
গগনেন্দ্র শিল্প প্রদর্শশালায় চলছে প্রদর্শনী – আলোকবর্ষ
ভারতীয় থিয়েটারের আলোর জাদুকর তাপস সেন। নাটকের নেপথ্য কারিগর তাপস সেনের জন্ম শতবর্ষ উপলক্ষ্যে কলকাতার গগনেন্দ্র শিল্প প্রদর্শশালায় গত ৩ ফেব্রুয়ারি থেকে নাট্যমেলা উপলক্ষ্যে শুরু হয়েছে একটি বিশেষ প্রদর্শনী — আলোকবর্ষ (তাপস সেন ১০০), চলবে আগামী ১৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত।

বিজ্ঞানের ভাষায় আলোকবর্ষ একটি দৈর্ঘ্যের একক। এক জুলীয় বছরে শূন্য মাধ্যমে আলো যতটা দূরত্ব অতিক্রম করে তাকে এক আলোকবর্ষ বলে। কিন্তু সেই আলোকে কাজে লাগিয়ে যিনি শিল্প সৃষ্টি করেন এবং তাঁর সৃষ্টির রেশ থেকে যায় বছরের পর বছর। শুধু বাংলা নাটকের মঞ্চ নয়, সারা ভারতের অসংখ্য প্রযোজনায় কাজ করেছেন তাপস সেন। এছাড়াও পারফর্মিং আর্টের প্রায় সব শাখাতেই তাঁর সৃষ্টির ছাপ রেখেছেন। চলচ্চিত্র, নৃত্যনাট্য, লাইট অ্যান্ড সাউন্ড, এক্সজিবিশন লাইন এইরকম বিচিত্র শাখায় তাঁর নিরীক্ষা আজও মানুষের স্মৃতিতে উজ্জ্বল। তাঁর সর্বভারতীয় কাজগুলোর মধ্যে অন্যতম অশোকা হোটেলের কনভেশনের হলের পরিকল্পনা, ইন্ডিয়া ট্যুরিজমের কাজ, নিক্কো পার্কের রিভার কেইভ, দিল্লি ডেভেলপমেন্ট অথরিটির গেমস ভিলেজ ও থিয়েটার হল নির্মাণ ইত্যাদি। বিদেশে উল্লেখযোগ্য কাজের মধ্যে অন্যতম ১৯৮৫ সালে প্যারিসে ভারত উৎসবে আইফেল টাওয়ারের আলোকসজ্জা। এছাড়াও ১৯৮৭ এবং ১৯৮৮ সালে মস্কোয় ভারত উৎসবের আলোকসজ্জা করেছিলেন তাপস সেন। এছাড়াও সারা ভারতে অসংখ্য প্রেক্ষাগৃহের আলো এবং শব্দ তাঁর নির্দেশনায় গড়ে উঠেছে। কলকাতার কলামন্দির, জি.ডি বিড়লা সভাঘর থেকে বাংলাদেশের জাতীয় নাট্যশালার আলোর পরিকল্পক তিনিই।
ভুবনজয়ী এই শিল্পী ছাত্রাবস্থায় দিল্লিতে পরিচিত ছিলেন ‘লাইটওয়ালা বাঙালি বাবু’ নামে। এই ডাকই যেন নির্দিষ্ট করে দিয়েছিলো ভবিষ্যতের পথ। ১৯২৪ সালের ১১ সেপ্টেম্বর অসমের গোয়ালপাড়া জেলার ধুবড়ি শহরে তাঁর জন্ম। পরে বাবার কর্মসূত্রে শুরু হয় তাঁদের দিল্লিবাসের জীবন। সেখানেই রাইসিনা বেঙ্গলি হাইস্কুলের শিক্ষক প্রতাপ সেন এবং সুশীল রায়চৌধুরীর কাছে আলোক সম্পাতের হাতেখড়ি হয় তাপসের। স্কুলের সরস্বতী পুজোয় ‘রাজপথ’ নাটকে প্রথম আলোক সম্পাতের কাজ করেন ক্লাস নাইনের কিশোর তাপস সেন। এরপর আরও অনেক নাটকে আলোর কাজ তিনি করতে থাকেন। তাঁর সৃষ্টিশীল মনন তাঁকে চাকরি ছাড়িয়ে বরাবরের মতো টেনে আনে আলোছায়ার জগতে। ১৯৪৭ সালে কলকাতায় চলে আসেন, বিনা বেতনেই কাজ শুরু করেন নিউ থিয়েটার্স-এ। সেখানে তাঁর পরিচয় হয় বিজন ভট্টাচার্য, ঋত্বিক ঘটক, মৃণাল সেন, কালী ব্যানার্জী প্রমুখ দিকপাল ব্যক্তিদের সঙ্গে। ১৯৫৪ সালে শম্ভু মিত্র নির্দেশিত ‘রক্তকরবী’ নাটকে আলোক পরিকল্পনা করেন তিনি। ‘অঙ্গার’ নাটকে জলপ্লাবনের দৃশ্য, ‘কল্লোল’ নাটকে বিমান আক্রমনের দৃশ্য, ‘সেতু’ নাটকে বহু আলোচিত সেই ট্রেনের দৃশ্যের কাজ অবিস্মরণীয় করেছে তাপস সেনকে।
নাট্য-নির্দেশক মেঘনাদ ভট্টাচার্য বঙ্গদর্শন.কম-কে জানান, “তাপসদা-কে আলোর কবি বলা যেতে পারে, তাঁর কাজে কাব্য আছে, শিল্প আছে। মঞ্চের ওপর আলো দিয়ে তিনি কবিতা লিখতে পারতেন। সামান্য উপকরণ দিয়ে কীভাবে অসামান্য দৃশ্যপট সৃষ্টি করা যায় সেটা তিনি জানতেন।”

