স্বাভাবিকত্বের বিরুদ্ধে যেতে বাধ্য হয়েছেন, তবু দিনের শেষে জিতেই থেমেছেন সৌরভ

বছর আঠেরো আগে মধ্য জুলাইয়ের এক ‘ইংলিশ সামারীয়’ বিকেল

বছর আঠেরো আগে মধ্য জুলাইয়ের এক ‘ইংলিশ সামারীয়’ বিকেল। লন্ডনের চিরাচরিত মেঘাচ্ছন্নতা সরিয়ে রোদ ঝলমলে ছিল সারাটা দিন। সংস্কারাচ্ছন্ন ভারতীয় মন বলবে, হয়তো দিনের মহাকাব্যিক পরিণতির চিত্রনাট্য লুকিয়ে ছিল আবহাওয়ার এই রৌদ্দ্রোজ্জ্বল ব্যতিক্রমের মধ্যেই। ঢেউ সামলে দলকে প্রায় তীরের কাছেই নিয়ে চলে এসেছেন এলাহাবাদের তরুণ, যিনি পরে বলেছিলেন, দলের খর্বকায় বিশ্ববরেণ্য ব্যাটসম্যানটি আউট হয়ে যাওয়ার পরে তাঁর পরিবার কিনা ‘দেবদাস’ দেখতে চলে গিয়েছিল। বাড়ির ছেলের পরিণত অথচ প্রত্যয়ী ব্যাটিং সেদিন লাইভ দেখেননি তাঁরা।

শুরু হচ্ছে শেষতম ওভার। বল হাতে সেই প্রজন্মের সর্বসেরা অলরাউন্ডার। ক্রিকেটীয় দক্ষতায় তো বটেই, বিপক্ষ খেলোয়াড়ের সঙ্গে ক্রমাগত মাইন্ডগেম খেলে তাকে নিজের ফাঁদে ফেলার মহামন্ত্রটিও দিব্যি আয়ত্তে। আর মুখের গ্রাস চলে যাচ্ছে, এই মুহূর্তে সেই বোলার তো হিংস্র শ্বাপদের মতোই বিষম ক্ষুধার্ত। নিজের আগের ওভারেই দুজন টেল এন্ডারকে দু’বলের ব্যবধানে প্যাভিলিয়নের রাস্তা দেখিয়ে বেরিয়ে যেতে থাকা ম্যাচকে আবারও নিজেদের করায়ত্তে এনেছেন তিনি। দ্বিতীয় উইকেটটি অবশ্য বেশ বিতর্কিত ছিল। ব্যাটসম্যান অনিল কুম্বলে বেশ বিরক্ত হয়েই ক্রিজ ছাড়েন। বল আদৌ তাঁর ব্যাট ছুঁয়েছিল কিনা, তা সেই ডিআরএস-হীন যুগে জানার আর দ্বিতীয় উপায় আম্পায়ার স্টিভ বাকনারের কাছে ছিল না। শেষতম ওভারেই আবারও দ্বিতীয় বলেই সেই একই জোরদার আবেদন কট বিহাইন্ডের। স্টিভ বাকনার এবার একটু নড়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। স্ট্রাইকিং এন্ডে থাকা জাহির খান তখন বলটা ওয়াইড হল না দেখে অবাক। নন-স্ট্রাইকিং এন্ডের নায়ক যোদ্ধাটি তখন হয়তো ভাবছেন, এত করেও কি পৌঁছনো যাবে না তীরে? ওদিকে রাজকীয় ব্যালকনির এক প্রান্তে বসে কখনও নখ খুঁটছেন, কখনও বা গলায় রাখা মাদুলিটাকে চেপে ধরছেন তাঁদের ধার্মিক অধিনায়ক।

ব্যাটিং স্টান্সেও মনে হত, তিনি আনঅর্থোডক্স, তারপরেও বিশ্বের সর্বকালের অন্যতম সেরা বাঁহাতি ব্যাটসম্যান

পরের বলটা দ্বিগুণ তেজ নিয়ে করতে ছুটলেন অ্যান্ড্রু ফ্লিন্টফ। লক্ষ্য একটা ইয়র্কারে জাহিরের উইকেটটা ভেঙে দেওয়া। বেশিই জোরে হয়ে গেল বলটা। লো ফুলটস। কভারে ঠেলে দিয়ে মরিয়া দৌড়োলেন জাহির। তাঁর সঙ্গী এই মুহূর্তের অপেক্ষাতেই ছিলেন। হরিণের গতি নিয়ে ছুটলেন অপর প্রান্তে। আর কিছু না হোক, বাকি তিন বলে এক রান করার জন্য স্ট্রাইকটা তিনি পেয়ে যাবেন। বেশ ক্লোজ রেঞ্জ থেকেই বলটা ছুঁড়লেন কভারে থাকা নিক নাইট। অত প্রবল টেনশনের মধ্যে তাঁরও লক্ষ্য ঠিক থাকেনি। রান আউট বাঁচাতে মরিয়া ডাইভ দিলেন মহম্মদ কাইফ। তারপর ভূপতিত অবস্থা থেকে উঠে জয়ের দৌড়টা। টিভি ক্যামেরা তখন ধরছে এক দর্পিত অভিভাবককে, যিনি অনুজের আশ্চর্য খেলা দেখে ওই শেষতম ওভারের আগ্রাসী বোলারটিকে মোক্ষম জবাবটা দিলেন ক্রিকেট মক্কার উদ্ধত ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে। 

