
পাড়ার ছোটো ছোটো বাজারের গল্পগুলো বাজার অর্থনীতির তত্ত্ব দিয়ে ধরা যায় না
গৌতম ঘোষ পরিচালিত ‘দেখা’ চলচ্চিত্রের দৃষ্টিহারা প্রৌঢ় নায়ক তার এক সংলাপে আক্ষেপ করে বলেছিলেন, আমাদের চারপাশের পৃথিবীটা ক্রমশ এক প্রকাণ্ড বাজারে পরিণত হয়ে যাচ্ছে। মনে পড়বে, এই বক্তব্যের একরকম প্রেক্ষিত তৈরি হয়েছিল ওই কাহিনিচিত্রের পরতে পরতে। সত্যি অর্থে ভাবতে গেলে, এই ভাবনার ভিতরে একটি সামাজিক-রাজনৈতিক উচ্চারণ আছে। ঠিক এই মাত্রাটাকে খেয়াল রেখেই আমরা অর্থনীতি বা রাজনীতির তর্কে ‘বাজার’ কথাটা ব্যবহার করি, সোচ্চার হই বাজার-অর্থনীতির নানা বিপজ্জনক প্রান্ত নিয়ে। পেট্রোল, ডিজেল বা রান্নার গ্যাসের দাম বাজারের হাতে ছেড়ে দেওয়ার সরকারি সিদ্ধান্ত নিয়ে আমরা সরব, সরকারী কর্মীদের পেনশন-তহবিলের টাকা বাজারে লগ্নি করার প্রস্তাব নিয়ে আমরা কুপিত। দেশজোড়া আর্থিক বৈষম্যের বাড়াবাড়ির মধ্যে সমস্ত কিছুকে বাজারের হাতে নির্ধারিত হতে দিলে যে আখেরে সাধারণ মানুষের সব্বোনাশ – এ নিয়ে আমরা অনেকেই একমত। দেশের খুচরো ব্যবসাকে বিদেশি বহুজাতিকদের কাছে হাট করে খুলে দিলে ছোটো ও প্রান্তীয় ব্যবসায়ীদের বাজারে একটা বিপর্যয়ের ঢেউ এসে পৌছাতে পারে, এ নিয়ে আমরা স্পষ্ট উদ্বেগ প্রকাশ করতে অকুণ্ঠিত। এখানে সব ক্ষেত্রেই ‘বাজার’ মানে বৃহত্তর অর্থনীতির একটা ধারণা যার সঙ্গে সাধারণভাবে আমাদের শ্রেণির বৈরিতা ।
কেউ কেউ বলতে পারেন, এই বৈরিতা আদপে যতটা তাত্ত্বিক ততটা বাস্তবিক নয়। কারণ, নিজেদের মধ্যবিত্ত শ্রেণির অবস্থান থেকে আমরা বাজার-অর্থনীতির ডানা-মেলা নিয়ে যতটা বাইরের দিকে দুশ্চিন্তার ভাব দেখাই, ভিতরে ভিতরে ঠিক ততটা বিরোধিতার জোর পাই না। সোজা কথা এইটাই, গত কয়েক দশকে আমাদের চাওয়া না-চাওয়ার বাইরে সত্যিই একটা প্রকাণ্ড বাজার তার সংস্কৃতি নিয়ে আমাদের ঘাড়ে চেপে বসেছে। আমাদের আপাত-প্রখর চেতনার অগোচরেই সেই সংস্কৃতির মেজাজমর্জি তার মতো করে আমাদের কিছুটা নিয়ন্ত্রণের শক্তিও সংহত করতে পেরেছে। সেই রকম একটা চলতি-হাওয়ার-পন্থী হয়েই হয়তো আমরা মাসকাবারি মুদি বা মনোহারি জিনিস কিনতে হলেও আজকাল বাহারি বিপণির মোলায়েম ঠান্ডায় ট্রলি হাতে দাঁড়িয়ে পড়ি। পুজোর সময় পোশাকের কেনাকাটাই হোক বা নিছক গেরস্থালির আটপৌরে প্রয়োজন মেটাতেও শপিং মলের মসৃণ আবহ আমাদের প্রথম পছন্দ। হয়তো আমরা আমাদের মনকে প্রবোধ দিই, এগুলোর হয়ে ওঠার পেছনে সত্যিই তো আমার বা আমাদের বাজার-অর্থনীতির পরিপন্থী চিন্তা-চেতনার কোনও ভূমিকা নেই – একটা দেশের অর্থনীতির অভিমুখ পাল্টে দেওয়া কি আমাদের মতো চুনোপুটির কম্ম! তাছাড়া কে না জানে, সমস্ত পুতুলনাচেরই একটা করে ইতিকথা থাকে।
কিন্তু বাজার নামক মস্ত এই ধারণাটার বাইরে থেকে যায় ছোটো-বড়ো-মাঝারি অসংখ্য বাজার আর সেইসব বাজারের মধ্যে জমে থাকে অনেক ছোটো ছোটো গল্প। পুরোনো বাড়ির ছ্যাতলাপড়া উঠোনের মত, অবজ্ঞাত। ইংরিজি শব্দের বিচারে অবশ্য সবটাই ‘মার্কেট’ – কিন্তু বাংলায় যখন বাজার বলি তখন তৈরি হয় তার অন্যরকম মাত্রা। বাজার অর্থনীতির পাশে শহর-মফস্বলের ছোটো ছোটো বাজার – সব্জি-মাছ-মাংস-ডিম-চাল-ডাল-তেল-নুন-ময়দা-চা-পাউরুটি-বিস্কুটের সেসব সামান্য আয়োজন। তার আকার নেহাতই ছোটো