
খাদ্য আন্দোলনে আলোড়িত বাংলা ও তার ছাত্রসমাজ
স্কুলে পড়াশোনার গণ্ডী টপকে আমি ইন্টারমিডিয়েট পড়তে কোন্নগরে হীরালাল পাল কলেজ নামে নতুন গড়ে ওঠা একটি কলেজে ভর্তি হলাম। ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে ঘটল পরিচয়। ছাত্র পরিষদ কংগ্রেসিদের দ্বারা এবং বঙ্গীয় প্রাদেশিক ছাত্র ফেডারেশন (BPSF) কমিউনিস্টদের দ্বারা লালিত বুঝতে পেরে ছাত্র ফেডারেশনের দলে ভিড়ে গেলাম। যদিও কংগ্রেসি রাজনীতি বা কমিউনিস্ট রাজনীতি প্রকৃত অর্থে কী, সে সম্পর্কে আমি কোনো সম্যক ধারণা তখনো অর্জন করিনি। ভোটদানের রাজনীতির বাইরে অন্য কোনো রাজনীতির সঙ্গে আমার তখন পর্যন্ত কোনো প্রকৃত বোধ গড়ে ওঠেনি।
এল ১৯৫৯ সাল। খাদ্য আন্দোলনে আলোড়িত হল এই বঙ্গ। আলোড়িত হল ছাত্রসমাজ। অনেক ছাত্রের সঙ্গে আমিও পা মেলালাম ৩১শে আগস্ট ১৯৫৯-এর সাড়া জাগানো ঐতিহাসিক সেই শ্রমিক-কৃষক-ছাত্র-যুব-নারীদের সম্মিলিত মিছিলে। আতংকিত কংগ্রেস সরকার চারদিক থেকে ময়দান অভিমুখে আসতে চাওয়া মিছিলগুলোর গতিরোধ করতে স্থানে স্থানে গড়ে তুলল বাধার প্রাচীর। গণআন্দোলনের নেতা ও কর্মীদের শুরু করল ধরপাকড়। তবুও মনুমেন্টের নিচে লোকে লোকারণ্য। বেশ ক’জন নেতার বক্তৃতার শেষে মিছিল আইন-অমান্যের উদ্দেশ্যে রাইটার্সের দিকে এগিয়ে চলল। গণ-গর্জনে কেঁপে উঠল ময়দান, এসপ্ল্যানেড অঞ্চল। জনজোয়ারে উদ্দীপিত আমাদের মুখে তখন স্লোগান, “জনজোয়ার কাকে বলে, বিধান রায় দেখে যাও”, “খাদ্যমূল্যের দাম কমাতে হবে”, “পুলিশের লাঠি, ঝাঁটার কাঠি”,– ইত্যাদি।
আরও পড়ুন
উত্তাল কলকাতার সেই দিনগুলি-রাতগুলি
রাত তখন কত হবে? সাতটা কুড়ি সম্ভবত। রাইটার্স অভিমুখে সাগরের ঢেউয়ের মতো এগিয়ে চলা মিছিল হঠাৎ থেমে গেল। মিছিলের সামনে ছিলেন নেতারা। তাঁদের গ্রেপ্তার করে একটা বাসে তুলে নেওয়া হল এবং তারপরেই মিছিলকে ঘিরে ফেলে চতুর্দিক থেকে শুরু হয়ে গেল বেপরোয়া লাঠিচার্জ। উল্টোদিকে ঘুরে গেল জনজোয়ারের অভিমুখ – পুলিশের হাত আক্রমণ থেকে বাঁচতে মানুষের বেপরোয়া চেষ্টা। কতজন যে মাটিতে পড়ে গেল, পায়ের চাপে কতজন যে জ্ঞান হারাল তার কোনো সীমা-পরিসীমা নেই। পুলিশের লাঠির ঘায়ে নারী, শিশু সমেত বহু মানুষ রক্তাক্ত হয়ে মাটিতে পড়ে গোঙাতে লাগল। গ্রামাঞ্চল থেকে মুড়ির পোটলা ও হাতে প্ল্যাকার্ড বহন করে আসা মানুষদের রাস্তায় পড়ে গোঙানি এড়িয়ে, মুড়ির পোটলা ছিঁড়ে বেরিয়ে আসা মুড়ি ও রক্তের বিচিত্র মাখামাখির দৃশ্য টপকে আমি আত্মরক্ষার তাগিদে গভর্নর হাউসের গেটের একটা লোহার রেলিং আঁকড়ে ধরতে চেষ্টা করলামএবং এই সময় আমার মাথায় এসে পড়ল একটা লাঠি। চারদিক অন্ধকার হয়ে গেল। যখন