
স্বতঃস্ফূর্ততা থেকে বৈজ্ঞানিক পন্থার খোঁজে
সংশোধনবাদী, রুশ দেশের শাসকপ্রধান ক্রুশ্চেভের পা-চাটা ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে লোকদেখানোভাবে সম্পর্ক ছিন্ন করে আমাদের বিপ্লবী আশা-আকাঙ্ক্ষার ‘ধারক-বাহক’ হিসেবে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) গঠিত হল যখন, তখন অনেকের মতো আমিও যথেষ্ট উদ্দীপিত হয়েছিলাম। আবার অন্যদিকে, এই নতুন পার্টি বিপ্লব করনেবালা কোনো পার্টি নয়, এ পার্টিও ‘সংসদীয় রাজনীতির ধুনুচি নিয়ে নাচবারই পার্টি’ – এই মত ব্যক্ত করে কিছু কিছু কমরেডের ফিসফিসানি আমার মতো অনেকের মধ্যে সংশয়ও সৃষ্টি করেছিল। আমাদের বুকে তখন বিপ্লবের স্বপ্ন। সমাজ জুড়ে একটা তোলপাড় সৃষ্টির আকাঙ্ক্ষায় উদ্বেল তখন আমরা। আসলে সে সময়টা এমনই যাচ্ছিল। তখন বিশ্ব জুড়ে রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিপ্লবের জন্য টালমাটাল। ভিয়েতনামের বীর বিপ্লবী যোদ্ধারা মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের তথাকথিত অপরাজিত শক্তিকে নাস্তানাবুদ করে দিচ্ছিল। সাম্রাজ্যবাদ ও তার পা-চাটা শাসকশ্রেণির হাত থেকে মুক্তির দিন গুনছিল লাওস, কম্বোডিয়া। এশিয়া, আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা জুড়ে মানুষের মধ্যে সংগ্রামী উদ্দীপনা। স্বাভাবিকভাবে, বিশ্বের নানা প্রান্তের স্বাধীনতা প্রত্যাশী ও বিপ্লব প্রত্যাশী মানুষের মতো আমরাও এদেশে বিপ্লব ঘটাবার জন্য চাঞ্চল্য অনুভব করব – এটা সে সময়কার পরিস্থিতির সঙ্গে নিশ্চিতভাবে বে-মানান ছিল না।
বলতে দ্বিধা নেই, এতদিন পর্যন্ত বিপ্লব সম্পর্কে আমাদের অধিকাংশের মধ্যে যে ধারণা ছিল, তার প্রায় সবটাই ছিল বিপ্লব আর স্বতঃস্ফূর্ত আবেগে মাখামাখি। কিন্তু বাস্তব রাজনৈতিক পরিস্থিতি আমাদের বিপ্লবকে বস্তুগতভাবে আত্মস্থ করার সংকল্পে উদ্বেল করে তুলল। আমরা ধীরে ধীরে বুঝতে শিখলাম বিপ্লববাদ ও সংস্কারবাদ, মার্কসবাদ ও সংশোধনবাদ কী, কমিউনিস্ট পার্টিতে কোন সামাজিক ও রাজনৈতিক কারণে বিকশিত হয়ে ওঠে, কীভাবে তাকে চিনতে হয়। রুশ কমিউনিস্ট পার্টির মধ্যে বুর্জোয়ারা কী করে প্রতিপত্তি বাড়াতে পারল, কী করে শ্রমিক শ্রেণির একনায়কতন্ত্রকে ভেতর থেকে বিপর্যস্ত করে বুর্জোয়াশ্রেণির একনায়কতন্ত্র আবার ফিরে আসতে পারল, তা আমরা অংশত