
‘নাম-ছাঁটাই’ বিস্কুট, দড়ি দেওয়া প্যান্ট, দাদার বেত আর সাঁতার শেখার গল্পরা…
বড়ো হবার পর একটা রাজনৈতিক কথার সঙ্গে পরিচিত হয়েছিলাম। মাও জে দং-এর কথা– “ওয়ান ডিভাইডেড ইনটু টু”। অর্থাৎ, একের মধ্যে রয়েছে দুয়ের অস্তিত্ব। যেখানে ভালো আছে, সেখানে যে মন্দও আছে, সেটা কখনো ভুলো না। যেখানে নেতি আছে, সেখানে ইতিও আছে। তবে ভালো বা ইতি যেখানে মুখ্য, সেখানে মন্দ বা নেতির অবস্থান গৌণ ভূমিকায়। কোনো বস্তু বা ঘটনার সবটাই মুখ্য বা সবটাই গৌণ হতে পারে না। কিন্তু, অধিকাংশ বস্তু বা ঘটনার বিচারে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি একপেশেভাবেই প্রকাশিত হয়। যাকে ভালো ভাবি, তাকে সবটাই ভালো ভাবি। তার মধ্যে কোনো মন্দ থাকতে পারে তা ভাবতে পারি না। তেমনি যাকে মন্দ ভাবি, তার যে কোনো ইতিবাচক দিক থাকতে পারে, তা আমরা বিবেচনা করে দেখার সুযোগ পাই না।
আমার দাদার বিচার করতে বসে যদি তাকে শুধু একজন মারকুটে লোক ভাবি, বৌদির বিচারে শৈশবকালের অপরিণত বুদ্ধির মানদণ্ডে তাকে কেবল ‘লাগাইন্যা বুড়ি’ উপাধিতে ভূষিত করি, পরিণতিতে তা আমাদের ভুলের পথে ঠেলে দিতে বাধ্য। মারের চোটে আমার পিঠের প্রায় ছাল তুলে নেওয়া দাদা আর ‘লাগাইন্যা বুড়ি’ বৌদি– দু’জনেরই আমাদের দু’জনের প্রতি যে অসীম স্নেহ ও ভালোবাসা ছিল, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
দাদা ছুটির দিন সকালে প্রায়ই আমাদের সকলকে গড়ের মাঠে বেড়াতে নিয়ে যেতেন। ভোরবেলা গড়ের মাঠের সবুজ মখমলের মতো ঘাসের ওপর দিয়ে কোমর দোলাতে দোলাতে ট্রামের ছুটে চলা আমাদের মধ্যে শিহরন জাগাত। ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের হ্রদের জলে উড়ন্ত পরির বায়ুস্রোতে ভাঙা ছবি দেখিয়ে বৌদি যখন বলত, “পরিটা জলের মধ্যে কী করছে বল তো?” আমরা ভাই-বোনে উল্টোপাল্টা জবাব দিয়ে বৌদিকে বোকা বানাবার চেষ্টা করতাম। ওখানে সকালে থালার মধ্যে ছোটো ছোটো কলাপাতার টুকরোয় সন্দেশের মতো দেখতে মাখন বিক্রি করত ফেরিওয়ালা। বৌদি দাদাকে বলত, “ওগরে দুইখান মাখন কিইন্যা দেও না, কোনো দিন তো খায় নাই ওরা!” বৌদিকে তখন কি ভালোই না লাগত!