জ্ঞান ফিরল, তখন দেখলাম অসংখ্য রক্তাক্ত মানুষের সঙ্গে একদল ডাক্তার আমাদের বাঁচাবার জন্য মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছে। আমার মুখটাকেও ব্যান্ডেজ দিয়ে জড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। তবে আমার আঘাত তেমন গুরুতর ছিল না। আমার বাড়ি কোথায় জেনে নিয়ে স্বেচ্ছাসেবকদের কয়েকজন আমাদের মতো ব্যান্ডেজ বাঁধা আরও কয়েকজনকে হাওড়া স্টেশনে পৌঁছে দিয়েছিলেন সেদিন।
আরও পড়ুন
‘শ্রাদ্ধ হইয়া গেলে বাবার ভূত আর আইব না’
পরের দিন খবরের কাগজে দেখলাম, খাদ্যের দাবি করার অপরাধে বহু মানুষের আহত ও নিহত হওয়ার সংবাদ। গ্রাম থেকে আসা বহু মানুষকে আহত অবস্থায় পুলিশি ভ্যানে ভরে বহু দূরবর্তী স্থানে, ডায়মন্ডহারবার, কাকদ্বীপ ইত্যাদি স্থানে নিয়ে ছেড়ে বা ফেলে দিয়ে এসেছে পুলিশ। স্বাভাবিকভাবে গর্জে উঠল পরের দিনের কলকাতা তথা সারা বাংলা। প্রতিবাদে, প্রতিরোধে, পথে নামল ছাত্রসমাজ। ট্রাম-বাস জ্বলে উঠল। বিধান রায়ের পুলিশ এবার শুধু লাঠি নয়, বন্দুক-রাইফেল নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল প্রতিবাদী মানুষের ওপর। কলকাতার রাজপথ হয়ে উঠল রক্ত-লাল। পুলিশি বর্বরতা প্রতিরোধে কলকাতার প্রায় প্রতিটি রাস্তায় ছেলে বুড়ো সবাই হাতের কাছে যে যা পাচ্ছে তা নিয়ে পুলিশি আক্রমণ প্রতিরোধে নেমে পড়ল। দোতলা-তিনতলা বাড়ির বারান্দা, ছাদ থেকে মা-বোনেরা উনুন থেকে তুলে নিয়ে টকটকে লাল জ্বলন্ত কয়লা পুলিশের দিকে ছুঁড়ে মারতে লাগলেন। পুলিশ লাঠি-বন্দুক-রাইফেল নিয়ে তাড়া করলে তাদের গায়ে কেটলির গরম জল ছড়িয়ে দিতে দেখা গেল মা-বোনেদের অনেককে।
অনেক বন্ধুর সঙ্গে সেই দুপুরে আমিও সে ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে জীবনের প্রথম লোকযুদ্ধের অভিজ্ঞতায় পুষ্ট হয়ে উঠলাম। সব মিলিয়ে প্রায় আশি-নব্বই জনের মতো লোক সেদিনের সেই অসম লড়াইয়ে নিজেদের প্রাণ বিসর্জন দিলেন। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই সেই জঙ্গি আন্দোলনের অভিমুখ অন্য দিকে ঘুরে গেল। ছাত্র আইন-অমান্যকারীদের একজন হয়ে চুঁচুড়া আদালতে আইন অমান্য করে আমি জেলে চলে গেলাম। উত্তরপাড়ার রাজাদের একটি পুরোনো বাড়িকে তারকাঁটা দিয়ে ঘিরে পুলিশ পাহারায় স্পেশাল জেল বানানো হয়েছিল। সেই রাজবাড়িতে এবং একই সঙ্গে জেলবাড়িতে আমরা বেশ কিছু আন্দোলনকারীদের সঙ্গে দিন পনেরোর জন্য ঠাঁই পেলাম। বাড়িতে সেই খবর পৌঁছতে, শুনেছিলাম, দাদা নাকি বলেছিল, “ও জেল বার্ড হইয়া গেল, জীবনে আর কিছু অর দ্বারা হইব না”। দাদার এ আশংকার মধ্যে সম্ভবত মিথ্যা ছিল না।
(চলবে)
ছবি সূত্র – ফেসবুক
