
তৈরি হল নতুন রাজনৈতিক দল
ইতিমধ্যে গড়ে উঠল সারা ভারতের বিপ্লবী কমিউনিস্টদের কো-অর্ডিনেশন কমিটি। আর চারু মজুমদার হলেন তার নেতা। তিনি দ্রুত একটি সাচ্চা কমিউনিস্ট পার্টি গড়ার ডাক দিলেন। বিপ্লবীদের সমস্ত গ্রুপকে ভেঙে ফেলার নির্দেশিকা দেওয়া হল। ১৯৬৯ সালের ১লা মে, মে দিবসের সভায় কানু সান্যালের মুখে সবাই জানল, আগের মাসের, অর্থাৎ এপ্রিল মাসের ২২ তারিখ নাকি পার্টি গঠিত হয়ে গেছে। মঞ্চে সেদিন যাঁরা বসেছিলেন, তাঁদেরও অনেকের কাছে খবরটি গোপন ছিল। পার্টি গঠিত হয়ে গেছে শোনার পর তাঁরা মূক হয়ে বসে রইলেন। নতুন পার্টির নাম হল, ‘ভারতের কমিউনিস্ট পার্ট (মার্কসবাদী-লেনিনবাদী)’ এবং সে পার্টির সাধারণ সম্পাদক হলেন অবশ্যই চারু মজুমদার।
পার্টি ঘোষণা করল, মার্কসবাদ-লেনিনবাদ-মাও সেতুং চিন্তাধারা ওই পার্টির রাজনৈতিক ভিত্তি। কৃষিপ্রধান দেশ চিনে যে পথে বিপ্লব সম্ভব হয়েছিল, সে পথেই এদেশেও বিপ্লব সংগঠিত হবে বলে ঘোষিত হল। ঘোষিত হল, “চিনের পথই আমাদের পথ”। শুধু তাই নয় – সত্তর দশককে মুক্তির দশকে পরিণত করার আহ্বান দিয়ে ছাত্র-যুবদের গ্রামে গ্রামে গিয়ে ‘কৃষিবিপ্লব’-কে সার্থক করে তুলবার জন্য উৎসাহিত করলেন চারু মজুমদার। কমিউনিস্ট বিপ্লবীদের একটা বড়ো অংশ এ ডাকে সাড়া দিয়ে সশস্ত্র বিপ্লবের রাজনৈতিক সংগ্রামে সামিল হলেন।
গণসংগ্রাম নয়, সংসদীয় সংগ্রাম নয়, গণসংগঠন নয়, সশস্ত্র সংগ্রাম ও সশস্ত্র সংগঠনই সংগ্রামের একমাত্র পথ বলে বিবেচিত হল। এর সঙ্গে যুক্ত হল ‘খতম’ অভিযান। “শ্রেণিশত্রু খতম শ্রেণিসংগ্রামের সর্বোচ্চ রূপ এবং গেরিলা যুদ্ধের সূচনা” – কমরেড চারু মজুমদারের এই রাজনীতি গ্রাম-শহরে ব্যক্তিহত্যার রাজনীতিকে কমিউনিস্ট বিপ্লবীদের ব্যাপক অংশকে দারুণভাবে উৎসাহিত করল। বহু ছাত্র-যুব এই সংগ্রামে যোগদান করে প্রাণ নিলেন ও প্রাণ দিলেন। আত্মত্যাগের রাজনীতি কী রকম হতে পারে, দেশের মানুষ নিজেদের অভিজ্ঞতায় ওই ছাত্র যুবকদের দেখে বুঝতে পারলেন।
সিপিআই(এম-এল) সাততাড়াতাড়ি গঠন তো হয়ে গেল। অনেককে পার্টি তার কোলে স্থান দিল না। তাঁদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন নাগি রেড্ডি। আর পশ্চিমবঙ্গে ‘দক্ষিণদেশ’ গোষ্ঠী (যার মধ্যে আমরা ইতিমধ্যে অন্তর্ভুক্ত হয়ে পড়েছিলাম), অমূল্য সেন ও কানাই চ্যাটার্জি ছিলেন যাঁদের অন্যতম নেতা, তাঁরাও পার্টির বাইরে থেকে গেলেন। আমরা ওই গোষ্ঠীতে যোগদান করেছিলাম, তার অন্যতম কারণ ছিল, এ গোষ্ঠীই প্রথম বিপ্লবীদের মধ্যে আলোচনার জন্য ভারত বিপ্লবের কর্মসূচির একটি খসড়া পেশ করেছিল, ওই গোষ্ঠী তখন গণসংগ্রাম ও গণসংগঠন বর্জনের রাজনীতির পৃষ্ঠপোষক ছিল না, বিরোধী ছিল ব্যক্তি হত্যার রাজনীতিরও।
(চলবে)
