
বিজ্ঞানচর্চাকে শিশুদের মধ্যে ছড়িয়ে দিচ্ছে বিআইটিএম
বিড়লা ইন্ডাসট্রিয়াল অ্যান্ড টেকনোলজিকাল মিউজিয়াম (Birla Industrial and Technological Museum) ওরফে BITM। দক্ষিণ কলকাতার গুরুসদয় রোডে অবস্থিত এই বিজ্ঞানচর্চা কেন্দ্রটি। এই প্রতিষ্ঠান শুধুমাত্র কলকাতা নয়, সারা বাংলা তথা ভারতেরও গর্ব। ভারতের সাংস্কৃতিক রাজধানী কলকাতায় অবস্থিত এই প্রতিষ্ঠানটি বহু বছর ধরেই বিজ্ঞানচর্চাকে সাধারণ মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া আর বিজ্ঞানকে দৈনন্দিন সংস্কৃতির অংশ করে তোলার কাজে ব্রতী। তারই অংশ হিসেবে তারা বছরভর বিভিন্ন অনুষ্ঠান, সেমিনার, ওয়ার্কশপ ইত্যাদির আয়োজন করে থাকে। তেমনই একটি কার্যক্রম এখন চলছে সেখানে, যার নাম বিআইটিএম সায়েন্স ক্যাম্প ২০২৩ (BITM Science Camp 2023)।

এই মিউজিয়ামটি প্রতিষ্ঠিত হয় ২ মে, ১৯৫৯ সালে। এটি ন্যাশনাল কাউন্সিল অফ সায়েন্স মিউজিয়াম (NCSM)-এর অধীনে রয়েছে। এটি ভারতের প্রথম সায়েন্স মিউজিয়াম (India’s First Science Museum)। সেখানে এই ধরনের ওয়ার্কশপের আলাদা মাহাত্ম্য অবশ্যই রয়েছে। সায়েন্স ক্যাম্পটি প্রতি বছরই অনুষ্ঠিত হয় বিভিন্ন স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে। গত দুবছর কোভিডের জন্য এই ক্যাম্প অনলাইনে অনুষ্ঠিত হওয়ার পর এবছর আবার ফিরে এসেছে পুরোনো আদলে, অর্থাৎ অফলাইনে। এ প্রসঙ্গে বঙ্গদর্শন.কম কথা বলল BITM-এর এডুকেশন অফিসার (BITM Education Officer) অদিতি ঘোষের সঙ্গে। তিনি জানালেন, “এই ক্যাম্পের মূল উদ্দেশ্য স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের বিজ্ঞান বিষয়ে সচেতন এবং উৎসাহী করে তোলা। ছাত্রছাত্রীরা তাদের পাঠ্যক্রমে যা যা পড়ছে এবং তার বাইরে যা আছে, সেসব সম্পর্কে তাদের প্রাথমিক ধারণা দেওয়া হয়। এসব বিষয়ের মধ্যে যেগুলির দৈনন্দিন জীবনে প্রয়োগ রয়েছে মডেল বানানো, বা হাতেকলমে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার মাধ্যমে সেগুলির সঙ্গে ছাত্রদের পরিচয় করানো হয়।” অঙ্ক, পদার্থবিজ্ঞান, জীবনবিজ্ঞান, ভূগোল, ইলেকট্রনিকস, প্লে উইথ সায়েন্স, মোবাইল অ্যাপ ডেভেলপমেন্ট, রসায়ন, ইত্যাদি বিভাগে অনুষ্ঠিত হচ্ছে এই সামার ক্যাম্প। অদিতি ঘোষ সামলাচ্ছেন অঙ্ক বিষয়টি। তাঁর কথায়, “আমরা এখানে শেখাচ্ছি প্রাচীন ও আধুনিক অঙ্কের বিভিন্ন বিষয়, যেগুলি সাধারণত পাঠ্যক্রমে থাকে না, কিন্তু যেগুলির প্রচুর ব্যবহারিক প্রয়োগ রয়েছে। যেমন- Koch Snowflakes, Topology, Tessellation ইত্যাদি। বাচ্চারা কাগজ, টুথপিক, ইত্যাদি রোজকার ব্যবহারের সামগ্রী দিয়ে মডেল তৈরি করছে এবং বিষয়গুলি সম্বন্ধে প্রাথমিক ধারণা পাচ্ছে।” প্রসঙ্গত, টোপোলজি হলো এমন একধরনের জ্যামিতি, যেখানে কোনও বস্তুকে রবারের মতো বেঁকিয়ে অন্য একটি বস্তুর আকার দেওয়া যায়, কিন্তু প্রথম বস্তুটিকে সে জন্য ভেঙে ফেলতে হয় না।