১৩ জুলাই, ২০০২-এর ন্যাটওয়েস্ট ফাইনালের সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়কে আমরা মনে রেখেছি জার্সি ওড়ানোর জন্য, পরিস্থিতির বিচারে যুবরাজ-কাইফের ব্যাটিংই প্রশংসিত হয়েছে বারবার, অথচ, কে বলতে পারে, সেদিন ওপেনিং জুটিতে ১০৫ রান তুলে দেওয়ার পথে বেহালার ছেলেটার ঝোড়ো ৬০ রানের ইনিংসটি না থাকলে ‘তীরে এসে তরী ডোবার’ চিরাচরিত চোকার্স বদনাম নাও ঘুচতে পারত ভারতের।

সেবার নিজেকে ওপেনিংয়ে আবারও তুলে এনেছিলেন সৌরভ। তবে এবার আর সঙ্গী সচিন ছিলেন না, ছিলেন বীরেন্দ্র সেহওয়াগ। একদিনের ম্যাচে সচিনের সঙ্গে তাঁর ওপেনিং জুটির অক্ষত রেকর্ড, আবার সেই জায়গাই দলের প্রয়োজনে নবাগত বীরেন্দ্র সেহওয়াগকে ছেড়ে দেওয়া, আবার সেই দলের প্রয়োজনেই নিজেকে ওপরের দিকে তুলে আনা, নিজের দলকে এভাবে সন্তানের মতো দেখতে আর কজন ক্রিকেট অধিনায়ক পেরেছেন, তা সত্যিই হাতড়াতে হবে। গড়াপেটায় বিশ্বাস হারানো ভারতীয় দলের দায়িত্ব নেওয়া, সেখান থেকে বিশ্বের অন্যতম সেরা দল করে তোলা, এসব তো চিরকিংবদন্তির পর্যায়ে বহুচর্চিত। কিন্তু ক্রিকেটার সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায় কিংবা নেতা সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায় (ক্রিকেটজীবনে, তার পরবর্তী অধ্যায়টির কথা না-হয় থাক), এই দুজন কোথাও এসে একাকার হয়ে যান একটি বিষয়ে এসে – স্বাভাবিকত্বের বিরুদ্ধে গিয়ে লড়ে জিতে ফেরা এক পরিচিতির উত্তরণে। 

বিপক্ষ খেলোয়াড়ের সঙ্গে ক্রমাগত মাইন্ডগেম খেলে তাকে নিজের ফাঁদে ফেলার মহামন্ত্রটিও দিব্যি আয়ত্তে

ছোটোবেলায় দাদার ক্রিকেট কিট ব্যবহার করে যখন শুরু করছেন, তখন দাদা বাঁহাতি হওয়ায় সহজাত ডানহাতি সৌরভকেও বাঁহাতে ব্যাট করা শুরু করতে হল। ব্যাটিং স্টান্সেও মনে হত, তিনি আনঅর্থোডক্স, তারপরেও বিশ্বের সর্বকালের অন্যতম সেরা বাঁহাতি ব্যাটসম্যান। লর্ডসের ডেবিউ টেস্টে বাঘের মুখে ফেলে দেওয়ার মতো তিন নম্বরে পাঠানোর পরেও ১৩১ রানের ইনিংসটায় চক্রীদের সাফ বুঝিয়ে দিচ্ছেন, তিনি থাকার জন্য এসেছেন। অধিনায়ক থাকাকালীনও বারবারই ম্যাচরেফারি কিংবা খোদ নিজের দেশের ক্রিকেট নির্ধারকদের রোষের শিকার হচ্ছেন, কিন্তু সেসবকে আর কবেই বা পাত্তা দিয়েছেন তিনি। নইলে জাহির খান, বীরেন্দ্র সেহওয়াগ, যুবরাজ সিং, মহেন্দ্র সিং ধোনিদের মতো তরুণদের দলে আনার পাশাপাশি বিশ্বকাপের আগে জাভাগাল শ্রীনাথকে কিংবা ২০০৩-এ অস্ট্রেলিয়া রওনা হওয়ার আগে অনিল কুম্বলেদের মতো সিনিয়রদের ফেরানোর জন্যেও যেভাবে সওয়াল করেছেন, তাতে একথা একশো শতাংশ প্রমাণিত যে, পরিসংখ্যান কিংবা ক্রিকেটবুকের চেয়েও তাঁর কাছে প্রাধান্য পেয়েছে দলের স্বার্থ, খেলোয়াড়ের ক্লাস।

জনপ্রিয় ক্যুইজ শো-তে তাঁকে এক প্রতিযোগী জিজ্ঞাসা করেছিলেন, নির্বাচক হলে এই মুহূর্তে কাকে বাদ দিতেন? অনাবিল হাসিতে উত্তর এসেছিল, আমি সিলেকশনে বিশ্বাসী, এলিমিনেশনে নই। স্বাভাবিকত্বের বিরুদ্ধে লড়ে যাওয়ার মধ্যেই যেন সৌরভ গাঙ্গুলির জীবনের গতিপথ নির্ধারিত ছিল, এভাবেই।
 

Post Tags
Developed by DXDasia