‘শ্রাদ্ধ হইয়া গেলে বাবার ভূত আর আইব না’

শ্রাদ্ধশেষে আমাদের মৎস্যমুখ আর মায়ের চিরশাস্তি শুরু

বাবার মৃত্যুর পর একমাস ধরে আমাদের অশৌচ পালন করতে হল। পরনে কোরা কাপড়। গায়েও এক খণ্ড কাপড় চাদরের মতো জড়ানো। গলায় লোহার চাবি ঝোলানো কাছা। খালি পা। ঘর বন্ধ করে একটি মাটির সরায় কাঠের আগুনে আতপ চাল ও আনাজ ফুটিয়ে সেদ্ধ সেদ্ধ খেতে হত আমাদের। লবণ নিষিদ্ধ। ব্রাহ্মণদের তেরোদিন অশৌচ পালন করে শ্রাদ্ধ-শান্তি করতে হয়। আমরা ছিলাম বদ্যি। বদ্যিরাও যদি পৈতে নেয়, তাহলে তারাও তেরোদিন পরে শ্রাদ্ধ করার অধিকারী। আমাদের তখন পর্যন্ত পৈতে ছিল না। সুতরাং, একমাস আমাদের শোক বিজ্ঞাপিত করে চলা-ফেরা করতে হয়েছিল।

ঐ বেশেই স্কুলে যেতাম। কেউ আমাকে ছুঁত না। আমার পাশে বসত না। রাতে খেতে হত ফলমূল, ভেজানো সাবুদানা এবং না ফোটানো দুধ। দুপুরে হবিষ্যান্ন খাওয়ার পর ঐ ভাতেরই একটা দলা পাকিয়ে বাড়ির ছাদে তুলসি গাছের নিচে দিয়ে আসতে হত। একটা কাক এসে নাকি সেটা খেয়ে যেত। আত্মীয়রা বলত— ‘তোর বাপের ভূত কাক হইয়া আইস্যা অন্ন খাইয়া যায়।’ আমরা তা বিশ্বাস করতাম। বিশ্বাস করতাম: আমার বাবার ভূত ‘কুত্তার ছা’ হয়ে রোজ রাতে আমাদের বারান্দায় ঘুরে বেড়ায়। আমার ভয়ে ঘুম আসত না। ছোটদি আমাকে ‘ডরাইস না, ডরাইস না’ বলে ঘুম পারাতে চেষ্টা করত। ‘শ্রাদ্ধ হইয়া গেলে বাবার ভূত আর আইব না’ বলে আমায় সান্ত্বনা দিত ছোটোদি। কবে যে একমাস শেষ হবে তার অপেক্ষায় আমি দিন গুনতাম।

অবশেষে শ্রাদ্ধ এগিয়ে এল। আমাদের আত্মীয়স্বজন, দিদি ইত্যাদির ভিড়ে ঘর ভর্তি হয়ে উঠল। একমাস পরে হাওড়ায় গঙ্গার ঘাটে নিয়ে গিয়ে আমাদের দুইভাই ও মাকে নেড়া করে দেওয়া হল। মা’র এক কোমর চুল গঙ্গার ধারে মাটিতে দলা পাকিয়ে পড়ে রইল। আমরা ধুতি-চাদরে সজ্জিত হলাম। মাকে সাদা থান পরিয়ে দেওয়া হল। সেদিন থেকে মা বিধবা হলেন। মা আর মাছ খাবে না, ছোঁবেও না। সেদিন থেকে মায়ের রান্নাঘরও আলাদা।  তাঁকে একবেলা ভাত খেতে হবে, তাও আতপ চালের। একাদশীর উপোস পালন করতে হবে। বাবার মৃত্যুর জন্য যেন মা-ই দায়ী এবং সেই জন্যই এই শাস্তির ব্যবস্থা!

