সাবেক কলকাতার গায়ে অবধারিত লেপ্টে থাকত এই জানলারা
“…খড়খড়ির ভিতর দিয়ে হাত গলিয়ে ঘরের ছিটকিনি দিতুম খুলে। দরজার ঠিক সামনেই ছিল একটা সোফা; সেখানে অত্যন্ত একলা হয়ে বসতুম।”
(ছেলেবেলা, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)
আলো-ছায়ায় ছক কেটে দেওয়া জানলা। একটা ছোটো কাঠের টুকরো ধরে সামান্য টানেই হুট করে খুলে যায় বাইরের জগৎ। সেই দৃশ্যপট বন্ধও হয়ে যায় ঝুপ করে। কলকাতার সঙ্গে এই জানলার যেন বড়ো অধিকারের সম্পর্ক। এমনিতেই, বাড়ির অন্দরের সঙ্গে বাইরের যে যোগাযোগ, তা শুধু দরজায় হয় না। সেথায় অবধারিত জুড়ে থাকে জানলার গল্প। জানলা নিজেও কত গল্প জানে, কিংবা পদ্য। “ওই জানালার কাছে বসে আছে/ করতলে রাখি মাথা/ তার কোলে ফুল পড়ে রয়েছে,/ সে যে ভুলে গেছে মালা গাঁথা…”
কলকাতা শহর থেকে ইদানীং অবশ্য মুছতে বসেছে সেই রহস্যময়ী জানলার দল। প্রাচীন স্থাপত্যের দিন ফুরিয়েছে। এখনকার বাড়িঘর যতই আকাশ ছুঁক না কেন, দিলদরিয়া সে নয় মোটেই। দেওয়ালে দেওয়ালে ভিতরকেই সে আটক করে রাখে। অন্দরের সমস্ত নকশাই আজ পরিবর্তিত। টানা ঢাউস বারান্দা বদলে হয়েছে শোওয়ার ঘরের ছোট্ট ব্যালকনি। সেখানেই আমাদের সংক্ষিপ্ত বাগান। তাতেই কাপড় মেলা। চিলেকোঠা, ছাদ, ছাদের ওপরে ছাদ– একে একে সেলাম ঠুকে বিদায় নিয়েছে। আর সেই তালেই আলবিদা জানিয়েছে খড়খড়ি থুড়ি ঝিলিমিলি জানলারা।

খড়খড়ি দেওয়া ঝিলিমিলি জানলা। কলকাতার পুরোনো বাড়িগুলোর অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল তারা। সে এক সময় ছিল বটে। দরজা যেমন বিশাল, তেমনি বিশাল জানলা। ছাদ থেকে সোজা নেমেছে একেবারে মেঝে পর্যন্ত। একমানুষ বা তার চেয়েও বেশি উচ্চতা তাদের। শুধু তো উচ্চতা নয়, তার আসল সৌন্দর্য ছিল তার পাল্লায়। পাল্লা বন্ধ হয়ে গেলেও খড়খড়ি খুলে আদানপ্রদান চালানো যেত বাইরের সঙ্গে। পাল্লায় লাগানো ছোটো ছোটো পাত। তার মাঝ-বরাবর লম্বা ডান্ডি। সেই ডান্ডি উঠিয়ে নামিয়েই খড়খড়ির খোলা বন্ধ চলত। আমাদের এই গরম-দেশে খড়খড়ির ভূমিকা কিন্তু কম ছিল না। ভেন্টিলেশনের কাজ হত এই জানলায়। অনেকটা এয়ারকন্ডিশনারের মতো করেই সে শীতল রাখত ঘরদোর। হ্যাঁ, তখন অবশ্য কলকাতায় হাওয়াও চলত খানিক। কৃত্রিম বাতাসের বিশেষ দরকার পড়ত না।
এই খড়খড়ি দেওয়া জানলাকে ইংরেজিতে বলা হয় Louvre Window বা Jalousie Window। Louvre শব্দটার প্রচলন মূলত মধ্যযুগে। শুনেই আন্দাজ করা যায় শব্দটি ফরাসি। আর Jalousie শব্দটির জন্মকাল, অনুমান আঠেরো শতক। ইটালিয়ান জিলাসো শব্দ থেকে তার উদ্ভব। তবে, ইউরোপে কাচ দিয়েই এই জাতীয় জানলাগুলি তৈরি হত বেশি। জানলা বন্ধেও দিব্বি ধরা পড়ত বাইরের রঙ। কিন্তু, বাংলায় তা তৈরি হত কাঠে। ভৌগোলিক পরিবেশের জন্যই এই পার্থক্য। একই ধাঁচের জানলা, কলকাতায় এসে পেয়ে গেল নিজস্ব এক গড়ন।
এমনিতে মধ্যযুগের শুরুতে এমন বহু প্রাসাদ, সাধারণ ঘরবাড়ি আমরা পাব, যার জানলা ছিল পাল্লাবিহীন। তাতে আলো, হাওয়া, বৃষ্টির ছাট সবেরই অবাধ আনাগোনা। জানলার পূর্বসূরী গবাক্ষ। যার অর্থ গোরুর চোখের মতো গহ্বর। তবে, গবাক্ষর আকৃতি আবার অতখানি ছোটোও হত না। এখানে তাই অন্য একটি প্রসঙ্গ মনে পড়ে যায়। ঋকবেদে ‘গো’ শব্দটি আলো হিসেবেও ব্যবহৃত হয়েছে। ‘গোভিরদ্রিমৈরযৎ’। তাহলে কি আলোক বিস্তারের অক্ষ বলেই গবাক্ষ? হতেও পারে।
তবে, এসবের চেয়ে বাতায়ন শব্দটি ঢের ভালো। তর্কে যায় না।

