
এখন আষাঢ় মাস। বৃষ্টি আর রোদ্দুরের সঙ্গে মিলেমিশে যাচ্ছে আম-কাঁঠালের সুবাস। যদিও এ-দেশ গ্রীষ্মপ্রধান। কর্কটক্রান্তির দেশে গ্রীষ্ম কোনও নতুন কথা নয়। হঠাৎ যন্ত্রণার ব্যাপারও নয়। রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, “রজনী নিদ্রাহীন/দীর্ঘ দগ্ধ দিন/আরাম নাহি যে জানে রে/দারুণ অগ্নিবাণে রে…”। বরাবর মনে হয় গ্রীষ্ম মানুষ সহ্য করে নিতে পারে একটাই কারণে যে সে জানে এই তাপিত ঋতুর পর আসে শান্তির বারিধারা। বর্ষা। গাছগাছালি, রাস্তাঘাট, বাড়িঘর- সব সিক্ত হয় বৃষ্টির ধারাস্নানে। বাংলার মানুষও ভিজে ওঠে। গান আসে তার জীবনে।
এমনিতে বর্ষার বহু গান আছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রখ্যাত সব গানগুলো তো আছেই, সঙ্গে বাংলা ছায়াছবির কিছু গান বাঙালি মানসে ভর করে থাকে। সেসব গান শুনলে মনে হয় যেন বৃষ্টি নেমে এল। গানগুলোতে বর্ষার মন্ত্র রাখা আছে। তবে আরও কিছু গান থাকে যেগুলো হয়তো বাংলা ভাষায় গীত নয়, কিন্তু ওই বৃষ্টির গান বলে যেন বাড়ি ফেরার এক তাগিদ অনুভূত হয়। আমাদের পুরোনো পাড়ায় থাকত যে বিদ্যুৎদা, যার মা-বাবা কেউ ছিল না আর বিয়েও হয়নি, সে এই গরমকালে সারা দুপুর একটা গান শুনত। ভারি অথচ অপূর্ব সুরেলা কণ্ঠের এক নারীশিল্পীর গান। বিদ্যুৎদা খুব চাকরি ছাড়ত। কখন ও চাকরি করছে আর কখন ঘরে বসা, বুঝতে পারতাম না। ও কখন বাড়িতে থাকত বলা মুশকিল ছিল। ঠিকে কাজের পুষ্পদিকে বলে দিত বাইরে থেকে তালা দিয়ে যেতে। শুধু যে দুপুরগুলো ওর ঘর থেকে ওই বিশেষ গানটা ভেসে আসত তখন বুঝতাম বিদ্যুৎদা বাড়ি আছে। গানটা ছিল, “অব কে সাওয়ান ঘর আজা…”। মিঁয়া মল্লারের সুরে অপূর্ব এক ঠুমরি। গাইতেন বেগম আখতার (Begum Akhtar)। সাড়ে ছয় কিংবা সাত মিনিটের ওই গানে আখতারি বাঈ সুরের জোয়ার এনে ফেলেন প্রতি বার। আর ওই ‘ঘর আজা’ কথাটা যখন উচ্চ সুরে লাগে, মনে হয়, যারা আজও ঘরে ফিরতে পারেনি ওই সুর তাদের বুকে গিয়ে শেলের মতো বিঁধছে। বেগম আখতারের দুঃখী, সিক্ত কণ্ঠস্বরের প্রতি আমাদের ভালো লাগার সেই শুরু।