শ্রাদ্ধের দিন সারা দুপুর দু’জন ব্রাহ্মণ মিলে তুলসি, তিল, গঙ্গাজল, ফুল দিয়ে অংবংচং কীসব মন্ত্র পড়ে শ্রাদ্ধকাণ্ড সম্পন্ন করলেন এবং চাল-ডাল-তরকারি-বিছানাপত্র অর্থাৎ বাবা যা কিছু ‘ভালোবাসতেন’ সব বোচকা বেঁধে ও দাদার হাত থকে দক্ষিণা নিয়ে বিদায় নিলেন। আত্মীয়-স্বজনরা সবাই মিলে পেট পুরে খেলেন। সন্ধেয় বাড়ি খালি হয়ে গেল। এদিন ছিল নিরামিষ খাওয়া। পরের দিন মৎস্যমুখ। একমাস অশৌচ পালনের সমাপ্তি। আমরা সেদিন দলবেঁধে মাছ দিয়ে ভাত খাব। মাছ-মাংস খাওয়ায় আমাদের আর কোনো শাস্ত্রীয় নিষেধাজ্ঞা থাকবে না।

শ্রাদ্ধের দিন রাতে, প্রায় সাড়ে দশটা-এগারোটা নাগাদ বাবা যা যা খেতে ভালোবাসতেন, তা মাটির থালায় সাজিয়ে, মাটির গ্লাসে খাবার জল নিয়ে দাদা ও আমি এবং কয়েকজন আত্মীয়স্বজন গঙ্গার ঘাটের দিকে হেঁটে চললুম। কয়েকজন হরিসংকীর্তন করতে করতে আমাদের সঙ্গে চললেন। সব কিছু মাথায় নিয়ে দাদা আগ আগে, আমরা পিছনে পিছনে।

গঙ্গার পাড়ে পৌঁছে একটা পরিষ্কার জায়গায় জল ছিটিয়ে বাবার জন্য আনা খাবারগুলো সাজিয়ে রাখা হল। তারপর বাবাকে শেষবারের মতো স্মরণ করে আমরা ফিরে চললাম। আমাদের পিছন ফিরে তাকানো নিষিদ্ধ ছিল। তবু, কৌতূহল নিবৃত্ত করতে না পেরে আমি একবার পিছন ফিরে দেখলাম। আত্মীয়দের একজন আমাকে ধমকে উঠলেন। আমি দেখলাম— একটা কুকুর এসে গোগ্রাসে খাবারগুলো খাচ্ছে। আমি জিজ্ঞাসা করলাম— বাবাকে তো ঝেতে দেখছি না। একটা কুত্তায় দেখি সব কিছু খাইয়্যা লইতাছে। সে আত্মীয় তখন আমায় বোঝালেন— ‘তোর বাবার আত্মা কুকুরের রূপ ধইর‍্যা ওইসব খাবার খাইতাছে।’ আত্মা নাকি চাইলেই সবকিছুর রূপ ধারণ করতে পারে।

বাবার মৃত্যুর পর ঘটে চলা এই সমস্ত ঘটনারাজি সেই শৈশবকালেই আমার মধ্যে অসংখ্য প্রশ্নের জন্ম দিয়ে গিয়েছিল। হিন্দুদের সামাজিক জীবনে অসংখ্য সংস্কারের পিছনে অযুক্তি ও অবিজ্ঞান কী করে কাজ করে, অতি শিক্ষিত ব্যক্তিকেও কী কারণে নির্বোধ করে তোলে, তার খোঁজে আমি বহু সময় ব্যয় করেছি পরে। ওই অশৌচ পালন ও শ্রাদ্ধশান্তির পিছনে জীর্ণ লোকাচার, ব্রাহ্মণ্যবাদী হুকুমনামা এবং ‘পাছে লোকে কিছু বলে’ বোধ কী করে উন্নত শির একজন মানুষকেও অতি সহজেই মাথা নোয়াতে প্ররোচিত করে তা বুঝতে শিখেছি। এই বোঝাগুলোকে জুড়তে জুড়তেই আজ আমি হিন্দুধর্মের কোনও সংস্কারকেই আর মানি না। তবে, কালাপাহাড়ি মনোভাব নিয়ে তার বিরোধী নই। আমি ওইসবের বিরোধী, সেগুলো অযৌক্তিক বলে। মানুষকে অজ্ঞানতার ছোবল থেকে বাঁচাতে সুযোগ পেলেই আমি ওইসব সংস্কার কেন মানি না, তা বোঝাতে আসর পেতে বসি। এইক্ষেত্রে আমার কাছে থাকে জীবনের কল্যাণমন্ত্র বিজ্ঞান। আমি সেই মন্ত্রেরই প্রচারক। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে, প্রতি মুহূর্তে।

Developed by DXDasia