেছে। স্কুলের ক্লাসেও এক নম্বর রোল সুজিতের। আবার পলাশ ফুটবল, নৃত্য, ম্যারাথন দৌড় প্রতিযোগিতায় পুরস্কার নিয়ে এসেছে। মিঠুন তার প্রতিভা মেলে ধরছে হাই জাম্প, লং জাম্পে। সল্টলেকের বস্তিতে কাগজ কুড়ানো ছেড়ে শিলিগুড়ি এসে আশ্রমিক পরিবেশে থেকে ওরা যে এভাবে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ঝড় তুলতে পারবে তা ভাবতেই পারেননি আশ্রমের মহারাজ। তিনি জানালেন, তাঁদের আশ্রমে এই তিন ভাই যেমন বিভিন্ন বিভাগে তাদের প্রতিভা মেলে ধরতে পারছে তেমনই অন্য আটজন অসহায় শিশু কিশোর তাদের আশ্রমে থেকে ওদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলছে। কদিন আগে উত্তরবঙ্গ পুষ্প প্রদর্শনীতে পর্যটন মন্ত্রী গৌতম দেব ওদের প্রতিভা দেখে প্রশংসা করেন। সেখানে তারা স্মারক উপহারও পেয়েছে। শিলিগুড়িতে স্কুল ক্রীড়া পর্ষদের সভাপতি মদন ভট্টাচার্য ওদের পাশে থেকে নিয়মিত সহযোগিতা করবেন বলে আশ্বাস দিয়েছেন।