বেগম আখতারের কণ্ঠস্বরের প্রতি বাঙালির এত টান কেন? এমন নয় কোনও অবাঙালি সংগীত শিল্পীর প্রতি বাঙালির ভালো লাগা নেই। বরং, রসিক বাঙালি সংস্কৃতির যত সূক্ষ্ম উদ্ভাবন আছে সবেরই আস্বাদন করেছে। দেশ-বিদেশ, জাত-বর্ণ বা লিঙ্গ-যৌনতার ফারাক করেনি। কিন্তু বেগম আখতার ও তাঁর গান যেন বাঙালির ভালো লাগার এক অন্য মাত্রা জুড়ে রয়েছে। তার প্রকৃত কারণ হল বেগম আখতারের সমগ্র জীবনই বাংলা ও বাঙালির সঙ্গে বাঁধা পড়েছে। তিরিশের দশকে কলকাতার কোনও এক সংগীত সম্মেলনে উস্তাদ আতা মহম্মদ খান দর্শকদের অনুরোধ করেছিলেন একজন নামজাদা শিল্পী অনুপস্থিত বলে সকলে কিছুক্ষণ যেন তাঁর প্রিয় ছাত্রী বিবি নামের মেয়েটির গান শোনে। বিবি তৈরি হচ্ছে। কিন্তু অল্প সময় মঞ্চ পেলে মেয়েটি হয়তো আত্মবিশ্বাস পাবে। গান শুরু হল। বিবি খেয়াল ধরল না ঠিকই, তবে পরের পর দাদরা, কাজরি আর ঠুমরি গেয়ে দর্শকদের মাতোয়ারা করে দিল। এতটুকু বয়সের একটি মেয়ের কণ্ঠে এত সুর! শুধু আতা মহম্মদ খান নয়, বিবি পাতিয়ালা ঘরানার বরকত আলি খাঁ সাহেবের কাছে ঠুমরি শিখেছে। দিনের পর দিন তালিম নিয়েছে কিরানা ঘরানার আব্দুল ওয়াহিদ খাঁ সাহেবের কাছেই। এবং সবটাই কলকাতায় বসে। এখানে সে থিয়েটারেও যুক্ত ছিল। তারপর তৎকালীন বম্বে চলে যায় সিনেমা করবে বলে। জদ্দন বাঈয়ের সঙ্গে সংযোগ তৈরি হয়। জদ্দন বাঈ বিবিকে সিনেমায় অভিনয়ের সুযোগ করে দেন। এই বিবিই আসলে পরবর্তী কালের আখতারি বাঈ ফৈজ়াবাদী। কিন্তু সিনেমায় তিনি বেশিদিন থাকেননি।
বেগম আখতার যখন গাইছেন কেউ বলতে পারবে না এগুলো কোনও বাঙালির গাওয়া নয়- এত স্পষ্ট, সুন্দর বাংলা উচ্চারণ। এ-গানগুলিই বেগম আখতারের বাংলা তথা কলকাতা যোগকে চিরদিনের জন্য পোক্ত করে দিয়েছে। এ-বাঁধন বেগম আখতার নিজেও কখনও ছিঁড়তে পারেননি।
বিবাহের প্রস্তাব পান লক্ষ্ণৌয়ের প্রখ্যাত ব্যারিস্টার কাবুলির নবাব ইশতিয়াক আহমেদ আব্বাসির কাছ থেকে। এই বিবাহের মধ্যে দিয়ে তিনি লক্ষ্ণৌয়ের এলিট শ্রেণিতে ঢুকে পড়েন। ধন-দৌলত, হিরে-জহরত আর উচ্চকোটির সমাজ- সব পান। তবে ত্যাগ করতে হয় সংগীত। সেটাই বিবাহের শর্ত ছিল যে! তওবায়েফের জীবনে তিনি ফিরতে পারবেন না। এমন করে কিছু বছর চলার পর আর একাধিক বার মৃত সন্তান প্রসবের শেষে তিনি মারাত্মক অসুস্থ হয়ে পড়েন। তখন ডাক্তার ইশতিয়াক সাহেবকে পরামর্শ দেন বেগমকে বাঁচাতে হলে গানে ফিরিয়ে দিতে হবে। ঠিক তখনই আরেকজন বাঙালি এ-ব্যাপারে সাহায্য করতে এগিয়ে আসেন। তিনি হলেন আকাশবাণী লক্ষ্ণৌয়ের ডিরেক্টর শ্রী