এশিয়ার বৃহত্তম নিষিদ্ধপল্লি সোনাগাছির ইতিবৃত্ত

স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘রেড লাইট এরিয়া’ হিসাবে এর আত্মপ্রকাশ

পৃথিবীতে গণিকাবৃত্তির সূচনা খুঁজতে শুরু করলে পৌঁছে যেতে হয় সভ্যতার সূচনালগ্নে। ২৪০০ খ্রিস্ট-পূর্বাব্দের সুমেরিয়ান রেকর্ডে গণিকাদের উল্লেখ পাওয়া যায়। এ সময়ের বিভিন্ন নথি থেকে জানা যায়, সুমেরের উরুক শহরে অবস্থিত একটি মন্দির সংলগ্ন গণিকালয়ের কথা। এই কাকুম বা মন্দিরটির অধিষ্ঠাত্রী ছিলেন দেবী ইশ্তার। মন্দিরটি হয়ে উঠেছিল সমাজের তিন শ্রেণীর যৌনকর্মীদের আবাস। এই যৌনকর্মীরাই আবার প্রাচীন ভারতে ‘গণিকা’ নামে পরিচিত ছিল। মৌর্য যুগে গণিকাবৃত্তিকে একটি নিয়মের বেড়াজালে বাঁধার জন্য একজন ‘সুপারিন্টেন্ডেন্ট’ থাকতেন যাকে গণিকাধ্যক্ষ নামে ডাকা হত। গণিকাদের মধ্যে থাকতো নানান স্তর ও পেশাগত রকমফের, যার উপর নির্ভর করত তাঁদের উপার্জিত অর্থের পরিমাণ।

বাংলায় নবাবী আমলে নবাব তাঁর শিক্ষিত ও সুযোগ্য সঙ্গীদের ‘বাবু’ উপাধিতে ভূষিত করতেন। আজ থেকে প্রায় ৩০০ বছর পূর্বে যখন ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ভারতে তাদের আধিপত্য বিস্তার করতে শুরু করে, তখন তিনটি নিকটবর্তী গ্রামকে একত্রিত করে গড়ে ওঠে কলকাতা শহর। লন্ডনের পর এটিই ছিল ব্রিটেনের দ্বিতীয় রাজধানী। এই সময়ে কলকাতার বুকে উত্থান হয় এক নতুন অভিজাত শ্রেণীর, যারা ‘বাবু’ নামে পরিচিতি লাভ করে। ব্রিটিশদের সঙ্গে ব্যবসা বাণিজ্য সংক্রান্ত সখ্যতার কারণে বাবুরা হয়ে ওঠে অত্যন্ত বিত্তশালী। ফলত, প্রাথমিক ভাবে ‘বাবু’ উপাধিটি শিক্ষার ভিত্তিতে প্রদান করা হয়ে থাকলেও পরবর্তীতে বাবু শব্দের সমার্থক হয়ে দাঁড়ায় কেবল কলকাতার ধনবান ব্যক্তিরা। আর সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই কলকাত্তাইয়া বাবুদের সংখ্যা ক্রমশ বেড়ে  চলে।

রাতারাতি বড়োলোক হয়ে ওঠা বাবুরা মূলত ছিলেন জমিদার শ্রেণীর মানুষ, যারা কলকাতার মাটিতে প্রাসাদোপম বাড়ি হাঁকিয়ে বসেছিলেন। এই অর্থসর্বস্ব স্থুল রুচির মানুষেরা তাঁদের বেশিরভাগ সময় কাটাতেন কুখ্যাতিসম্পন্ন মহিলাদের সঙ্গে অথবা বিলাসবহুল পার্টির আয়োজন করে। বেশিরভাগ বাবুই লালসা, বাহুল্য ও লাম্পট্যের মধ্যে জীবন কাটাতেন। প্রাত্যহিক জীবনে জিনিসপত্র কিংবা গাড়ি কিনবার জন্য বিপুল পরিমাণে অর্থ ব্যয় করতেন তাঁরা। পাশাপাশি লক্যানগধিক টাকা ওড়াতেন মেহফিল ও মুজরোর পিছনে। মেহফিলগুলিতে প্রতিদিন বিভিন্ন জায়গা থেকে আমন্ত্রিত হয়ে আসত সে সময়কার নামকরা বাইজি’রা; যারা বাবু এবং তাঁর সঙ্গীদের ব্যক্তিগত সভায় গান-নাচের আসর বসাত। অবসর সময়ে বাবুরা পায়রার লড়াই দেখতেন, আকণ্ঠ মদ্যপান করতেন এবং রাত কাটাতেন শহরের গণিকালয়গুলিতে।