বিকেলে পাড়ার ফেরিওয়ালা হাঁক মারতো – “সাধে কি আর বলি। ওরে বাতাসা, আর তোকে আমরা চাই না। আজ থেকে আমরা ‘নাম-ছাঁটাই’ বিস্কুট খাব। দাম মাত্র দু’পয়সা”। আমি হয়তো ঘুমুচ্ছিলাম, বৌদি আমাকে ঠেলে তুলে দিয়ে বলত, “যা দুইজনের জন্য দুইখান বিস্কুট কিন্যা আন। বড়ো ভালো বিস্কুট”। বৌদির হাত থেকে পয়সা নিয়ে আমি ফেরিওয়ালার পিছে পিছে তখন দৌড় লাগাতাম। বিস্কুট আনার পর ছোড়দি বৌদিকে বলত, “তুমি আমার থিকা একটু খাও না বৌদি!” আমি বলতাম, “না গো বৌদি, আমার বিস্কুটের অদ্দেক তোমার”। বলেই আমি একটুকরো বিস্কুট বৌদির মুখে জোর করে গুঁজে দেওয়ার চেষ্টা করতাম। ‘দুষ্টু পোলা’ বলে আদর করে বৌদি বিস্কুটের টুকরোটা খেতে খেতে বলত, “ঘুগনি আলুর দম যাইলে ডাইক্কা আনিস। আলুর দমটা বেডা বড়ো ভালো বানায়”।
একবার দাদা আমাদের সবাইকে দক্ষিণেশ্বরের মন্দির দেখাতে নিয়ে গেল। দাদা বলল, এই মন্দিরের মধ্যে যে কালীর মূর্তি আছে, তিনি নাকি খুব জাগ্রত। রামকৃষ্ণের হাত থেকে তিনি নাকি সন্দেশ খেয়েছিলেন। আমি দাদার কাছে সেই জাগ্রত কালী দেখানোর জন্য আবদার করলাম। দাদা বলল, “মন্দিরে ঢুকতে গেলে চান কইর্যা লইতে হইবো আগে”। দাদা দেখলাম চানের সব জিনিসপত্র ব্যাগে করে নিয়েই এসেছে। ঘাটে গিয়ে দাদা আমাদের নিয়ে চানের জন্য নামতে লাগল। অসংখ্য লোক তখন গঙ্গায় ডুবছে উঠছে, ঠাকুরের নাম করছে। সে এক অদ্ভুত দৃশ্য।
কিন্তু, ছোটদি সাঁতার জানলেও আমি জানতাম না। বৌদি আমাকে প্রায় কোলে করে জলে নামাল এবং মাথাটা জোর করে জলে ডুবিয়ে ধরল। গলায় জল আটকে আমার তখন যাই যাই অবস্থা। আমার সেই অবস্থা দেখে সকলে হেসে কুল পায় না। যা হোক, গঙ্গায় জলটল গিলে স্নান শেষ করে উঠে মায়ের কাছে দেবার জন্য ফুল বেলপাতা-সন্দেশের ডালি হাতে সবাই গিয়ে লাইনে দাঁড়ালাম। কত শিবমন্দির! কত লোক! আর আছে হনুমানের উৎপাত। অবশেষে মন্দিরে ঢুকে ঠাকুর দর্শন। মন্দিরের পুরুত মশাই আমাদের ডালি মায়ের পায়ে উৎসর্গ করে আমাদের হাতে ফেরত দিলেন। আশা করেছিলাম, মা কালী আমাদের ডালি থেকে সন্দেশ খেয়ে আমাদের প্রমাণ করে দেখাবেন তাঁর মূর্তি কত জীবন্ত! কিন্তু তার কিছুই দেখতে পেলাম না। বরং মন্দির থেকে সিঁড়ি দিয়ে নামবার সময় আমার হাত থেকে মায়ের ডালিটা ছিনিয়ে নিয়ে পালিয়ে গেল এক ভীষণ আকৃতির হনুমান। ছোটদি ভয়ে বৌদিকে জড়িয়ে ধরল। দাদা আমাকে বোঝালো, “মা কালী হনুমানের রূপ ধরেও তোর ডালা লইয়্যা যাইতে পারেন!” আমি ভাবলাম– হলেও হতে পারে। ঠাকুর দেবতারা তো সব কিছুই করতে পারেন।
