গিরিজা দেবীর কণ্ঠে বেনারসের সুর মিশে গিয়েছিল বাঙালির হৃদয়ে

‘গৃহবধূ’ গিরিজার শিল্পী হওয়ার নেপথ্য কাহিনি

অ্যায়সি হোলি না খেলো কানহাই রে
ভরি পিচকারি মোরে মুখ পর মারো 
ভিজ গয়ি সারি সারি রে
অ্যায়সি হোলি না খেলো…

টালিগঞ্জ যে কেবল স্টুডিওপাড়া হিসেবে খ্যাত তা কিন্তু নয়। টেকনিসিয়ান্স স্টুডিও শুরু হবার আগে পুরোনো ট্রামডিপো থেকে এগিয়ে ডানহাতে সংগীত রিসার্চ আকাদেমি তার বিরাট ক্ষেত্র, গাছগাছালি আর সবুজ মাঠ নিয়ে আজও দাঁড়িয়ে। ফি-বছর সংগীত সম্মেলনের রেশ প্রতিটি টালিগঞ্জবাসীর গায়ে লেগে থাকে। আরেকটি জায়গা, এই টালিগঞ্জেরই, যা কিছু বছর আগে অবধি ছিল কিন্তু এখন ভেঙে একটি বড়ো অ্যাপার্টমেন্ট হয়ে গেছে, তা হল গিরিজা দেবী (Girija Devi)-র শ্বেতপাথরের সুবৃহৎ অট্টালিকা ও পার্শ্ববর্তী এলাকা। তথাকথিত জমিদারবাড়ি যাঁরা কখনও দেখেননি, গিরিজা দেবীর সে-বাড়ি দেখলে তাঁদের আশাপূরণ হতে পারত। কিন্তু ওই বাড়িটা বড়ো কথা নয়। প্রধান হল, ওই বাড়ি থেকে ভেসে আসা সুর। টালিগঞ্জ আইটিআই-এর পাশের গলিতে সেই বাড়ির পাশ দিয়ে আশি-নব্বই এমনকি শূন্য দশকের প্রথম দিকে যাঁরাই যাতায়াত করেছেন তাঁদের কানে এসেছে কখনও গিরিজা দেবীর কণ্ঠস্বর, কখনও উনি যাঁদের গান শেখাতেন তাদের সুরধ্বনি। এলাকা জুড়ে এক অপূর্ব সুরেলা আবহের সৃষ্টি হত। কত বাঙালি মেয়ে তাঁর কাছে শিখে শিল্পী হয়ে উঠেছে তার হিসেব নেই। বহুজন পরে নাম করেছে। কেউ কেউ রেডিওর নিয়মিত শিল্পী হিসেবে ডাক পেয়েছে।

১৯৩৯ সালে জব্বলপুরে কংগ্রেসের এক সম্মেলনে মাত্র দশ বছর বয়সে গিরিজার প্রথম সুযোগ হয় সংগীত পরিবেশনের। সেই সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন স্বয়ং মহাত্মা গান্ধী। এর পাশাপাশি একটি চলচ্চিত্রে ছোট্ট গিরিজা এক অচ্ছুত মেয়ের চরিত্রে অভিনয়ও করে। ছবির নাম ছিল ‘য়াদ রাহে’।

এখন অনেকে জানলে অবাক হবেন যে স্বাধীনতার পর অল ইন্ডিয়া রেডিও (আকাশবাণী)-তে গান গাইতে হলে যোগ্যতার মাপকাঠি হিসেবে মহিলাদের বিবাহের শংসাপত্র বাধ্যতামূলক ছিল! রসুলানবাঈ, সিদ্ধেশ্বরীদেবী, হীরাবাঈ বারোদেকর, কেশরবাঈ কেরকর, মগুবাঈ কুর্দিকর এমনকি বেগম আখতার পর্যন্ত কারও জন্য এ-নিয়মের বাত্যয় ঘটেনি। কিন্তু কেন ছিল এই নিয়ম? তওয়াইফরা ভারতে এক সময় ছিলেন গীত-সংগীত-নৃত্যের ধারক ও বাহক। ব্রিটিশরা সেই সংস্কৃতি খর্ব করার জন্য তওয়াইফদের সমস্ত সাংস্কৃতিক পরিচয়কে নিশ্চিহ্ন করে তাঁদের সাধারণ যৌনকর্মী আখ্যা দিয়েছিল। তারপর থেকে সংগীতের সাধনা করা ভারতীয় নারীদের ঠিক ‘ভদ্রঘরের মেয়ে’ বলে বিবেচনা করা হত না! গান গাইতে গেলে ‘বিবাহিত’ হতে হত! সেদিক থেকে গিরিজা দেবীকে এমন পরীক্ষার মধ্যে দিয়ে কখনও যেতে হয়নি, কারণ তিনি একে উচ্চবিত্ত পরিবারের মেয়ে এবং সম্ভ্রান্ত পরিবারের বধূ ছিলেন। গিরিজা দেবীর সংগ্রামের জায়গাটা ছিল অন্য।

