
কোনও ইউরোপীয় তাঁর মতো গভীরভাবে ভারতকে জানবে না, দাবি করতেন জোন্স সাহেব
সমাধি দেখলেই তার ভিতরে শুয়ে থাকা মানুষটির কথা মনে পড়ে। শুধু মানুষই বা বলি কেন? একটা আস্ত সময় যেন শুয়ে আছে সেই সমাধির ভিতর। এই যেমন পার্কস্ট্রিট গোরস্তানে গেলে চোখে পড়ে স্যার উইলিয়াম জোন্সের উঁচু চূড়াওয়ালা সমাধিটি। কবরের ঠাসাঠাসি ভিড়ে বেশ আলাদা করেই চোখ টানে সেটি। সেই কবরের সামনে দাঁড়ালে মনটা কেমন পিছন ফিরে ছুটতে চায়। জোন্স সাহেবের কথা মনে পড়ে। এশিয়াটিক সোসাইটি তাঁরই কীর্তি। এই শহরকে, এই দেশকে ভারি ভালোবাসতেন জোন্স সাহেব। সেই ভালোবাসাই হয়তো তাঁকে এই শহর ছেড়ে যেতে দিল না কোনোদিন। ধরে রাখল নিজের মাটিতেই।
আরো পড়ুন
অজানা কলকাতার গল্প বোনে সেইসব কবরেরা
আঠেরো শতকের শেষে দেশে ফেরার পরিকল্পনা করেছিলেন নাকি জোন্স। কিন্তু ফেরা হল না? কেন? এমনিতে কলকাতায় ব্রিটিশ সাহেবের মৃত্যু খুব সাধারণ ব্যাপারই ছিল। দ্যাখ না দ্যাখ সাহেব মরত এই শহরে। সতেরো বছর, কুড়ি বছর, সদ্য যুবা, সদ্য বিবাহিত- মৃত্যু কাউকে রেয়াত করত না। বড়ো নিষ্ঠুর শহর কলকাতা। একে তো এখানকার বিচ্ছিরি গরম সাহেবদের সহ্য হত না। অন্যদিকে অজানা জ্বর, বিদঘুটে চিকিৎসাপদ্ধতি– সবমিলিয়ে বেঁচে থাকার পক্ষে কলকাতা কঠিন তো বটেই। তবু জোন্সের মৃত্যু বোধহয় শুধু এটুকুতে শেষ হয় না। হয়তো এদেশই তাঁকে বন্দি করেছিল। ‘যেতে নাহি দিব’ বলে পায়ে পরিয়েছিল ফুলের শিকল। অন্তত এসব ভাবতে দোষ কি?
অক্সফোর্ডের খ্যাতনামা ছাত্র, ভাষাবিদ উইলিয়াম জোন্স ১৭৮৩ সালের মার্চ মাসে চেপে বসলেন ‘ক্রোকোডাইল’ নামের জাহাজে। কলকাতায় সুপ্রিম কোর্টের অন্যতম বিচারকের পদে চাকরি পেয়েছেন তিনি। মাত্র চার দিন আগেই বিয়ে হয়েছে। সদ্যবিবাহিতা স্ত্রীও রয়েছেন তাঁর সঙ্গেই। তবে, নিছক বিচারকের দায়িত্বপালনি নয়, জোন্সের এ দেশে আসার অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল ভারতবর্ষ ও বিশাল এশিয়া মহাদেশ সম্পর্কে গভীরে জানা। কীভাবে প্রাচ্য দেশগুলিতে নানা ভাষার বিস্তার হল, সেই ভাষাগুলির উৎস কী, আর কীভাবেই বা তার সঙ্গে তৈরি হতে পারে পাশ্চাত্য ভাষার মেলবন্ধন– সেইসব গোপন সূত্রগুলি খুঁজে বের করতে চেয়েছিলেন জোন্স। এ যেন ভাষায় ভাষায় মহাদেশ-মেলানো। দেশে থাকতেই এশীয় ভাষার চর্চা শুরু করেন তিনি। শুরু করেন নানান অনুবাদের কাজ। কোনো ইউরোপীয় তাঁর মতো গভীরে গিয়ে ভারতকে জানবে না, এমনটাই ছিল তাঁর দাবি।
আরো পড়ুন
বেলভিডিয়ার এস্টেট ও আলিপুরের ভূত