দেখতে গেলে, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনকালেই কলকাতা জুড়ে মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছিল পতিতাবৃত্তি। ব্রিটিশ উপনিবেশবাদ ও পুঁজিবাদী অর্থনীতির উত্থানের সঙ্গে ভারতের সামাজিক, রাজনৈতিক, এবং অর্থনৈতিক চিত্রে আমূল পরিবর্তন আসে। স্বাভাবিক ভাবেই এই পরিবর্তনের হাওয়া ছুঁয়ে যায় যৌনপল্লিগুলিকেও। ব্রিটিশ রাজধানী হিসাবে কলকাতার প্রতিপত্তি বৃদ্ধির সঙ্গে সমানুপাতে বেড়ে চলে পতিতালয়গুলির রমরমা। এ সময়ে শহরে ব্রিটিশ সৈন্যবাহিনীর আগমন ঘটেছিল। শহরের কাছেই ফোর্ট উইলিয়ামে এসে উঠেছিল তারা। এসময় যৌন চাহিদা মেটাতে সৈনিকদের পক্ষে লাম্পট্যে জড়িয়ে পড়া খুবই সহজ হয়ে গিয়েছিল। তাছাড়া, যেসব অল্পবয়সী ব্রিটিশ পুরুষেরা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিতে যোগ দেওয়ার জন্য ভারতে আসত, তাদের বেশিরভাগই ছিল অবিবাহিত। বাকিরা তাদের স্ত্রী সন্তানকে ফেলে এসেছিল সুদূর ইংল্যান্ডে। কলকাতার বাবু সম্প্রদায় এবং সাদা চামড়ার যুবকদের চাহিদা মেটাতেই গণিকালয়ের চাহিদা রাতারাতি আকাশ ছুঁয়ে ফেলে।

শোনা যায়, সে সময়ে নাকি ব্রিটিশ সৈনিকরা অল্পবয়সী দরিদ্র বিধবাদের অপহরণ করে নিয়ে আসতো সোনাগাছির দেহব্যবসায়। ঐতিহাসিকদের মতে, গণিকালয়টি এ সময়ে কর্ণওয়ালিস স্ট্রিট থেকে পশ্চিমে চিৎপুর অবধি বিস্তৃত ছিল। আর এই সমগ্র ভূসম্পত্তির মালিকানা ছিল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পিতামহ প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুরের। ১৮৫৩ সালে প্রকাশিত একটি সমীক্ষার রিপোর্ট অনুযায়ী, কলকাতা শহর জুড়ে রয়েছে ৪,৪৪৯টি আবাস, যেখানকার বাসিন্দা সর্বমোট ১২,৪১৯ জন যৌনকর্মী। সোনাগাছিই ছিল এ সময়কার সবথেকে বিখ্যাত যৌনপল্লি, যার খ্যাতি পৌঁছে গিয়েছিল ফ্রেঞ্চ পতিতালয়গুলি অবধি।

এশিয়ার সর্ববৃহৎ যৌনপল্লি সোনাগাছির অবস্থান কলকাতার অতিসাধারন গৌরী শঙ্কর লেনে, যা খানিক সাপের মতো এঁকে বেঁকে গিয়েছে সেন্ট্রাল অ্যাভেনিউ আর শোভাবাজারের মধ্যে দিয়ে। কথিত রয়েছে, কলকাতা শহরের সূচনালগ্নে এই এলাকায় রাজত্ব ছিল সানাউল্লাহ নামের এক কুখ্যাত ডাকাতের। সানাউল্লাহের অকাল মৃত্যুতে যখন তার শোকাহত মা বিলাপ করছিল, তখনই নাকি তাদের ভগ্নপ্রায় কুটিরের ভিতর থেকে ভেসে আসে তার মৃত পুত্রের কন্ঠস্বর, “কেঁদো না মা। আমি এখন গাজি হয়ে গিয়েছি।“ আর এই ঘটনা থেকেই শুরু হয় সোনা গাজির উপাখ্যান। সন্তানের স্মৃতিতে সোনা গাজির মা একটি মসজিদও তৈরি করেন, যদিও যত্নের অভাবে সেটি বেশিদিন টেঁকে না। লোকমুখে এই সোনা গাজিই পরবর্তীকালে হয়ে দাঁড়ায় সোনাগাছি। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘রেড লাইট এরিয়া’ হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে এলাকাটি।

যদিও বর্তমান সময়ে সোনাগাছি তার পূর্ব আড়ম্বরের সমস্তটাই প্রায় হারিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে জীর্ণ দশায়। এখানকার সমৃদ্ধিশালী প্রাসাদসদৃশ বাড়িগুলো ধ্বংসাবশেষে পরিণত হয়েছে সময়ের সঙ্গে। সাধারণ আবাসগুলির পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে পতিতাগৃহগুলি। প্রতিদিন হাজারও যৌনকর্মী এখানে কাজের খোঁজে আসেন। খরিদ্দার, দালাল এবং ফেরিওয়ালাদের ভিড়ে চলাচলের অযোগ্য হয়ে ওঠে সোনাগাছির ঘিঞ্জি রাস্তাগুলো। সোনাগাছির বেশিরভাগ যৌনকর্মীই সমাজে তাঁদের পরিবারের সম্মান রক্ষার্থে ছদ্মনাম ব্যবহার করেন। এই পেশায় যোগদান করেন কেউ স্বেচ্ছায় কেউ অনিচ্ছায় এবং জীবনের বেশিরভাগটাই কাটিয়ে দেন মিথ্যে পরিচয়ের আড়ালে।

_________________

ইংরেজিতে মূল লেখাটি পড়তে ।

Post Tags
Developed by DXDasia