১৯২৯ সালের ৮ মে উত্তর ভারতের এক গ্রামে ভূমিহার জমিদার রামদেও রাই-এর ঘরে জন্মগ্রহণ করেছিলেন গিরিজা। বাবা নিজেই সংগীতের অনুরাগী বলে তিন কন্যার কনিষ্ঠ গিরিজা খুব ছোটোবেলা থেকে পণ্ডিত সরযূ প্রসাদ মিশ্রের কাছে তালিম নিতে শুরু করেন। রামদেও রাই ততদিনে বারাণসীতে পরিবারসহ থিতু হয়েছেন। সরযূ প্রসাদ থাকতেন তৎকালীন বারাণসীর কবীর-চওরাহ-তে। সেই সময় বহু নামকরা সংগীত শিল্পী ওই জায়গার আশেপাশে বাস করতেন। শিশু গিরিজা যেন এক অপূর্ব সাঙ্গীতিক পরিবেশে লালিত হচ্ছিলেন। খেয়াল, ঠুমরির পাশাপাশি টপ্পা গানেও তাঁর শিক্ষা চলছিল। কিন্তু পণ্ডিত সরযূ প্রসাদ মিশ্র বেশিদিন বাঁচেননি। গুরুর প্রয়াণে গিরিজা ভেঙে পড়েছিলেন। কিন্তু আরেকজন সংগীতজ্ঞ পণ্ডিত শ্রীচন্দ মিশ্র গিরিজাকে আশার আলো দেখান। গিরিজাকে তিনি শিষ্যা হিসেবে গ্রহণ করেন। এরপর ১৯৩৯ সালে জব্বলপুরে কংগ্রেসের এক সম্মেলনে মাত্র দশ বছর বয়সে গিরিজার প্রথম সুযোগ হয় সংগীত পরিবেশনের। সেই সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন স্বয়ং মহাত্মা গান্ধী। এর পাশাপাশি একটি চলচ্চিত্রে ছোট্ট গিরিজা এক অচ্ছুত মেয়ের চরিত্রে অভিনয়ও করে। ছবির নাম ছিল ‘য়াদ রাহে’।

পনেরোয় পড়তে না পড়তেই গিরিজা দেবীর বিয়ে হয়ে যায়। এবং বছর ঘুরতে কোল আলো করে আসে একমাত্র কন্যা সুধা। এখানে একটা কথা বলে রাখা প্রয়োজন গিরিজা দেবীর সংগীতের কেরিয়ার কিন্তু প্রাণ পেয়েছিল বিবাহের পরে। তাঁর স্বামী মধুসূদন জৈন ব্যবসায়ী হলেও গানবাজনার প্রতি তাঁর অনুরাগ ছিল। স্বাধীনতা পূর্ববর্তী ভারতে হিন্দু পরিবারে ‘ঘরের বউ’কে মধুসূদন নির্দ্বিধায় বারাণসী থেকে দূরে সারানাথে বাড়ি ভাড়া করে রাখছেন কেবল স্ত্রীর সংগীতচর্চার জন্য তাও আবার মেয়েকে ছেড়ে, এমন জিনিস তখন ভাবা ছিল অসম্ভব। অনেক সময় পুরুষ শিল্পীদের কেরিয়ার পর্যালোচনায় আমরা তাঁদের স্ত্রী ও সঙ্গীর আত্মত্যাগ নিয়ে আলোচনা করে থাকি কিন্তু নারী শিল্পীদের উত্থানে তাঁদের স্বামীদের অবদানগুলি ভুলে যাওয়া উচিত নয়। মধুসূদন প্রতিদিন গিরিজার গুরুকে নিয়ে সারনাথ যেতেন। সুধাকে দেখভাল করতেন গিরিজার মা। গিরিজার সংগীতশিক্ষা বিফলে যায়নি। সংসার তাঁকে পরাধীনও করেনি। তাঁর প্রথম ‘ব্রেক’ বলা যায় এলাহাবাদ রেডিও স্টেশনে ১৯৪৯ সালে। গিরিজা দেবী তখন সদ্য কুড়ি। তারপর ১৯৫২ সালে আকাশবাণী সংগীত সম্মেলন থেকে তাঁর ভারতজোড়া খ্যাতির শুরু।

