‘ইতি’ বীরহলি গ্রামের এক দামাল মেয়ে

বাংলাদেশের প্রথম মহিলা আলট্রা রানার সিফাত-এর গল্প

মেয়েটি ছোটো থেকেই দামাল। ছেলেরাও যা করতে সাহস পায় না, সেইসবও অনায়াসে করে বেড়াত সে। বাগান থেকে ফল চুরি, পুকুরে সাঁতার কাটা, যখন তখন সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে যাওয়া, যে কোনো খেলা খেলতে মাঠে নেমে পড়া। দুরন্ত মেয়েকে সামলাতে না পেরে মাঝেমাঝেই কয়েক ঘা বসিয়েও দিতেন মা। মেয়েকে সেই শাসনের হাত থেকে বাঁচাতে তখন নামাজ ফেলে উঠে আসতেন বাবা। এভাবেই দিন কাটছিল। পরিবারের প্রশ্রয়ে-শাসনে-আদরে-বকুনিতে দামাল মেয়েটা বড়োও হচ্ছিল একটু একটু করে। দৌড়-ঝাঁপ, ছেলেদের সঙ্গে ভিড়ে টেনিস-ফুটবল সবই চলছিল, কিন্তু মনটা ভালো ছিল না। গ্রামের এই খোলা মাঠ, বন-বাদাড়, রোজকার খেলার সঙ্গীদের বাইরের বড়ো পৃথিবীটা হাতছানি দিচ্ছিল। মাথায় যেন একটা পোকা ঢুকে গেছে। খেলার পোকা। কেউ তখনো ভাবেনি, এই পোকার পাল্লায় পড়ে মেয়েটি সত্যিই একদিন বিশ্বমানচিত্রে নিজের দেশকে চেনাবে এক্কেবারে নতুন কায়দায়।

বাংলাদেশের উত্তরদিকের জেলা ঠাকুরগাঁও। সেখানেই পীরগঞ্জের বীরহলি গ্রামের সিফাত ফাহমিদা নওসিন ইতি-র গল্পটা সত্যিই অবাক করার মতো। সিফাতকে সবাই একডাকে চেনে ‘ইতি’ নামেই। বাংলাদেশের প্রথম মহিলা আলট্রা ম্যারাথন দৌড়বিদ সিফাত। সম্প্রতি শেষ করেছেন ৮০ কিমি দীর্ঘ ট্রেল রানও। শুধু দৌড়ই নয়, ২০১১-তে নেপালের চুলু ইস্ট শৃঙ্গজয় করেছেন সিফাত, পা রেখেছেন রাশিয়ার এলব্রুস-এর চুড়োতেও। ঘরের শান্ত মেয়েটি হয়ে থাকতে তাঁর ঘোর অনীহা। অ্যাডভেঞ্চার তাঁকে হাতছানি দেয়। আর, সেই হাতছানি এড়াতেই পারেন না সিফাত।

মাথায় পোকা নড়তে শুরু করেছিল ছোটোবেলাতেই। ক্লাস টেনে পড়ার সময়েই টেনিস খেলবেন ভেবে চলে এসেছিলেন কলকাতায়। শুনেছিলেন, লিয়েন্ডার পেজ কলকাতারই সাউথ ক্লাবে টেনিস খেলেন। যদিও, সাউথ ক্লাবে পৌঁছনো হয়ে ওঠেনি। এদিকে কিশোরী মেয়েটা তখন বড়ো হচ্ছে একটু একটু করে। চারপাশটাও বদলাচ্ছে। বদলাচ্ছে আদল। সেইসব পরিবর্তন বিস্ময় তৈরি করছে মনে। ইতি ফিরে এলেন ঘরে। ফের গ্রামে খেলে বেড়ানো। এরপর, অন্যদের মতোই কলেজে ভর্তি হওয়া। সেই দামাল জীবন, খেলা সব বন্ধ। দম আটকে আসে মেয়েটির। ফাইনাল ইয়ারে বাড়ি ফিরে আসেন কৃষি খামার করবেন বলে। 

সেই সময়ে ঢাকা এবং বাংলাদেশের অন্যান্য মেয়েরা যখন চাকরির কিংবা সুরক্ষিত জীবনের খোঁজ করছে, তখনই সিফাত হাতড়ে বেড়াচ্ছেন একটা অন্য যাপন। সেই খোঁজ করতে করতেই অ্যাডভেঞ্চার স্পোর্টসের দুনিয়ায় ঢুকে পড়া। পর্বতারোহণের নেশাটাও ঢুকে পড়ে মাথায়। একে একে হিমালয় এবং রাশিয়ার এলব্রুস। চিরতুষারের রাজ্যে পোঁছে পর্বত-চূড়ায় নিজের দেশের পতাকা গেঁথে এসেছেন বাংলাদেশের বীরহলি গ্রামের সিফাত। কিন্তু, এখানেই থেমে গেলে তো জীবনের বারো আনাই মাটি। তাই সিফাতের খোঁজ জারি ছিল। নতুন চ্যালেঞ্জের, নতুন অ্যাডভেঞ্চারের।

