
বিপ্লব স্পন্দিত বুকে…
প্রাথমিক পর্যায়ে বিপ্লব-পরবর্তী শ্রমিক একনায়কতন্ত্রী বিপ্লবী রাষ্ট্র ও তার সহযোগী শ্রমিক পার্টিকে সমাজের অভ্যন্তরে বিরাজমান ওই দ্বন্দ্বকে জনগণের মধ্যেকার দ্বন্দ্ব হিসেবেই মীমাংসার প্রচেষ্টা চালাতে হয়। এখানে প্রকাশ্য শত্রু সামনে নেই বলে তার সঙ্গে সামনাসামনি সশস্ত্র সংগ্রাম চালাবার কোনো প্রশ্ন নেই। জনগনের মধ্যেকার সাংস্কৃতিক ও মতাদর্শের লড়াই চালাবার ক্ষেত্রে জনগণকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সামাজিক বিপ্লবকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার শক্তিতে পরিণত করতে হয়। এক্ষেত্রে সঠিক পদ্ধতি অনুসরণে যদি ফাঁক থেকে যায়, তাহলে যেখানে দ্বন্দ্বকে বলপ্রয়োগে মীমাংসা করতে হয় (শত্রুর সঙ্গে দ্বন্দ্বের ক্ষেত্রে), সেখানে জনগণের সঙ্গে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে দ্বন্দ্ব মীমাংসার পদ্ধতি দিয়ে মোকাবিলা করতে গেলে দক্ষিণপন্থী সুবিধাবাদের বিস্তর সুবিধা হয়। শত্রু সহজেই পার্টির মাধ্যমেই ক্ষমতা পুনর্দখলের সুযোগ পায় – রুশ দেশের ক্ষেত্রে সেটাই মূলত হয়েছিল।
আবার, জনগণের মধ্যেকার দ্বন্দ্বকে যদি বলপ্রয়োগে মীমাংসার পথ গ্রহণ করা হয়, তাহলে সংগ্রামের কর্তৃত্ব ‘বাম’ সুবিধাবাদীদের, উগ্রপন্থীদের হাতে চলে যায়। ফলে, পার্টি ও রাষ্ট্র জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়। শত্রুপক্ষের লোকেরা পার্টির মূল কেন্দ্রটিকে দখল করে পুঁজির ক্ষমতার নতুন বিন্যাস ঘটায়। চিনা বিপ্লবের ক্ষেত্রে যে ঘটনা ঘটেছে। ওখানে মাও পার্টির মধ্যে ঘাপটি মেরে থাকা পুঁজিবাদের পথিকদের বিরুদ্ধে লড়াইটাকে সাংস্কৃতিক বিপ্লবের মাধ্যমে চালিয়ে যেতে চাইছিলেন। কিন্তু একটা প্রবণতার মধ্যে আরেকটি বিপরীত প্রবণতা সামাজিক আন্দোলনে সবসময়ে লুকিয়ে থাকে। অনেকেই তা দেখতে পায় না, চিনতে পারে না। বিপ্লবের পতাকা তুলে তারা মিত্রতামূলক দ্বন্দ্বকে শত্রুতামূলক দ্বন্দ্বে পরিণত করে। ফলে, তাদের সংগ্রাম শেষ পর্যন্ত তাদের জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন করে। পার্টির মধ্যে ঘাপটি মেরে বসে থাকা পুঁজিবাদী পথের পথিকরা অতি-বিপ্লববাদের সমালোচনা করে নিজেদের ‘সাচ্চা বিপ্লবী’ বলে প্রতিপন্ন করার সুযোগ পায় এবং ধীরে ধীরে পার্টি এবং রাষ্ট্রযন্ত্র – দু’টোকেই তাদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসে। চীনে তাই ঘটেছে।
যে চিন ছিল আমাদের বিপ্লবী সংগ্রামের আশা-ভরসার ক্ষেত্র, সেই চিন আজ কোনোভাবেই দেশে দেশে বিপ্লবীদের সংগ্রামে কোনো সহযোগিতা করে না। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ আজ তার ব্যবসায়িক প্রতিদ্বন্দ্বী, মার্কিন সাম্রাজ্যবাদকে আর চিন সাম্রাজ্যবাদী শক্তি মনে করে না। পার্টি সংবিধান থেকে ‘সাম্রাজ্যবাদ’ শব্দটিকেই তারা বাদ দিয়ে দিয়েছে। চিন আজ বিশ্বের বাজার দখলের অন্যতম প্রধান শক্তি। সে দেশের শ্রমিক-কৃষকেরা আজ নানাভাবে বঞ্চিত-লাঞ্ছিত। চিনে আজ দেশি-বিদেশি একচেটিয়া পুঁজিবাদী শক্তির ব্যাপক প্রতিপত্তি। চিনা পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটিতে আজ চল্লিশ জন পুঁজিপতি মালিক সদস্য হিসেবে বিরাজমান। তাদের মধ্যে অনেকেই একচেটিয়া বৃহৎ পুঁজির মালিক শ্রেণির থেকে আসা। কিন্তু এসব কথা আমরা জানতে বুঝতে পেরেছি অনেক পরে।
(চলবে)