 

কিন্তু প্রথমে যে বলেছিলাম গিরিজা দেবীর সংগ্রামের জায়গাটা অন্য, সেটা হল গিরিজা দেবীর মা তাঁকে শপথ করিয়ে নিয়েছিলেন যে তিনি কখনও প্রাইভেট ফাংশন-এ গাইতে পারবেন না। অর্থাৎ কোনও ধনী ব্যক্তির গানের বায়না থেকে তাঁকে দূরে থাকতে হবে। অথচ সে সময় সংগীতের চর্চা কিন্তু অনেকাংশে ধনী ব্যক্তিদের পৃষ্ঠপোষকতায় হত। গিরিজা কেরিয়ারের প্রথম থেকেই তা থেকে বঞ্চিত ছিলেন। এ-ও এক ধরনের গোঁড়ামি। বিবাহের শংসাপত্র তাঁকে জোগাড় করতে হয়নি ঠিকই কিন্তু ওই যে ‘ভদ্রঘরের মেয়েদের’ গান গাওয়া নিয়ে কুসংস্কার, সেই প্রকোপ থেকে মুক্তও হতে পারেননি। শিল্পী নয়, তাঁকে পরিবারের মানুষেরা মূলত ‘নারী’ হিসেবেই প্রাথমিক ভাবে দেখেছিল।

কিন্তু গানের পথে গিরিজা দেবীর কোনওকিছুই বাধা হতে পারেনি। এর প্রথম কারণ তাঁর কণ্ঠস্বর। গিরিজা দেবী সেই বিরল শিল্পীদের একজন যাঁদের কণ্ঠস্বর যন্ত্র থেকে আলাদা করা যায় না। ওঁর প্রথম দিককার ‘হোরি রং ডারুঙ্গি ম্যায় নন্দ কে লালন পে’ দূর থেকে শুনুন, কিংবা ‘কাজরি বরসন লাগি বদরিয়া’ – সানাই বাজছে নাকি কেউ গাইছে বুঝতে পারবেন না। একেকটা মুরকি, তান, পুকার মনে হচ্ছে যেন তারসংগীতের নানা চড়াই-উৎরাই। দ্বিতীয়ত, প্রতিটি গানের ভাব। তাঁর একেকটি ঠুমরি, দাদরা, কাজরি, হোরি- সাঙ্গীতিক দিক থেকে নিখুঁত হবার পাশাপাশি ভাবের ঘরেও পরিপূর্ণ থাকত। তবে তাঁর গানে এই পরিবর্তন আসে ১৯৭৫ সালে মধুসূদন জৈন-এর মৃত্যুর পর। স্বামী বিয়োগে একটি বছর গিরিজা দেবী কোনও প্রোগ্রাম করেননি। কোথাও মুখ দেখাননি। কেবল সংগীতের নীরব চর্চা করে গেছেন। তারপর বহু গুণী মানুষের অনুরোধে, পরিবারের সাহচর্যে তিনি গানে ফিরেছেন। এই নতুন গিরিজা দেবী সম্পূর্ণ আলাদা। শুভ্র বেশ (এবং কিছু বছরের মধ্যে সম্পূর্ণ শুভ্র কেশ), দু-একটা সাদা গয়না এবং তাঁর গানের বোলে তথাকথিত প্রেমরসের অনুপস্থিতি। তাঁর ওই বিশিষ্ট রঙের চোখ দুটি সে সময় সিক্ত থাকত। এরপর গিরিজা দেবী যা গেয়েছেন তার মধ্যে কেবল ভগবতভক্তি টইটুম্বুর হয়ে থেকেছে। আধ্যাত্মিকতা তাঁর সংগীতের প্রাণভোমরা হয়েছে।

গিরিজা দেবীর মা তাঁকে শপথ করিয়ে নিয়েছিলেন যে তিনি কখনও প্রাইভেট ফাংশন-এ গাইতে পারবেন না। অর্থাৎ কোনও ধনী ব্যক্তির গানের বায়না থেকে তাঁকে দূরে থাকতে হবে। গিরিজা কেরিয়ারের প্রথম থেকেই তা থেকে বঞ্চিত ছিলেন।