বাংলায় অবশ্য জানালা এসেছে পর্তুগিজ জানেলা থেকে। পাল্লা দেওয়া জানলাও কালাপানির ওইপার থেকে আসা সাদা চামড়াদেরই আমদানি। পাল্লা দেওয়া জানলাকে এক অর্থে প্রযুক্তির উন্নতি হিসেবে দেখা যায়। আবার জীবনধারার পরিবর্তন হিসেবেও। প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের আড়ি হয়েছে যেই, অমনি যেন জানলা দরজা জুড়ে বসেছে শক্ত প্রহরা। তবে এই খড়খড়ি দেওয়া জানলা কিন্তু আড়িভাবের রোমান্টিকতাকে বজায় রাখে। আলো-আঁধারির বাতাবরণ তৈরি করতে পারে বলেই ঝিলিমিলি তার আদুরে নাম। আর শুধু জানলা নয়। দরজাতেও বসানো হত খড়খড়ি।
খড়খড়ি দেওয়া জানলার সঙ্গে বিশেষভাবে যেন জুড়ে ছিল কলকাতার অন্দরমহল। আমাদের মনে পড়ে যেতে পারে অনেকগুলি সিনেমার দৃশ্য। তার মধ্যে একটি চারুলতা। কী অদ্ভুতভাবেই না চারুর অন্দর থেকে বাহিরের যাত্রাপথকে ধরেছেন সত্যজিৎ। বিষবৃক্ষ, ঘরে বাইরে উপন্যাসেও কম ভূমিকা নয় এই খড়খড়ির। অসূর্যম্পশ্যা অন্তঃপুরবাসিনীর কাছে খড়খড়িই ছিল বাইরের দূত। তার গোপন কানাকানির একমাত্র খোলা পথ। আর বাদই বা দিই কেন রবীন্দ্রনাথকে? ছেলেবেলার গন্ডিবদ্ধ রবীন্দ্রনাথ খড়খড়ি-পথেই চোখ মেলতেন প্রাচীন বটের দিকে। ছায়া ঘেরা পুকুরের দিকে। এই খড়খড়ি ছিল বলেই “…খড়খড়ির ভিতর দিয়ে হাত গলিয়ে ঘরের ছিটকিনি দিতুম খুলে। দরজার ঠিক সামনেই ছিল একটা সোফা; সেখানে অত্যন্ত একলা হয়ে বসতুম।” তেতলার ছাদে ভূতে পাওয়ার মতো ঘুরে বেড়ানোর অন্যতম সহায় এই ঝিলিমিলি পথ। খাঁচার পাখি আর বনের পাখির কল্পনার অন্যতম উৎসও ছিল সে।
তবে আজকেও যে ঝিলিমিলির দেখা মেলে না, তা নয়। কিন্তু শার্সির এপারে তার ভূমিকা নেহাৎই শৌখিন। শীতাতপ যন্ত্র তাকে গ্রাস করেছে। আর, আজকাল জানলা দিয়ে আকাশ, রাস্তাঘাট, বিস্তৃত মাঠ দেখার সুযোগই বা কোথায়! বড়োজোর পড়শিবাড়িতে উঁকি মারা যেতে পারে। সারি সারি বাড়ির ভিড়ে জানলা রাখাই যেন দায়।
হাজরা মোড়ে, শিয়ালদা চত্বরে আজও পুরোনো জানলার ফ্রেম, পাল্লা বিক্রি হয়। কালের মসী মেখে সে দাঁড়িয়ে থাকে। সে জানলায় চোখ রাখলে কোনোভাবেই আর ধরা পড়ে না পুরোনো দিনের মায়াময় গলিপথ, নির্জন দুপুর, বা নিস্তব্ধ রাত্রিরা। খড়খড়ির নিভৃত ইশারাগুলিও বস্তাপচা হয়ে পড়েছে।
বদলে যাওয়া সময়ের এই ঘর থেকে ওইপারে উঁকি মেরে পুরোনো কলকাতাকে দেখার মতো একটি ঝিলিমিলি জানলাও আজ আর বেঁচে নেই।

ছবি: অঙ্কিতা পাল