হলেও তার সঙ্গে জুড়ে থাকা মানুষগুলো এক অন্য পৃথিবীর বাসিন্দা। আর এইসব বাজারের সঙ্গে স্থানীয় মানুষের এক রকমের সম্পর্কের আদল তৈরি হতে থাকে, যেগুলোকে ঠিক বাজার-অর্থনীতির নিয়মে ব্যাখ্যা করতে গেলে হোঁচট খেতে হয় আজও। আমার আপনার পাড়ার মুদির দোকানের বিক্রেতার সঙ্গে এমনই সম্পর্ক থাকে আমাদের। ক্রেডিটকার্ড পকেটে না থাকলেও নেহাত মুখচেনার খাতিরেই দোকানি দু-তিনশো টাকার জিনিস অমনি ধার-বাকিতে দিয়ে দেয় আমাদের। পাড়ার বাজারে গিয়ে মাছ কিনে পকেটে টান পড়লে আমাদের ভাবতে হয় না – চেনা মাছবিক্রেতা হাসিমুখে বলে দেন, এখন নিয়ে যান, পরে যখন হয় দাম দেবেন! অনেক মধ্যবিত্ত পরিবার আছেন, যারা স্থানীয় পাড়ার দোকানে এখনো মাসকাবারি খাতা রাখেন – দৈনিক যেমন যা প্রয়োজন নিয়ে যান, মাস ফুরোলে দাম চুকিয়ে দেন। এইসব সম্পর্কগুলোকে সামগ্রিকভাবে ঘুরিয়ে ধরলে অবশ্য একরকম স্বস্তির বোধ তৈরি হয়। কেননা, প্রকাণ্ড বাজারের প্যারাডাইমে একজন ব্যক্তি যখন শপিং মল থেকে বেসরকারি হাসপাতাল পর্যন্ত সব জায়গাতেই নিছক ‘ক্লায়েন্ট’, সেখানে পাড়ার বাজারের অভিধানে জায়গা পাওয়া চেনা-খদ্দের এর তাৎপর্য নিশ্চিতভাবেই কিছুটা আলাদা। ঠিক ‘ক্লায়েন্ট’ এর সংজ্ঞায় তাঁকে মাপসই করে বুঝে নেওয়া যায় না। এই না বুঝতে পারার একরকম তৃপ্তি আছে।
আর এইসব বাজারের মানুষগুলোও বড়ো অন্যরকম। কলকাতার উত্তরপ্রান্তে যেখানে আমার বাস, সেখানকার অবিন্যস্ত অথচ পুরোনো এক বাজারে খুঁজে পেয়েছিলাম এক প্রৌঢ়া সবজি বিক্রেতাকে যিনি উত্তর চব্বিশ পরগণার হাবড়া অঞ্চলের প্রত্যন্ত এলাকা থেকে সবজি বেচতে আসতেন সেই বাজারে। তার বাড়ির হাঁসের ডিম, গাছের মোচা, থোর, কচুর শাক তিনি সাজিয়ে বসতেন এখানে। কারণ, গত তিরিশ পঁয়তিরিশ বছরে আসা যাওয়ার সূত্রে এই বাজারে তাঁর কিছু চেনা খদ্দের আছে, যারা কেবল তাঁর কাছেই সবজি কেনেন। এই আশ্চর্য যোগাযোগের সেতুবন্ধন দেখে থমকে যেতে হয়। কারণ বিশ্বায়িত অর্থনীতির তত্ত্ব দিয়ে আসলে এই গল্পগুলোকে ধরা যায় না। তবু কিন্তু এঁরা অচেনা হলেও অবাস্তব নয় মোটেই – নিজেদের একরকম গোপন অন্তঃশীল অস্তিত্ব তাঁরা ছড়িয়ে রেখেছেন আমাদের চারপাশে। বড়ো বাজারের সঙ্গে আমাদের বড়ো বড়ো সম্পর্কগুলোর মধ্যে এইসব ছোটো বাজারের ছোটো ছোটো যোগগুলোও কি আমাদের দৈনন্দিন জীবনের প্রত্যঙ্গ নয়? মনে পড়ে যাচ্ছে, এমনই এক ছোটো বাজারের চেনা এক গ্রামীণ সবজি বিক্রেতা মহিলার কাছে বাজার করতে গিয়ে এক অনন্য অভিজ্ঞতার কথা। সবকিছু কিনে কেটে হিসেব করে দাম মিটিয়ে দেওয়ার পর হঠাৎই খেয়াল হল, এই রে করলা কেনা হল না তো! তাই ওঁর কাছেই কিছু করলা কিনলাম এবং হিসেব মতো দাম দিতে গেলাম। একগাল অমল হাসি হেসে সেই গাঁয়ের বধূ আমায় বললেন, থাক, ওটার আর দাম লাগবে না! এই প্রস্তাবের সামনে দাঁড়িয়ে আমার শরীর জুড়ে স্তব্ধতার ধারাপাত। আসলে এটা ঠিক সংবাদপত্রের পাতাজোড়া বিজ্ঞাপন-দেওয়া প্রবঞ্চনাময় একটা-কিনলে-আরেকটা-ফ্রি র গল্প নয় কিন্তু! এর মধ্যে ক্লায়েন্ট এর পরিবর্তে মানুষের সঙ্গে মানুষের উষ্ণ সম্পর্কের জাদু-বাস্তবতা। এটা সেই গল্প, ছোটো বাজার যেখানে হারিয়ে দেয় আমাদের চারপাশে ঘনিয়ে ওঠা সেই বিপুল বাজার আর তার সংস্কৃতিকে!
ছবি – অরুণ পাল
