
‘দিনটাকে একখানি সোনালিপাড়-দেওয়া নূতন চিঠির মত পাইলাম’
জোড়াসাঁকোর বাড়ি ছাড়াও রবীন্দ্রনাথের জীবনে, শিল্পসৃষ্টিতে বেশি কিছু বাড়ির কথা তাঁর লেখা ও আলাপচারিতার মধ্যে বারবার ফিরে এসেছে। পেনেটির বাগানবাড়ি, খড়দহের মারোয়াড়ী বাগানবাড়ি এবং বরানগরের শশীভিলা-র নাম বেশ কয়েকবার শোনা গেছে তাঁর কাছে। প্রথম বাড়িতে তিনি সন্ধান পেয়েছিলেন বৃহত্তর ভারতের, জীবনের বৃহত্তর মুক্তির। খড়দহের বাড়িতে শরীর সুস্থ করতে এসে মেতে উঠেছিলেন সৃষ্টিসুখে, দেশবাসীকে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বার্তা পৌঁছে দিয়েছিলেন তিনি। শশীভিলা ছিল তাঁর বিশ্রামের স্থান।
পানিহাটির গঙ্গার তীরে অবস্থিত বাড়িটি প্রথমে ছিল ময়মনসিংহ-র শেরপুরের জমিদার গোপাল দাস চৌধুরীর। তিনি তাঁর মায়ের নামে ‘গোবিন্দমোহনী ভবন’ নামে একটি অনাথ আশ্রম খুলে ছিলেন। পরবর্তীকালে এই বাড়ির স্বত্ত্বাধিকার পান ছাতুবাবুরা। এটি লালাবাবুদের বাগানবাড়ি নামেও পরিচিত। অনাথ আশ্রম থাকাকালীন সময়ে আশ্রম উদ্ঘাটন উপলক্ষে রবীন্দ্রনাথ সেখানে গিয়েছিলেন। তিনি এই বাড়িতে ১৪ মে ১৮৭২ থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত ছিলেন। এই বাড়ি প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন – ‘এই প্রথম বাহিরে গেলাম। গঙ্গার তীরভূমি যেন কোন পূর্বজন্মের পরিচয়ে আমাকে কোলে করিয়া লইল। সেখানে চাকরদের ঘরটির সামনে গোটা কয়েক পেয়ারা গাছ। সেই ছায়াতলে বারান্দায় বসিয়া পেয়ারা বনের অন্তরাল দিয়া গঙ্গার ধারার দিকে চাহিয়া আমার দিন কাটিত। প্রত্যহ প্রভাতে ঘুম হইতে উঠিবা মাত্র আমার কেমন মনে হইত, যেন দিনটাকে একখানি সোনালিপাড়-দেওয়া নূতন চিঠির মত পাইলাম। লেফাফা খুলিয়া ফেলিলে যেন কী অপূর্ব খবর পাওয়া যাইবে।’
রবীন্দ্রনাথ এই বাড়ি থেকেই ভারতবর্ষের ঐক্যের বাণী খুঁজে পেয়েছিলেন। তিনি লিখেছিলেন- ‘… এমন সময় আমার আট-নয় বছর বয়সে গঙ্গাতীরের এক বাগানে কিছুকালের জন্য বাস করতে গিয়েছিলাম। গভীর আনন্দ পেলাম গঙ্গানদী ভারতের একটি বৃহৎ পরিচয়কে বহন করে। ভারতের বহু দেশ কাল ও বহু চিত্তের ঐক্য ধারা তার স্রোতের মধ্যে বহমান। এই নদীর মধ্যে ভারতের একটি পরিচয় বাণী আছে।’
পানিহাটির এই বাগানবাড়ির স্মৃতি তাঁকে এমনভাবে প্রভাবিত করেছিল যে, ১৯৩৭ সালে চন্দনগর বঙ্গীয় সাহিত্য সম্মেলনেও তা উল্লেখ করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন- ‘এই বাঙ্গালার নদী আমাকে আহ্বান করেছিল বিশ্বপথে। আমার চিত্তের যথার্থ উদ্ধোধন হল সেইসময় বিশ্ব প্রকৃতির ভিতরে বিশ্বের সুরে সুর ঘটাবার উপলক্ষ্য পেলাম আমি তখন। যেমন কারাগারে যখন রাজবন্দীগণ বন্দী জীবনযাপন করে তখন তাদের সমস্ত চিত্ত থাকে অবরুদ্ধ, বেরুতে পারে না, তেমনি আমারও সেতার যন্ত্র ছিল, কিন্তু বিশ্বের সুরে তার সুর বাঁধার উপলক্ষ্য পাইনি। সেতার পড়ে ছিল তার বাঁধা হয়নি, সুর ধরা হয়নি। সেই মুক্তি পেয়েছিলাম আমি গঙ্গার তীরে।’
আরও পড়ুন
পুলিশের নজরদারিতে রবীন্দ্রনাথ
রবীন্দ্রনাথ খড়দহ শ্যামসুন্দর ঘাটের কাছে একটি বাড়িতে ভাড়া থাকতেন। এখন অবশ্য বাড়িটি নেই। সাতের দশকে এই বাড়িটি গঙ্গায় তলিয়ে যায়। ১৯৩২ সালের ১৬ জানুয়ারি রবিঠাকুর এই বাড়িতে আসেন। এই সময় তিনি বিভিন্ন শিল্পীর আঁকা ছবি অবলম্বনে বেশকিছু কবিতা লেখেন। কবিতাগুলি হল –বেসুর, হার, কালো ঘোড়া, মরণমাতা, প্রসারিণী, অপ্রকাশ, মরীচিকা, রাত্রিরূপিণী, শ্যামলা, আরশি, পুষ্পচয়িনী, পুষ্প, দ্বারে, কুমার, যাত্রা, দ্বিধা, বধূ , গোধূলী। এছাড়া তিনি পুষ্প ও শ্যামলা দুটি ছবি এঁকে কবিতা রচনা করেছিলেন। তিনি বাড়ির সিঁড়ি দিয়ে নেমেই গঙ্গার ধারে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকতেন। এই বাড়ি থেকেই সত্তর বছর বয়সে ভারতবাসীর কাছে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বার্তা পৌঁছাতে স্বাধীন মুসলিম রাষ্ট্র পারস্যে যাত্রা করেছিলেন।
রবীন্দ্রনাথ বরানগরের শশীভিলার একটি ঘরের নাম দিয়েছিলেন নেত্রকোণ। পূর্ব-দক্ষিণ কোণে অবস্থিত এই ঘর থেকে দেখা যেতে পুকুরঘাট, আম-সুপুরির বাগান। ঘরের জানালার সামনে বসে লিখতে বসলে কবি হারিয়ে যেতেন। অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতেন। সময় কেটে যেত এভাবেই। তারপর একদিন রাগ করে লোক ডেকে লেখার টেবিলের স্থান পরিবর্তন করে এককোণে দুই দেওয়ালের মাঝখানে করে দিলেন। সবাই জিজ্ঞাসা করলে কবি বলেন- ‘খোলা জানালার কাছে বসলে আমার আর লেখা হবে না। আমার মন ঘুরে বেড়াবে ওই বাইরে দূরে।’ কিন্তু কাজ শেষেই কবি জানালার সামনে ইজি-চেয়ারে বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়ে দিতেন। এই বাড়িতে বসেই কবি রচনা করেছিলেন প্রণাম, মাতা, রঙরেজিনী, স্নান, সমাপন, দ্বৈত।
তথ্যসূত্র- পুরাতনী (আঞ্চলিক ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিষয়ক পত্র)