তেমনই রসায়নের অধ্যাপক কনিষ্ক চক্রবর্তীর ক্লাসে ইলেক্ট্রোপ্লেটিং-এর পরীক্ষা চলছিল। ইলক্ট্রোপ্লেটিং, অর্থাৎ একটি ধাতুর ওপর অন্য পদার্থের আবরণ দেওয়া, যা সাধারণত করা হয় ধাতুর গায়ে জং পড়া রোধ করতে। এর জন্য তাঁরা ব্যবহার করছিলেন চাবি। ছোটো করে বলা যায়, এক্ষেত্রে যে ধাতুর ওপর কোটিং করা হবে, তার সঙ্গে ব্যাটারির ঋণাত্মক প্রান্ত যুক্ত করা থাকে। ধাতু দুটি এমন একটি দ্রবণে ডোবানো থাকে, যার মধ্যে দিয়ে কারেন্ট চলাচল করতে পারে। ব্যাটারি চালু করলে, কারেন্টের প্রবাহের কারণে ব্যাটারির ধণাত্মক প্রান্তে যুক্ত ধাতু থেকে ওই ধাতুর আয়ন বেরিয়ে আসে, দ্রবণের মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত হয়ে অন্য ধাতুর গায়ে জড়ো হয়। এইভাবেই দ্বিতীয় ধাতুটির গায়ে প্রথম ধাতুটির কোটিং পড়ে। কনিষ্কবাবু পরীক্ষাটি চালানোর সময় ছাত্রছাত্রীদের দেখা গেল, মনযোগ সহকারে সেটি পর্যবেক্ষণ করতে।

এই মিউজিয়ামটি প্রতিষ্ঠিত হয় ২ মে, ১৯৫৯ সালে। এটি ন্যাশনাল কাউন্সিল অফ সায়েন্স মিউজিয়াম (NCSM)-এর অধীনে রয়েছে। এটি ভারতের প্রথম সায়েন্স মিউজিয়াম (India’s First Science Museum)। সেখানে এই ধরনের ওয়ার্কশপের আলাদা মাহাত্ম্য অবশ্যই রয়েছে। সায়েন্স ক্যাম্পটি প্রতি বছরই অনুষ্ঠিত হয় বিভিন্ন স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে।
ভারতের প্রাচীনতম সায়েন্স মিউজিয়ামের পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক ড. রাকেশ মজুমদারের ক্লাসে চলছিল চৌম্বকতত্ত্বের পরীক্ষা। একটি চুম্বকের সামনে লোহা রাখলে চুম্বক তাকে আকর্ষণ করে, একথা তো সবারই জানা। এই আকর্ষণ বলকে বলা হয়, চৌম্বকীয় আকর্ষণ বল। এবার, এই আকর্ষণ বল কিছু নির্দিষ্ট দিক বরাবর প্রযুক্ত হয়, সেই বলের পাল্লায় এলে লোহার গুঁড়ো (বা অন্যান্য আকর্ষণশীল বস্তু), সেই নির্দিষ্ট দিক বরাবর সজ্জিত হয়ে যায়। চুম্বকের আকার ভেদে এই সজ্জা আলাদা আলাদা হয়। ছাত্রছাত্রীরা দণ্ডচুম্বক আর অশ্বখুরাকৃতি চুম্বকের সামনে লোহার গুঁড়ো রেখে সেই পরীক্ষা চালাচ্ছিল। রাকেশবাবু তাঁদের ক্যাম্পে হওয়া অন্যান্য পরীক্ষার কথাও বললেন, যেমন- আলোর পরীক্ষা, মহাকর্ষের পরীক্ষা, ইলেক্ট্রিসিটির পরীক্ষা ইত্যাদি। জীবনবিজ্ঞানের ক্যাম্পের দায়িত্বে থাকা, বিআই.টিএমের কিউরেটর (Curator of BITM) মি. শ্রিনু আপ্পিকোন্ডা এবং ম্যাডাম গার্গী দত্ত জানালেন, তাঁদের ক্যাম্পে হয়ে চলা কার্যকলাপের কথা। গার্গী দত্ত বললেন, “আমাদের এখানে মাইক্রোস্কোপের ব্যবহার শেখানো হচ্ছে। সেই মাইক্রোস্কোপ ব্যবহার করে বিভিন্ন উদ্ভিদ ও প্রাণীকোষ পর্যবেক্ষণ করা এবং স্লাইড তৈরি করা, কোনও নমুনাতে ব্যাকটেরিয়া আছে কি না তার পরীক্ষা, কার্বোহাইড্রেট ও প্রোটিনের শনাক্তকরণের পরীক্ষা, এ সমস্তই শেখানো হচ্ছে বাচ্চাদের।” মূলত সপ্তম থেকে দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্রছাত্রীরা এই ক্যাম্পগুলিতে অংশগ্রহণ করছে। প্লে উইথ সায়েন্স বিভাগে অংশ নিয়েছে একেবারে কচিকাঁচার দল। কলকাতা ও কলকাতার বাইরের অনেক স্কুল, এমনকি রাজ্যের বাইরের কয়েকটি স্কুল থেকেও এসেছে ছাত্রছাত্রীরা। মি. শ্রিনু আপ্পিকোন্ডার কথায়, “এর থেকেই এই ক্যাম্প সম্বন্ধে ছাত্রছাত্রী এবং তাদের বাবা-মায়েদের উৎসাহ বোঝা যায়।” তিনি আরও জানালেন, ছাত্রছাত্রী ও বাবা-মায়েদের কাছ থেকে অনুরোধ জানানো হয়েছে এই ধরনের ক্যাম্প আরও বেশি সংখ্যায় আয়োজিত করার জন্য।
কিন্তু একটা প্রশ্ন থেকেই যায়। ক্যাম্পের পর বাচ্চারা ফিরে যাবে। তারপর তারা তাদের এই কদিনে শেখা এই বিষয়গুলি চর্চা করছে কি না তা কীভাবে বোঝা যাবে? অদিতি ঘোষ বললেন, “ক্যাম্পের শেষে ওদের কাছ থেকে ফিডব্যাক নেওয়া হবে। একটা ওয়ার্কবুক দেওয়া হবে, যাতে বিভিন্ন পরীক্ষার বর্ণনা দেওয়া থাকবে, যাতে বাচ্চারা বাড়িতেও এ ধরনের পরীক্ষা করতে পারে। এছাড়াও সব ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখার চেষ্টা করা হবে।” মি. আপ্পাকোন্ডা জানালেন যে, ক্যাম্পের পরে ছাত্রছাত্রীদের সার্টিফিকেট দেওয়া হবে। এছাড়াও তারা এই মিউজিয়ামের মেম্বার হতে পারে। তাহলে তারা পরেও এখানকার ল্যাবরোটারিগুলি ব্যবহার করতে পারে।