কলকাতায় জোন্সের বাড়ি ছিল গার্ডেনরিচ অঞ্চলে। সেখান থেকে নাকি রোজ হেঁটেই তিনি চলে আসতেন ফোর্ট উইলিয়ামের সামনে৷ তারপর, পালকিতে করে কোর্ট হাউজে। একদিকে রাশভারী বিচারকের পদ, অন্যদিকে এশিয়া নিয়ে পড়াশোনা, সংস্কৃত শেখা, সাহিত্য পড়া। ইত্যাদির ফাঁকেই জোন্স একদিন প্রতিষ্ঠা করে ফেলেন এশিয়াটিক সোসাইটি৷ ১৭৮৪ সালের ১৫ই জানুয়ারি। পার্কস্ট্রিট ও চৌরঙ্গী অঞ্চলের মধ্যস্থলে অবস্থিত এই সোসাইটির কাজই ছিল এশিয়াকে জানা ও চেনা। নানান সাহিত্য পাঠ, ভাষা শিক্ষা।
আরো পড়ুন
প্রথম বাঙালি কোটিপতির গল্প
পার্কস্ট্রিটের নাম অবশ্য তখন পার্কস্ট্রিট নয়। বেরিয়াল গ্রাউন্ড স্ট্রিট। আর চৌরঙ্গী তখন নেহাতই ব্যাঘ্র-উপদ্রুত বনাঞ্চল। তবু সেখানেই তৈরি হল এই ইন্সটিটিউশন। বর্তমান ভবনটির আড়ালে চলে গিয়েছে বাড়ির সেই সুপ্রাচীন নকশা। একে একে এখানে জড়ো হয়েছিলেন অনেক স্বনামখ্যাত মানুষ৷ ১৫ জন সদস্যের একটি কাউন্সিল এটির কাজকর্ম চালাত। অসংখ্য দুষ্প্রাপ্য বই, অনুলিপি, অনুবাদে সমৃদ্ধ ছিল এই সোসাইটি। বর্মি ও তিব্বতি ভাষার পাণ্ডুলিপি, টিপু সুলতানের সংগ্রহশালা থেকে আসা আরবি ফারসি ভাষার পাণ্ডুলিপি জমা হয়েছিল সোসাইটির সংগ্রহে। কালিদাসের ‘অভিজ্ঞান শকুন্তলম’ নাটকের অনুবাদ করেছিলেন ইংরেজিতে। সেই অনুবাদের সূত্র ধরেই ইউরোপ পরিচিত হয় কালিদাসের সাহিত্য সম্পর্কে। উইলিয়াম জোন্স নাকি বলেছিলেন, “মানুষ অথবা প্রকৃতির কোনো সৃষ্টির ব্যাপারে আমাদের অভিযান ও জিজ্ঞাসা সবসময়ই বজায় থাকবে এশিয়ার ভৌগোলিক সীমারেখার মধ্যে।”
অনেক সমস্যার পরেও আজও এশিয়াটিক সোসাইটি বহু গবেষকের অক্লান্ত পরিশ্রমকে ধারণ করে রাখতে সক্ষম। যদিও প্রায়ই অর্থাভাবে ভুগতে হয়। ভুগতে হয় স্থানাভাবে। তাই প্রাচীন দুষ্প্রাপ্য ছবি, পুঁথিরা ঘেঁষাঘেঁষি লাইন লাগায়। তবু আজও সে আছে।
তবে প্রশ্ন জাগে অন্য ভাবনা। এই যে প্রাচ্যভাষার প্রতি, তার সংস্কৃতির প্রতি সুগভীর টান- তা তো শুধু উপনিবেশ মজবুতের জন্যে নয়। এর মূলে ছিল এক গভীর শ্রদ্ধা সহানুভূতি ও ভালোবাসা। অথচ যখন দেশীয় ভাষার প্রতি দেশীয় মানুষের ঘৃণা অশ্রদ্ধা ও ক্ষোভ ঝরে পড়ে, তখন আশ্চর্যই লাগে৷ এক সুদূর দেশের সাহেব যে ভালোবাসা ও গৌরব খুঁজে পেয়েছিলেন এখানে- এখন কীভাবে তা উবে গেল? কীভাবেই বা স্কুলের চৌহদ্দিতে মাতৃভাষা হয়ে উঠল তৃতীয় ভাষা? আবার কখনো তাও নয়। বরং তাতে জায়গা করে নিয়েছে ফ্রেঞ্চ, জার্মানি।
কী ভাবেন এখন স্যার উইলিয়াম জোন্স কবরে শুয়ে? এমন জটিল ধাঁধাই কি পরিণতি ছিল শেষে? সেইসব কবরেরা আজ বাস্তবিকই কবরমাত্র। নইলে এতদিনে নিশ্চয়ই কিছু ঘটে যেত, নাকি?