এখানে একটা কথা বলা আবশ্যক যে, গিরিজা দেবীকে অনেকেই কেবল তথাকথিত সেমি-ক্লাসিকাল শিল্পী বলে অভিহিত করতে চান। তা খুব অস্বাভাবিক নয় কারণ পূরব-অঙ্গের যে ঠুমরি ও অন্যান্য গানের ঐতিহ্য তা তো গিরিজা দেবীর একক প্রয়াসেই বলতে গেলে জনপ্রিয়তা পেয়েছে। সেই প্রকরণের গায়কি তাঁর মধ্যে প্রতিনিধিত্ব পেয়েছে বিশাল ভাবে। কিন্তু তার মানে আবার এমন নয় যে খেয়াল গানে তাঁর বিন্দুমাত্র কম দক্ষতা ছিল। গিরিজা দেবীর শেষ জীবনের একেবারে শেষের এক সম্মেলনে এই নিবন্ধকার তাঁর রাগ দুর্গার ওপর খেয়াল গান শুনেছিল। বাইপাস সার্জারির পরেও ওই রকম খেয়াল পরিবেশনা এবং তানকারি মুখের কথা ছিল না। আর সুর? মধ্যে মধ্যে শ্বাস-প্রশ্বাসের অসুবিধা ছিল কিন্তু একটি স্বরও সেদিন এদিক-ওদিক হয়নি। তাছাড়া, অনেকেই তাঁর নামের সঙ্গে ‘বাবুল মোরা নইহার ছুটহি যায়ে’ ঠুমরিটিকে সমার্থক করে দেন কিন্তু এর পাশাপাশি বহু ঠুমরি আছে যেগুলিতে তিনি অপ্রতিরোধ্য। যেমন, কাফি রাগে ‘ইতনি আরজ মোরি মান’। কিংবা মিশ্র ভৈরবীর ‘মদ সে ভরে তোরে ন্যায়েন’।

গিরিজা দেবীর সংগীত তৈরি হয়েছে বারাণসীতে। কিন্তু এমন বললে অত্যুক্তি হয় না যে তাঁর সংগীত ছড়িয়ে পড়েছিল এই কলকাতার মধ্যে দিয়ে। গিরিজা দেবী যে অবাঙালি এবং সারাজীবন যে-গান গেয়েছেন তার ভাষা বাংলা নয়, তাঁকে ঘিরে বাঙালির শ্রদ্ধা ও উন্মাদনা দেখলে তা বোঝার উপায় নেই।

গিরিজা দেবীর সংগীত তৈরি হয়েছে বারাণসীতে। কিন্তু এমন বললে অত্যুক্তি হয় না যে তাঁর সংগীত ছড়িয়ে পড়েছিল এই কলকাতার মধ্যে দিয়ে। গিরিজা দেবী যে অবাঙালি এবং সারাজীবন যে-গান গেয়েছেন তার ভাষা বাংলা নয়, তাঁকে ঘিরে বাঙালির শ্রদ্ধা ও উন্মাদনা দেখলে তা বোঝার উপায় নেই। দলে দলে বাঙালি ছেলেমেয়েরা তাঁর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেছিল। তিনি অচিরেই বাঙালি সংগীতরসিক ও সাধারণ জনগণের ‘আপ্পাজি’ হয়ে উঠেছিলেন। তাঁর নিজস্ব অনুষ্ঠানগুলি তো বটেই, তাছাড়া পণ্ডিত বিরজু মহারাজ ও গুরু কেলুচরণ মহাপাত্রের সঙ্গে তাঁর যুগলবন্দির অনুষ্ঠানগুলি বাঙালি হল ভরিয়ে দেখেছে। সংগীত রিসার্চ আকাদেমিতে ‘গুরু’ হিসেবে তিনি বহু বাঙালি ছেলেমেয়েকে পূরব-অঙ্গের ঠুমরি, হোরি, কাজরি সহ সংগীতের নানা বিভাগে দীক্ষিত করেছেন। তাই ২০১৭ সালের ২৪ অক্টোবর বিএম বিড়লা হার্ট রিসার্চ সেন্টারে তিনি যেদিন শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন কলকাতার সংগীতপ্রিয় মানুষদের ঢল নেমেছিল সেখানে। গিরিজা দেবী জীবনে বহু পুরস্কার পেয়েছিলেন তাঁর সংগীতের স্বীকৃতিস্বরূপ। পদ্মশ্রী, পদ্মভূষণ, পদ্মবিভূষণ, সংগীত নাটক আকাদেমি পুরস্কার ও সংগীত নাটক আকাদেমি ফেলোশিপ। ভারতে একজন শিল্পীর জীবনে এর থেকে বেশি কিছু চাইবার থাকতে পারে না। কিন্ত অগণিত বাঙালি তথা সমগ্র ভারতের যে-ভালোবাসা তিনি পেয়েছিলেন তা কেবল বিরল শিল্পীদের ভাগ্যেই জোটে।
 

Developed by DXDasia