
চা-কফি-বই-আড্ডার এমন ঠেক কলকাতায় দ্বিতীয়টি নেই
একসারি বই, তারই মধ্যে বসে চায়ের পেয়ালায় চুমুক। সঙ্গে জমছে আড্ডা। কথা বলতে বলতেই চোখ চলে যাচ্ছে দেওয়ালে, চারপাশে। সেখানে আপনার সঙ্গেই কথা বলছে চায়ের গল্প, ছবিরাও। আর কথা বলছে বই। থাকে থাকে সাজানো বই। চা-বইয়ের এমন জোড়কলম তো সহজে মেলে না। যাকে বলে রাজযোটক!

যেখানটায় শোভা পাচ্ছে মাফিন, পেস্ট্রি, ব্রাউনিরা—তার ঠিক পাশেই একটা সবুজ করিডর। বইতে ঠাসা। বসে পড়তেও পারেন চাইলে। তারপর কাঠের পেঁচানো সঁড়ি বেয়ে নেমে যেতে পারেন নিচে। সেখানে অবশ্য চা মিলবে না। বইয়ের রাজত্ব। বই, চা, কফি আর আড্ডার এমন ঠেক কলকাতায় আর দ্বিতীয়টি নেই।
আরো পড়ুন
চা-Talk প্রায় অহর নিশি
এশিয়াটিক সোসাইটির ফুটপাথ ধরে খানিকটা হাঁটলেই পার্ক হোটেল। তার পাশেই অক্সফোর্ড বুক শপ। শুধু বইয়ের ঠিকানা নয়, এরই দোতলায় রয়েছে এই আশ্চর্য ‘চা বার’। পোশাকি নাম এটাই। বইপ্রেমীদের ঝাঁক দুপুর-সন্ধেয় এখানে আড্ডা জমান। চুমুক দেন পেয়ালায়। স্যান্ডুইচ, মাফিনে কামড় বসান। এই ঠেকের মেজাজটাই আলাদা।

তবে, নিছক বইপ্রেমীদের ঘাড়ে চেপে কিন্তু বৈতরণী পার হতে চায়নি এই চা বার। নিজেদের একটা আলাদা চরিত্র বানিয়ে তুলেছে সযত্নেই। এমন অঢেল চায়ের ভাণ্ডার কলকাতা শহরে আর দ্বিতীয়টি আছে কি? নয় নয় করে কুড়ি বছর বয়স হল এই চ বারের। এতদিনেও মুগ্ধতায় সামান্য টান পড়েনি। আভিজাত্য টাল খায়নি একটুও। আর কমেনি স্বাদের ভাঁড়ার।

‘চা বার’ নাম কেন হল, তা বোঝা যাবে মেনু কার্ড খুললেই। একশোরও বেশি ধরনের চা মেলে এখানে! যারা দুধ-চা ভালোবাসেন, তাদের জন্যে রয়েছে একাধিক ভ্যারাইটি। আর যাদের পছন্দ খানিক শৌখিন, তারাও চোখ বুজে চলে আসতে পারেন এখানে। অসম থেকে পাঁচ-ছটি টি-এস্টেটের চা মেলে চা বারে। প্রতিটি চায়ের স্বাদ আলাদা। বুদলাবেটা, হাপজান, খোবং… দার্জিলিং চায়ের বাহার আরো বেশি—ফার্স্ট ফ্লাশ, সেকন্ড ফ্লাশ, মকাইবাড়ি, দার্জিলিং গোল্ড, দার্জিলিং গ্রিন হ্যান্ড রোল্ড, দার্জিলিং কুইন’স চয়েশ ও আরো কত কী। আপনার ধাঁধাঁ লেগে গেলে সাহায্য করতে এগিয়ে আসবেন চা বারের কর্মচারীরা। তাদের মুখ থেকে আন্তরিক হাসিটিও হয়তো ছলকে পড়বে পেয়ালাতে।
অসম-দার্জিলিং চা বাদেও মিলবে আইরিশ চা, সিকিমের চা, নিলগিরি, নেপালের চা। তৈরির সময় প্রতিটি চা-কেই প্রাপ্য আদরটুকু দেন এই বারের কর্মীরা। ভিন ভিন্ন জাতের চায়ের পরিবেশনার ধরনগুলিও আলাদা আলাদা। তিন রকমের সেয়লন চা-ও মিলবে চাইলেই। পাওয়া যাবে নানা রকমের ফ্লাওয়ারিং চা, রঙিন চা। গ্রিন টি-র বৈচিত্র চমকে দেবেই। সঙ্গে রয়েছে হার্বাল, অরগ্যানিক, ডিক্যাফ, ডায়েট এবং টাইফু চা-এর ভাণ্ডার।

পাঁচজাতের চিনা চা-ও চাখতে পারেন ইচ্ছে হলে। গানপাউডার, ড্রাগন বল, লং গিন-এ চুমুক দিতে দিতেই চোখে পড়বে দেওয়ালে লেখা গপ্পের দিকে। এক চিনা রাজার কেমন অদ্ভুতভাবে চা আবিষ্কার করেছিলেন। সঙ্গে চা নিয়ে হাজারো মজার তথ্য। দেওয়ালের প্রতিটা কোণ চা-কে নিয়ে যেন নানা গল্প, ছবি সাজিয়েছে। এমন অন্দরসজ্জার দেখাও খুব একটা মেলে না।

কলকাতায় আর কোথাও চায়ের এমন বিপুল বৈচিত্র আছে কিনা জানা নেই। চা-চাতকদের মর্জি-মেজাজ-পছন্দ দিব্বি বোঝেন এখানকার কর্মচারীরা। তাঁরাও নিজেরাও কম খুঁতখুঁতে নন। চায়ের পাশাপাশি অবশ্য কফিও মিলবে অর্ডার করলেই। দক্ষিণী কফি আসবে স্টিলের ছোটো কাপে, ক্যাপুচিনো আসবে বাহারি পেয়ালায়। হাতিমুখো রুপোলি পাত্রে ভরা থাকবে চিনির প্যাকেট। কেটলি, পেয়ালা, পানপাত্র দেখে আলাদা লোভ জাগবে নিশ্চিত।

ফ্লুরিজ থেকে নাকি পাঁউরুটি আসে এখানে। মেলে সুস্বাদু আপেল মাফিন, চকোলেট মাফিন, ব্রাউনি। হ্যাম কিংবা ক্লাব স্যান্ডুইচে কামড় বসাতে পারেন চাইলেই। পাওয়া যায় পাস্তাও। চায়ের ব্যাপারে স্পেশালিস্ট হলেও, কফি-খাদ্য-অন্যান্য ঠান্ডা পানীয় নিয়েও কিন্তু সামান্য কথা তোলার সুযোগ দেবে না ‘চা বার’।

দিল্লি, গুরগাঁও, ব্যাঙ্গালোর—অক্সফোর্ডের সমস্ত বিপণীতেই নাকি রয়েছে এই ‘চা বার’। কলকাতায় রয়েছে একটিই। একতলায় বইয়ের সাজঘর, তার ওপরে চায়ের দেশ। বই নিয়েও কেউ কেউ উঠে আসেন। চায়ের পেয়ালায় চুমুক দিতে দিতেই চিন্তার দুনিয়ায় তুফান ওঠে। এমন সুযোগ আর ক’টা ঠেকই বা দেবে আপনাকে!