২০১৬-তে ঢাকা উইমেন’স ম্যারাথনে যোগ দেওয়া নিয়ে মনের মধ্যে নানা দ্বিধা, আশঙ্কা ছিল সিফাতের। অভ্যেস নেই, এতটা দৌড়ের ধকল শরীর নিতে পারবে তো! কিন্তু, এই সুযোগেই শুরু হল দূরপাল্লার দৌড়ের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করা। ২০১৭-তে দিনাজপুর ম্যারাথনে ২১ কিমি দৌড় সিফাত শেষ করলেন ২ ঘণ্টার সামান্য বেশি সময়ে। শুরু হল একের পর এক ম্যারাথনে যোগ দেওয়া। পুরুলিয়াতে গত বছর ‘দ্য বেঙ্গল আলট্রা’-য় ২৫ কিমি দৌড়ে প্রথম হন সিফাত। গ্রেট নর্থ ইস্টার্ন ফুল ম্যারাথনেও প্রথম। ম্যারাথনের গণ্ডী ছাড়িয়ে আরো দূরপাল্লার দৌড়ের ভূমিকা লেখা হয়ে গেছিল তখনই।

অন্যান্য ম্যারাথন বা আলট্রা ম্যারাথন দৌড়বিদদের মতো নিয়মিত ট্রেনিং ভালো লাগে না সিফাতের। কিন্তু, তা বলে স্বপ্নরা তো অধরা থাকতে পারে না। ফলে, আলট্রা ম্যারাথনে নামার প্রস্তুতিও শুরু হল। এর আগে কোনো বাংলাদেশি মহিলা দৌড়বিদ আলট্রা ম্যারাথন শেষ করেননি। নতুন ইতিহাস তৈরির সেই কাজটা সম্পন্ন হল কলকাতা আলট্রায়। ২০১৮-র ২ ডিসেম্বরে ৬০ কিমি দৌড় শেষ করলেন সিফাত। প্রথম বাংলাদেশি মহিলা আলট্রা রানার হিসেবে সিফাতের ইতিহাস লেখার সাক্ষী হয়ে থাকল বাংলার আরেকটি মহানগর।

স্বপ্নের কোনো সীমা থাকে না। তাই, ৬০ কিমির পরের ধাপ ৮০ কিমি। এই ফেব্রুয়ারিতেই পুরুলিয়ার ‘দ্য বেঙ্গল আলট্রা’-র দ্বিতীয় বছরেও তাই ফিরে এসেছিলেন সিফাত। এবারেরটা নিছক আলট্রা রান নয়, সেইসঙ্গে ট্রেল রানও। পায়ের নিচে এবড়ো-খেবড়ো রাস্তা, অযোধ্যার চড়াই, বনপথ, দুপুরে মাথার ওপরে জ্বলন্ত সূর্য। সিফাত দৌড় থামাননি। ৭০ কিলোমিটার শেষ করার পর হাইড্রেশন ক্যাম্পে দাঁড়িয়ে বলেছেন, তাঁকে শেষ করতেই হবে। বাংলাদেশের প্রথম মহিলা আল্ট্রা রানার তিনি। দৌড় শেষ করা ছাড়া অন্য পথ খোলা নেই তাঁর।

শেষ করেছিলেন সিফাত। সোনকুপীর বানজারা ক্যাম্প জুড়ে তখন উল্লাস। সিফাত নিছক শেষ করেনননি দৌড়, তার সঙ্গে জিতেছে একরোখা লড়াইয়ের ইতিহাস, শারীরিকভাবে ফুরিয়ে যেতে যেতেও হাল না ছাড়ার রূপকথারাও। সিফাত চেয়েছিলেন দেশের মেয়েদের জন্য অনেকগুলো বন্ধ দরজা-জানলা খুলে দিতে। শুধু নিজের দেশেই নয়, সিফাতকে দেখে অনুপ্রেরণার আঁচ নিচ্ছে সীমান্তের এপারের অনেকেও। কিন্তু, সিফাত তো থামতে জানেন না এত সহজে। অতএব, দৌড় চলছেই। পরের লক্ষ আরো দূরে, আরো কঠিন কোনো পথে। 

নামের শেষে যতই ইতি থাক, ইতি আসলে বলতেই শেখেননি বাংলাদেশের বীরহলি গ্রামের দামাল মেয়েটি। 
 

Developed by DXDasia