
১৯১৫ সালে পরাধীন ভারতে পথচলা শুরু করেছিল এই পাইস হোটেল
ঐতিহ্যকে সঙ্গী করে আজও বাঙালির রসনাকে তৃপ্ত করে চলেছে তরুণ নিকেতন। রাসবিহারী মোড় থেকে মাত্র দুই মিনিট হাঁটলেই প্রায় ১০৪ বছরের ইতিহাস নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে এই পাইস হোটেল। আজও এখানে খাবার পরিবেশন করা হয় কলাপাতায়। আপনি চাইলেই পাতে পড়বে ডাল, সবজি, ভাজা, শাক, হাঁসের ডিম, চিকেন, মাটন, মোচার ঘণ্ট, ইলিশ মাছের মাথা দিয়ে কচু শাক আরও কত কি। আর মাছের তালিকা? বেশ দীর্ঘ। প্রতিদিন প্রায় দশ থেকে বারোরকম মাছের পদ পাওয়া যায় এখানে। ইলিশ, পাবদা, চিংড়ি, ভেটকি, চিতল, কই, রুই, কাতলা, তেলাপিয়া তো পাবেনই; ইচ্ছা করলে পেতে পারেন আর কিংবা বোয়াল মাছ। ইলিশের তেল ভাজাও হয় বর্ষায়। ভেটকি পাতুরি থেকে পুঁটি মাছের চাটনিও পেয়ে যাবেন।
১৯১৫ সালে পরাধীন ভারতে পথচলা শুরু করেছিল তরুণ নিকেতন। খাবারের স্বাদ এবং হোটেল কর্মীদের আন্তরিকতায় দ্রুতই খাদ্যরসিকমহলে সমাদৃত হয়ে ওঠে। কিন্তু আজ যখন ভালো পাইস হোটেল বিলুপ্তপ্রায়, ফাটিয়ে ব্যবসা করছে কস্তুরি, ওহ্ ক্যালকাটা, ভজহরি মান্নারা; তখন কেমন চলছে তরুণ নিকেতন? এই দোকানের তৃতীয় প্রজন্মের একজন আমাদের জানান, “এই দোকান প্রথমে পাইস হোটেল হিসাবেই শুরু হয়েছিল। সেই হিসাবেই বেশ রমরমিয়ে চলছে এখনও। এখন অনেক নামীদামী দোকান হয়েছে ঠিকই। কিন্তু তাতে তরুণ নিকেতনের কোনো ভয় নেই। এর কারণ দোকানের বিশেষত্ব। এখনও বাঙালি চান ঘরোয়া খাবার খেতে। আমরা বেশ গর্ব করেই বলতে পারি, একবার যারা তরুণ নিকেতনের খাবার খেয়েছেন, কখনোই তা ভুলতে পারেননি। সেই টানেই বারবার তরুণ নিকেতনে ফিরে আসেন তাঁরা।”
ভাষ্যকার- সুকল্প চট্টোপাধ্যায় | চিত্রগ্রহণ- বিষ্ণু মুখার্জি
পুরোনো খাদ্যরসিকেরা ফিরে ফিরে আসেন তরুণে। দোকানের এক প্রবীণ ক্রেতা বলেন, ১৯৭১ সাল থেকে এখানে আসছেন। আগে মায়ের সঙ্গে এসে মোচার ঘণ্ট খেতেন। এখনও সেই স্বাদের টানে ফিরে আসেন। আর কলাপাতায় ভাত খাওয়ার মজাই আলাদা। তিনি বলেন, “আমার হারিয়ে যাওয়া পূর্ব বাংলার কথা মনে পড়ে যায়। এখন আমার বয়স ৮২ বছর। এই দোকানে খেয়ে কোনোদিন জেলুসিল খেতে হয়নি।”
নতুন প্রজন্মের কাছেও সমান জনপ্রিয় তরুণ নিকেতন। তরুণরাও রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে আবিষ্কার করেন আরেক তরুণকে। সনাতন খাবার, সাবেকি পরিবেশনের কায়দা সবমিলিয়ে তরুণ নিকেতনে বসে খাওয়া মানে তিলোত্তমা কলকাতার একচিলতে ইতিহাসের স্বাদ পাওয়া। ছুঁয়ে দেখা নিজের শিকড় এবং ঐতিহ্যকে।