সুনীল বসু। তিনি ইশতিয়াক সাহেবকে বহু অনুরোধ করে বেগম আখতারের গান রেকর্ড করেন। বেগম আখতার গান গাইবেন বলে গ্রামাফোন কোম্পানিও গান রেকর্ডের প্রস্তাব দেয়। বেগম আখতার ধীরে ধীরে গান শিখতে এবং শেখাতে শুরু করেন। সংগীত জীবনের এই দ্বিতীয় ইনিংসে তিনি আর আখতারি বাঈ ফৈজ়াবাদী নন, তাঁর নবজন্ম হয় ‘বেগম আখতার’ নামে। ওই নামেই দুটি গান বেরোয়- ‘কোয়েলিয়া মত কর পুকার’ আর ‘সইয়া ছোড় দে’। রেডিওতে গান রেকর্ড করে তিনি এত আনন্দ পান যে বাড়ি ফিরে ক্রমাগত কেঁদে চলেন। তাঁর এই চাপা দুঃখের একটি কারণ ছিল তাঁর মা মুশতারি কিছু বছর আগে মারা গিয়েছিলেন। মা মেয়ের এই রেকর্ডিং শুনে যেতে পারেননি। তারপর গান গাওয়ার প্রস্তাব আসতে শুরু করে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে। সবচেয়ে অভিনব প্রস্তাব দেন বাংলার সত্যজিৎ রায়।
সত্যজিৎ তখন ‘জলসাঘর’ ছবি করছেন। সংগীত পরিচালক বিলায়েত খাঁ বলেন একটি দৃশ্যের জন্য তাঁর বেগম আখতারকেই লাগবে। তাঁর প্রিয় বাংলায় আসতে হবে বলে বেগম আখতার এক কথায় প্রায় রাজি। বংশী চন্দ্রগুপ্তের সেট দেখে তিনি অবাক। এ তো পুরো লক্ষ্ণৌয়ের পরিবেশ! জমিদার বিশ্বম্ভরের নাচঘরে বিরাট আয়নার সামনে, ঝাড়বাতি পরিবেষ্টিত বেগম আখতার তানপুরা ফেলে গাইছেন। পরনে ভারী বেনারসি, গা-ভর্তি গয়না, মাথায় হালকা ঘোমটা আর একটা রত্নখচিত হেয়ার-ব্যান্ড। বেগম আখতার ধরেছেন, ‘ভর ভর আয়ি মোরি আঁখিয়া পিয়া বিন…।” বাংলা ছায়াছবির এ-দৃশ্য বিশ্ব সিনেমার ইতিহাসে অমর হয়ে গেছে।
বেগম আখতারের গানে বৃষ্টি পড়ে। সেই বৃষ্টির নাম চোখের জলও হতে পারে। বাংলা আর বাঙালি এখনও বেগম আখতার তাই ফিরে ফিরে শোনে। সেই গান কাউকে শান্তি এনে দেয়, কেউ আবার পুরোপুরি মুক্তি পেতে চায়।
এরপর বাংলা আর কলকাতার সঙ্গে বেগম আখতারের সম্পর্ক পুনরুজ্জীবিত হল। তিনি ঘন ঘন আসতে শুরু করলেন এই শহরে। তরুণী বিবি যখন এসেছিল সে ছিল আলাদা- মিহি কণ্ঠস্বর, শাস্ত্রীয় সংগীতের ঝকঝকে ছাত্রী। বয়স পনেরো কি ষোলো। আর এবারে যে বেগম আখতার এলেন তাঁর কণ্ঠস্বর ভঙ্গুর কিন্তু টলটলে সুরে ভেজা। গানে স্বর লাগান যখন, মনে হয় মেঘ কাঁদছে। বিবির কণ্ঠের আবেদন ছিল শিক্ষানবিশের। বেগম আখতারের কণ্ঠ তখন শুধুই আবেদনময়। হাজার হাজার দর্শক শ্রোতাকে মোহিত করে