হারিয়ে যাওয়া ওয়াটসনগঞ্জ ও কলকাতার প্রথম হাওয়াকল

ওয়াটসন সাহেব গঙ্গাপারে তৈরি করলেন ১১৪ ফুট উঁচু ‘পবনচক্র’

খিদিরপুর অঞ্চলের খানিক দক্ষিণে, নদী ঘেঁষে এঁকেবেঁকে গেছে সে রাস্তা। নাম ‘কবিতীর্থ সরণি’। বহুকাল হল, পুরাতন নাম বদলে এই নতুন নামেই সাড়া দিচ্ছে রাস্তাটি। কিন্তু পুরোনোকে একেবারে সমূলে উৎপাটন করা তো সহজ নয়। পুরোনো নাম সেই থেকেই গেল পুলিশ স্টেশনের নামের মধ্যে। ওয়াটসনগঞ্জ থানা। অঞ্চলটির পুরোনো নাম ছিল এই ওয়াটসনগঞ্জই। কলকাতার এই এক সমস্যা। নামের ভিতরে যেন ধাঁধা লুকোনো। সেখানে স্মৃতি খুঁড়ে খুঁড়ে চলে ইতিহাসের সুলুক সন্ধান। খিদিরপুরের ওয়াটসনগঞ্জও আসলে এমনই ধাঁধার সাক্ষ্য দেয়।

ছিল বনজঙ্গল। নদীর তীরে ইতিউতি নৌকা বা বিদিশি জাহাজের যাতায়াত। সালটা ১৭৭৯। এক ইংরেজ সাহেব বাসা বাঁধলেন খিদিরপুরের দক্ষিণে। আর শুধু বাঁধলেন, তা নয়। আধুনিক রীতিতে জাহাজ তৈরির প্রথম কারখানাও গড়ে তুললেন। সাহেবের নাম- কর্নেল ওয়াটসন। কলকাতায় শিল্পস্থাপনের ফিতে কাটা ওয়াটসন সাহেবের হাতেই। কর্নেল তাঁর জাহাজঘাঁটিতে পেল্লাই দুটো উইন্ডমিল বসিয়েছিলেন। সেটিও কলকাতায় প্রথম। সেই উইন্ডমিল দুটি ছিল একশো চোদ্দ ফুট উচ্চতাবিশিষ্ট। দূর থেকে তাদের ঘোরাঘুরি চোখে পড়ত। লোকে পরস্পরকে জিজ্ঞাসা করত হেঁকে- “কার কল বাতাসে নড়ে?” উত্তর আসত, “ওয়াটসন সাহেবের”। চারপাশের বাড়িঘর ছাড়িয়ে বনবন করে ঘুরত সেই হাওয়াকল বা পবনচক্র। নৌকার পালের মতো কিছু কাপড়ে হাওয়া ধরলেই ঘুরত কলের চাকা। পাঁচ-পাঁচটি তলা ছিল হাওয়াকলে। ধান গম শস্য পেশাই করা তো চলতই। কাঠ চেরাইও হত সেখানে।

কলকাতার আকাশ সেদিন শাসন করত ওয়াটসনের কল। কলকাতা ও দেশের অন্যত্র যখন পশুবলেই এইসব কাজ চলত, সে যুগে নতুন আবিষ্কারে তাক লাগিয়েছিল সাহেব। 

কিন্তু কলকাতার শিল্পপ্রসারের সেই প্রাচীনতম প্রচেষ্টাটি মুহূর্তেই উধাও হয়ে যায়। গোকুল ঘোষাল নামের এক অবস্থাপন্ন স্থানীয় মানুষের হস্তক্ষেপে। ব্যারিস্টার বারওয়েলের ছিল ওয়াটসনের ওপর ভীষণরকম ব্যক্তিগত ক্রোধ। ওয়াটসনের উন্নতি তাঁর মোটেই সহ্য হল না। গোকুল ঘোষালকে  দিয়ে মামলা ঠোকালেন। লম্বা ঢ্যাঙা হাওয়াকলে নাকি অন্দরমহলে টুকি দেওয়ার খুব সুবিধে হয়েছে। তাতে মাথাব্যথার অন্ত থাকছে না। তাই কল উঠে গেল। 

কলকাতার প্রথম শিল্পটি উধাও হল এক মিথ্যা কেসের জাঁতাকলে। 

এবার আপনি বলতেই পারেন, সেই ট্রাডিশন সমানে চলছে। সত্যিই কলকাতা ও তার পাশের কারখানাগুলি এক সময়পর্বে হুহা বন্ধ হয়ে গেল। কল তৈরির আনন্দগুলোও তাই একে একে নিভতে থাকল। অবশ্য, সেসবও বহু যুগ আগের কথা। এখন সেই কলের রাজত্বি আর নেই। মানুষগুলোই আস্ত আস্ত কলে পরিণত হয়েছে।

ওয়াটসন সাহেবের কল মাথা নিচু করে মাটিতে নামল আদালতের নির্দেশে। আর তারপর কলকাতাকে অপেক্ষা করতে হয়েছিল ঢের কিছু বছর। ১৮৪১ সালে নাকি আরেকটি উইন্ডমিল তৈরি হয়েছিল কলকাতায়। আর ব্যান্ডেল থেকে গার্ডেনরিচ অবধি হুগলি নদীর তীরে, কাশিপুরের গান ফাউন্ড্রি রোডে নাকি হদিশ মিলেছিল আরো একটি পবনচক্রের। ওয়াটসন সাহেব নেই। কল তো ছিলই না। কিন্তু ওয়াটসনগঞ্জ নামটির ভিতরে ওই পুরোনো সময়টা কেবলি উঁকিঝুঁকি দিতে থাকে, আজও।

ঋণ- কলের শহর কলকাতা- সিদ্ধার্থ ঘোষ

Post Tags
Developed by DXDasia