জানলাম। আমাদের বিপ্লব হয়ে যাবার পরেও কোনো দেশের মধ্যেকার শ্রেণি ও শ্রেণি সংগ্রাম যে উবে যায় না, বরং শ্রমিক একনায়কত্বের অভিজ্ঞতাজনিত দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে ভেতরে ভেতরে বিস্তার ঘটে বুর্জোয়া মতাদর্শ ও মূল্যবোধের এবং পরিণতিতে বিপর্যস্ত করে দিতে পারে শ্রমিক একনায়কতন্ত্রকে – সে সম্পর্কে কিছুটা হলেও আমাদের মধ্যে রাজনৈতিক ভাবনা-চিন্তার বারবৃদ্ধি ঘটতে লাগল। মার্কসবাদ আশ্রিত নানা পত্র-পত্রিকা ও লেখালেখি (প্রকাশ্যে ও গোপনে) প্রকাশিত হওয়ার একটা আবহাওয়া তৈরি হল, বাড়তে লাগল মার্কসবাদের চর্চা। মার্কসবাদ, প্রথমে রুশ বিপ্লবের অভিজ্ঞতা দ্বারা সমৃদ্ধ হয়ে পরিচিত হয়েছিল ‘মার্কসবাদ-লেনিনবাদ’ নামে। তারপর চিন বিপ্লবের অভিজ্ঞতা দ্বারা পুষ্ট হয়ে ‘মার্কসবাদ-লেনিনবাদ-মাওসেতুং চিন্তাধারা’-ই হয়ে উঠল বিপ্লবনিষ্ঠ কমিউনিস্টদের দিশা।
এদিকে, লেনিন-স্তালিনের নেতৃত্বে জনগণের অনেক অস্ত্র, রক্তদান, ও শ্রমদানের পরিণতিতে যে সমৃদ্ধ রাশিয়া দুনিয়াকে তাক্ লাগিয়ে দিয়েছিল, সমাজতান্ত্রিক সমৃদ্ধির সমস্ত ফসলকে গিলে খেয়ে রাশিয়া হয়ে উঠল সামাজিক সাম্রাজ্যবাদী শক্তি। দেশে দেশে কমিউনিস্ট পার্টির মধ্যে সেই রুশি শক্তি ও রাজনীতির তল্পিবাহকদের সঙ্গে সংগ্রামী কমিউনিস্টদের শুরু হয়ে গেল মতাদর্শগত সংগ্রাম। মাওসেতুং-এর নেতৃত্বাধীন চিনা কমিউনিস্ট পার্টির মধ্যেও কারা পার্টি ও রাষ্ট্রের কর্তৃত্বে থাকবেন, পার্টির মধ্যে ঘাপটি মেরে থাকা পুঁজিবাদীদের পা-চাটা নেতৃত্ব না শ্রমিক নেতৃত্ব – সে নিয়ে শুরু হয়ে গেল আরেক লড়াই। আমরা বুঝতে শিখলাম – বিপ্লবের দ্বারা রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করতে পারলেই সঙ্গে সঙ্গে সমাজব্যবস্থার গুণগত পরিবর্তন হয়ে যায় না। শ্রমিক শ্রেণির শ্রেণি নেতৃত্ব সমাজের সর্বত্র প্রতিষ্ঠাকল্পে পার্টিকে চালিয়ে যেতে হয় আরেক নতুন লড়াই। বিপ্লব পরবর্তীকালে বিপ্লবের শত্রুরা প্রকাশ্যে বন্দুক হাতে ঘোরার সুযোগ পায় না। তাদের আশ্রয়, সমাজতান্ত্রিক সমাজে অবধারিতভাবে যে বৈষম্যগুলো থেকে যেতে বাধ্য, সেই সাংস্কৃতিক ও মতাদর্শগত ক্ষেত্রগুলোতে। এই ক্ষেত্রগুলোতে জনগণের মধ্যে প্রাথমিকভাবে প্রভাব বিস্তার করার পরই তারা ওই জনগণের সাহায্য নিয়েই ক্ষমতা পুনর্দখল করার প্রচেষ্টা চালায়।
(চলবে)