দিতে পারে। কিন্তু বেগম আখতার কলকাতায় নিয়মিত আসছেন অথচ বাংলায় গান গাইবেন না তা কী করে হয়? উদ্যোগ নিলেন সুরসাধক জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষ। তাঁর ডিক্সন লেনের বাড়িতেই রচিত ও সুরারোপিত হল একের পর এক কালজয়ী বাংলা গান। বেগম আখতারের কণ্ঠে! ‘কোয়েলিয়া গান থামা’, ‘পিয়া ভোলো অভিমান’, ‘ফিরায়ে দিও না মোরে শূন্য হাতে’, ‘চুপিচুপি চলে না গিয়ে’, ‘ফিরে যা ফিরে যা বনে’ কিংবা ‘জোছনা করেছে আড়ি’। গানগুলি বেশিরভাগই জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষ-কৃত হিন্দি-উর্দু গানের বাংলা ভাবানুবাদ। এসব গানের উচ্চমার্গের কবিত্ব নিয়ে একটা গোটা আলোচনা হতে পারে। কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা বেগম আখতার যখন গাইছেন কেউ বলতে পারবে না এগুলো কোনও বাঙালির গাওয়া নয়- এত স্পষ্ট, সুন্দর বাংলা উচ্চারণ। এ-গানগুলিই বেগম আখতারের বাংলা তথা কলকাতা যোগকে চিরদিনের জন্য পোক্ত করে দিয়েছে। এ-বাঁধন বেগম আখতার নিজেও কখনও ছিঁড়তে পারেননি।
কী ছিল সেই গানগুলিতে? বিরহ ছিল, অভিমান ছিল। আর ছিল প্রেম না পাবার যন্ত্রণা যেন। যেমন, ‘কোয়েলিয়া গান থামা এবার’ গানের কথায় আছে- “প্রিয় বুঝি তোর ওরে পাখি,/মোর মতো তোরে দিল ফাঁকি?/তাই কী রে তুই ডাকি ডাকি,/প্রাণ কাঁদাস দুখিনী রাধার, কোয়েলিয়া…” মাঝখাম্বাজ রাগের আশ্রয়ী এই গানের কথায় রবীন্দ্রকাব্য, বৈষ্ণবপদাবলী আর মানুষী প্রেম মিলেমিশে একাকার হয় গেছে। সে-কারণে এই বাংলা গানগুলোর অমোঘ আকর্ষণ আজও। প্রতিটি প্রেমের ছাই-চাপা দুঃখ এসব গানে প্রাণ পায়, আবার শুশ্রূষাও জোটে। বেগম আখতারের গানে বৃষ্টি পড়ে। সেই বৃষ্টির নাম চোখের জলও হতে পারে। বাংলা আর বাঙালি এখনও বেগম আখতার তাই ফিরে ফিরে শোনে। সেই গান কাউকে শান্তি এনে দেয়, কেউ আবার পুরোপুরি মুক্তি পেতে চায়।
এমনই এক গ্রীষ্ম বিদায় আর বর্ষা আগমনের সময়ে আমাদের পুরোনো পাড়ার সেই বিদ্যুৎদার ঝুলন্ত দেহ উদ্ধার হয়েছিল ওর ঘর থেকে সন্ধ্যাবেলা। ঠিকে কাজের পুষ্পদি বাইরে থেকে ডাকাডাকি করে সাড়া না পেয়ে পাড়ার অন্যান্যদের নিয়ে দরজা ভেঙে পেয়েছিল ওর নিথর শরীর। তখনও নাকি বিদ্যুৎদার ঘরে এক নারী কণ্ঠের গান চলছিল। কার গলা, কী সেই গান কারও আজ আর মনে নেই।
