দেশলাই কাঠির বারুদ ঘষে হাতের কালো দাগ মুছে ফেলা হত

ডামাডোলে ভরা কলকাতার সেই প্রথম সাধারণ নির্বাচন

চাঁপদানির দু’টো স্পষ্ট ভাগ ছিল তখন – একদিকে আমাদের মতো পূর্ববঙ্গ থেকে আসা চাকরিজীবী মানুষজন, চটকল সুতোকলে কাজ করা শ্রমিক ও শ্রমিক পরিবারের অবাঙালি-বাঙালি মানুষেরা। অন্যদিকে চাঁপদানির জমিদার ও জমিদারের আত্মীয়স্বজন, জমিদারির কাজকর্মে নিযুক্ত বেশ কিছু অনুগত মানুষ। জমিদারদের বিরাট বিরাট প্রাচীন বাড়ি, তাদের সাংস্কৃতিক বিনোদনের জন্য একটা বড়ো ফাটল ধরা চাতাল। লোকে জমিদারদের বাড়িকে বলত ‘বাবুবাড়ি’। ওই বাবুদেরই একজন ছিলেন চাঁপদানি পৌরসভার চেয়ারম্যান। হাই ইস্কুলটিও গড়ে উঠেছিল ওই বাবুদেরই একজনের নামে। তবে জমিদারির একেবারে পরন্ত অবস্থা তখন। তাদের অনেকেই জাহাজে মালপত্র সাপ্লাই করার ব্যবসাতে হাত পাকানোর কাজে নিযুক্ত। তবে এরা সবাই এ অঞ্চলে কংগ্রেসিদের অন্যতম শক্তি। কমিউনিস্ট পার্টি করে এমন লোকজনের সাক্ষাৎ আমি চাঁপদানি আসার প্রথম পর্বে পাইনি।  

এদেশে আসার পর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড হিসেবে আমি যেমন মিছিল-মিটিং-হরতাল-লাঠি-গুলির সঙ্গে পরিচিত হয়েছিলাম, তেমনি আরেক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড – ভোটের রাজনীতির সঙ্গেও পরিচিত হয়েছিলাম সেই উনিশশো বাহান্ন সালে, প্রথম সাধারণ নির্বাচনের সময়। আমাদের টেমার লেনের বাসার নিচের তলার সিঁড়ির নিচে বামপন্থীদের বুথ অফিস তৈরি হয়েছিল। ভোটের দিন, সেই অফিস থেকে আমাদের, ছোটোদের বুকে বুকে কাস্তে ধানের শিষ মার্কা ব্যাজ ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছিল সেফটিপিন দিয়ে। সংস্কৃত কলেজে ছিল ভোট দেবার বন্দোবস্ত। বড়োরা ভোটাদের ধরে ধরে এনে লাইনে দাঁড় করিয়ে বারবার কোন চিহ্নে ভোট দিতে হবে চেনাচ্ছিলেন। বামপন্থীদের প্রার্থীর ছিল ‘কাস্তে ধানের শিষ’ চিহ্ন আর কংগ্রেসিদের ছিল ’জোড়া বলদ’ চিহ্ন’। আমাদের বাড়ির নিচের বুথ অফিস থেকে ভোটার স্লিপ দেওয়া হত। আর কয়েকজন দাদা দেশলাই কাঠির বারুদ খুঁটে খুঁটে একটা কাগজে জড়ো করত। 

বামপন্থী কর্মীরা পরস্পরকে ‘কমরেড’ বলে ডাকতেন। দুপুরের পর থেকে ওই কমরেডরা দেখতাম, ভোট দিয়ে ফিরে আসা এক-একজন চেনাশোনা লোককে নিয়ে আসছেন। ভোট দেওয়ার সময়ে প্রত্যেক ভোটারের আঙুলে একটি কালো চিহ্ন দিয়ে দেওয়া হত। বুথ অফিসের বিচক্ষণ ‘কমরেড’রা সেই দেশলাই কাঠির বারুদ ঘষে ভোট দিয়ে আসা মানুষদের হাতের কালো চিহ্ন তুলে দিয়ে ভোটার স্লিপ দিয়ে আবার ভোট দিতে পাঠাতেন। কে কতবার ভোট দিতে পেরেছেন, তা নিয়ে উল্লাস করা হত। বড়ো হবার পর, আমি যখন কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যপদ অর্জন করেছিলাম, পার্টির পক্ষ থেকে আমি ও আরও কয়েকজন ভোটে ‘ফলস ভোট’ দিতে এসেছিলাম। বুঝে গিয়েছিলাম, ফলস ভোটের বিচক্ষণ ব্যবহার ছাড়া ভোট অর্থহীন।  

আমাদের এলাকায় কংগ্রেস প্রার্থী ছিলেন ব্যোমকেশ মজুমদার। উনিশশো সাতান্ন সালে তাঁর বিরুদ্ধে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি প্রার্থী দাঁড় করাল গিরিজা মুখার্জিকে। তাঁর বাড়ি ছিল চুঁচুড়ায়। প্রার্থী থাকায় কমিউনিস্ট পার্টির নামটা এলাকায় বিশেষ পরিচিতি পেল। অনেকের সাথে আমিও গিরিজা মুখার্জি তথা কমিউনিস্ট পার্টির হয়ে প্রচারে গলা, হাত, পা – সব কিছু মেলাতে শিখলাম। গলা মেলানো মানে কমিউনিস্ট পার্টির হয়ে স্লোগান দিয়ে ফেরা, হাত মেলানো মানে খবরের কাগজে পোস্টার লেখা ও দেওয়াল লেখায় পটু হয়ে ওঠা, পা মেলানো মানে পাড়ায় পাড়ায় প্রতিদিন বিকেলে মিছিল করে ঘোরা। প্রথম নির্বাচনে বিজয়ী কংগ্রেস প্রার্থী ব্যোমকেশ মজুমদার গিরিজা মুখার্জির কাছে এবার পরাজিত হলেন। এবং তাতে আমাদের দম্ভ ও প্রভাব দুই-ই বেড়ে গেল। চাঁপদানি ও ভদ্রেশ্বর অঞ্চলের চটকল ও সুতোকলের শ্রমিকদের মধ্যে কমিউনিস্ট পার্টির চাঞ্চল্যে ইউনিয়ন গড়ে উঠল।

(চলবে)
 

Developed by DXDasia