তাপস সেনের কর্ম জীবনের সাক্ষী প্রখ্যাত নাট্য-নির্দেশক মেঘনাদ ভট্টাচার্য বঙ্গদর্শন.কম-কে জানান, “তাপসদা-কে আলোর কবি বলা যেতে পারে, তাঁর কাজে কাব্য আছে, শিল্প আছে। মঞ্চের ওপর আলো দিয়ে তিনি কবিতা লিখতে পারতেন। সামান্য উপকরণ দিয়ে কীভাবে অসামান্য দৃশ্যপট সৃষ্টি করা যায় সেটা তিনি জানতেন।” তিনি আরও জানান, “তাপসদার সঙ্গে আমি তিনটে নাটকে কাজ করেছি। কাজ করতে গিয়ে বুঝেছি পরিচালক কী চাইছেন সেটা বোঝালে ওঁর ক্রিয়েটিভিটি আরও বেড়ে যেত। রিহার্সালের সময় আমি আলোর কাজ কিছুটা এগিয়ে রাখলেও শেষ কথা তাপসদা-ই বলতেন। অল্প কিছু পরিবর্তন করেও যে মঞ্চে আলোক সম্পাতের মানকে কতটা উন্নত করা যায় তা তাপসদার সঙ্গে কাজ না করলে বোঝা সম্ভব হতো না।” শুধু তাঁর নির্দেশিত নাটকই নয় অন্যান্য প্রযোজনার প্রসঙ্গ উল্লেখ করে মেঘনাদবাবু বলেন, তাপস সেন আসলে বিশ্বমানের শিল্পী ছিলেন।

আলোয় ভুবন ভরিয়ে দেওয়া এই শিল্পী ২০০৬ সালের ২৮ জুন পাড়ি দেন অন্য আলোর জগতে। আজীবন আলোছায়ার তপস্যায় মগ্ন এই তাপস প্রকৃত অর্থেই ছিলেন সার্থকনামা। তাই তাঁর আলোছায়ার কৌশলে মানুষ কখনও হয়েছেন মোহিত, কখনও প্রতিবাদী। দর্শকের মনের গোপন কুঠুরিতে আলো ফেলে থিয়েটারে তিনি একাত্ম করেছেন দর্শকদের। তাই সংস্কৃতি প্রেমীদের কাছে তাপস সেনকে ফিরে দেখার সুযোগ গগনেন্দ্র শিল্প প্রদর্শশালার প্রদর্শনী ‘আলোকবর্ষ’। যার মাধ্যমে বিশ্বমানের শিল্পীর সৃষ্টির আলো পৌঁছে যাচ্ছে এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মের কাছে। সেই আলোয় হয়তো অঙ্কুরোদগম ঘটবে নতুন কোনো বীজের।