মি. আপ্পিকোন্ডা এবং মি. রাকেশ মজুমদারের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, তাঁরা এই উদ্যোগকে শুধুমাত্র সায়েন্স ক্যাম্পেই সীমাবদ্ধ রাখতে চান না। রাকেশবাবু বললেন, “আমরা বিভিন্ন ইনস্টিটিউটের সঙ্গে যৌথভাবে বিভিন্ন কর্মসূচি আয়োজন করি, যেমন বিভিন্ন ওয়ার্কশপ, সায়েন্স মেলা ইত্যাদি। রাজ্য সরকারের ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিভার্সিটি মাকাউটের (MAKAUT) সঙ্গে এখানকার মউ চুক্তি আছে। সেখানকার ছাত্রছাত্রীরা তাদের পাঠ্যক্রমের কিছু প্র্যাক্টিকাল পরীক্ষা-নিরীক্ষা এখানে এসে করে।” মি. আপ্পাকোন্ডা জানালেন ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত করা অ্যাস্ট্রোনাইটের কথা, শর্ট টার্ম ট্রেনিং প্রোগ্রামের কথা। প্রসঙ্গত বলা উচিত যে, সাধারণ দর্শকদের জন্য এই মিউজিয়াম কিন্তু খোলা থাকছে ক্যাম্পের দিনগুলোতেও।

ভারতের প্রথম সায়েন্স মিউজিয়ামের তকমাপ্রাপ্ত এই প্রতিষ্ঠানে ক্যাম্পটি শুরু হয়েছে গত সোমবার (২২/০৫/২০২৩) থেকে। চলবে সামনের সপ্তাহের শুক্রবার (০২/০৬/২০২৩) পর্যন্ত। মাঝখানে শনি-রবি দুদিন ছুটি। দুই সপ্তাহব্যাপী এই ক্যাম্প নিয়ে অংশগ্রহণকারী ও তাদের বাবা-মায়েদের উদ্দীপনা বোঝা গেল দুই অংশগ্রহণকারী আর তাদের বাবা-মায়েদের কথায়। মিউজিয়ামের এক আধিকারিককে একজন অভিভাবক জিজ্ঞেস করছিলেন, “আপনারা কি এমন ধরনের ক্যাম্প বাইরেও করেন? আমার ছেলে এই ক্যাম্প থেকে অনেক নতুন জিনিস শিখছে। আমি চাই, ও এইধরনের ক্যাম্পে আরও অংশ নিক।” আরেক ছাত্র ক্যাম্পের শেষে বাড়ি ফিরতে ফিরতে তার বাবা-মাকে জানাচ্ছিল, সে বিআইটিএমের মেম্বারশিপ প্রোগামে (BITM Membership Program) ভাগ নিতে চায়।