কিন্তু সাঁতার না জানার জন্য গঙ্গায় স্নান করতে গিয়ে জল গিলে সবার কাছে হাস্যকর জীবে পরিণত হওয়াটা আমার কাছে খুবই অপমানজনক ঠেকেছিল। একদিন কলেজ স্কোয়ারে গিয়ে দেখলাম, বিদ্যাসাগরের মূর্তির পেছনের ঘাটে অনেক লোক স্নান করছে, সাঁতার কাটছে। আমি ঠিক করলাম– এই ঘাটে রোজ স্নান করতে আসব আমি এবং এখান থেকেই সাঁতার শিখে সবাইকে অবাক করে দেব।
আমি তাই বিকেল হলেই কলেজ স্কোয়ারে গামছা ও প্যান্ট নিয়ে চলে আসি। প্যান্টটা খুলে রেলিং-এ ঝুলিয়ে রেখে গামছা পরে জলে নেমে হাত-পা ছুঁড়ে অনেকের সঙ্গে লাফালাফি করি। তারপর, সন্ধে হবার আগে জল থেকে উঠে প্যান্ট পরে গামছা হাতে বাড়ি ফিরে যাই।
দিন তিনেক বাদে এমনি এক বিকেলে স্নান করতে ঘাটে নেমে দেখি জলের মধ্যে সিঁড়িতে একটা পেতলের দু’আনি চকচক করছে। এদিক ওদিক তাকিয়ে আমি দু’আনিটা তুলে নিলাম। খোঁজাখুঁজি করতে করতে একটা ফুটোওয়ালা তামার পয়সাও জুটে গেল। আমার আনন্দ আর দেখে কে! আমার যে সাঁতার শিখতে হবে সে কথাটা ভুলে আমি রোজগারের ধান্দায় রোজ বিকেলে কলেজ স্কোয়ারের ঘাটের সিঁড়ি হাতড়ে বেড়াতে লাগলাম।
একদিন ঘাটে কিছুই জুটল না। কিছুক্ষণ জলে ঝাপটাঝাপটি করে জল থেকে উঠে এলাম। কিন্তু রেলিংয়ের যে জায়গায় প্যান্টটা রোজ রাখি, আজ দেখি প্যান্টটা সেখানে নেই। গামছা পরা অবস্থায় এধার ওধার খোঁজাখুঁজি করেও কোথাও প্যান্টের ছায়ারও খোঁজ পেলাম না। অগত্যা গামছা পরা অবস্থাতেই সবার অলক্ষ্যে বাড়ি ঢুকে ছোটদির প্যান্টটা পরে পড়তে বসে গেলাম। দাদা আমাদের দু’জনকেই একই রকমের প্যান্ট কিনে দিত। শুধু দড়িটা ছিল আলাদা আলাদা। সে সময় অল্প আয়ের লোকেদের ঘরের ছেলেমেয়েরা দড়িওয়ালা প্যান্টই বেশি পরত।
পরের দিন স্নান করতে যাবার সময় ছোটদি আর তার প্যান্ট খুঁজে পায় না। চারদিকে খোঁজাখুঁজি চেঁচামেচি শুরু হয়ে যায়। অতঃপর আমার গেঞ্জি তুলে দড়ি বিচার করে ছোটদি চেঁচিয়ে ওঠে, “বৌদি দেখো, ও আমার প্যান্ট পইর্যা বইস্যা আছে”। আমি গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে উঠে প্রমাণ করতে চাই প্যান্টটা আমারই। কিন্তু, কোনো যুক্তিই টেকে না। অবশেষে দাদার বেত পিঠে পড়তেই আমি স্বীকার করতে বাধ্য হই – আমার প্যান্টটা কলেজ স্কোয়ারের রেলিং থেকে হাওয়া হয়ে গেছে।
ময়দানে বা দক্ষিণেশ্বরে বেড়াতে নিয়ে যাওয়া দাদা আর বেত হাতে প্যান্ট চুরির বিচারক দাদা যে একই মানুষ আমার এখন উপলব্ধি করতে অসুবিধে হয় না। মাও জে দং একদম সঠিক বলেছেন, “ওয়ান ডিভাইডেড ইনটু টু…”।
