
নিজের ন’ কানওয়ালা সরোদের মাথায় রূপো দিয়ে বাঁধানো পাতে থাকতো বাবা আলাউদ্দিনের ছবি
রাগ মারওয়া (Raga Marwa) বাজাচ্ছেন তিনি। একে একে আলাপ, জোড়, ঝালা এবং মধ্যলয়ে গাট। মনের ভাষা ছুঁয়ে ফেলছে আঙুল। একাগ্র মনে সুর বেঁধে চলেছেন তিনি, যাঁকে ১৯৫৭ সালের ৮ অগাস্ট আশীর্বাদী পাঠাচ্ছেন ওস্তাদ আলাউদ্দীন খাঁ, “কলিকাতা তুমাকে নিমন্ত্রণ করেছে। …কলিকাতা হলো সংগীতের বিচারের স্থান। এখানকার শ্রোতারা রাগ বিচার করে। আমার মতো রুখা বাদ্য বাজাবে না। আশীর্বাদ করি সেখানে খুব নাম করো।”
সে বছর তানসেন সংগীত সম্মেলনেই প্রথম প্রকাশ্যে অনুষ্ঠান করেছিলেন বেনারস-প্রবাসী এই সরোদিয়া, বাবা আলাউদ্দীন খাঁর (Ustad Alauddin Khan) প্রিয় শিষ্য পণ্ডিত যতীন ভট্টাচার্য (Jatin Bhattyacharya)। সেই অনুষ্ঠানের পর সুনাম ছড়িয়ে পড়তে বেশি সময় লাগেনি। একাধিক অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ, আকাশবাণী (Akashvani) থেকে সরাসরি সম্প্রচার ছাড়াও ১৯৭২-এ এইচ এম ভি থেকে প্রকাশ পায় তাঁর প্রথম এল পি রেকর্ড। অ্যালবামের এক পিঠে স্ব-সৃষ্ট ‘সম্পূর্ণ কানাড়া’ রাগ, অন্য পিঠে ‘মারওয়া’।
নিজের ন’ কানওয়ালা সরোদের মাথায় রূপো দিয়ে বাঁধানো পাতে থাকতো বাবা আলাউদ্দিনের ছবি। ১৯৭৬-এর পর তাঁকে আর রেডিওতে পাওয়া যায়নি, রটিয়ে দেওয়া হয়েছিল তিনি নাকি অসুস্থ।
তাঁর জন্ম ও জীবন কেটেছে বেনারসেই। দর্শনে স্নাতকোত্তর পড়াশোনা করেছেন বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয় (Banaras Hindu University) থেকে। পণ্ডিত দীননাথ দেবশর্মন এবং বিনোদিনী দেবীর সন্তান যতীন ভট্টাচার্য হতেই পারতেন অধ্যাপক, কিন্তু বারাণসীর পৈতৃকধামে তাঁকে টানল সুর। তিনি তখন আট বছরের শিশু। তখনও সরোদ-তালিমে হাতেখড়ি হয়নি, সেই বয়সেই হারমোনিয়ামে পঙ্কজ মল্লিকের ‘পিয়া মিলন কো যানা’-র ঠিক সুরটা তুলতে পেরেছিলেন। এমন রত্ন তো জহুরীর চোখে পড়বেই! সংগীতজ্ঞ বীরু মহারাজ আবিষ্কার করেন সেই উজ্জ্বল প্রতিভাকে। যতীনবাবু সরোদের প্রাথমিক তালিম পেয়েছিলেন এই বীরু মহারাজের কাছেই। তারপর বেনারসেই ১৯৪৯-এ মাইহারে আলাউদ্দিন খাঁ-এর বাড়িতে থেকে একটানা সাত বছর তালিম। তবলিয়া আশুতোষ ভট্টাচার্যের সুত্রেই তাঁদের মধ্যে সেতু তৈরি হয়। যতীনের ‘ইমন’ শুনে মুদ্ধ হয়ে গেছিলেন আশুতোষবাবু। সেই সময় বাবা আলিউদ্দিনের সচিব হিসেবেও কাজ করেন যতীন। আজীবন ‘বাবা’র দেখানো পথেই যাতায়াত করেছেন বিশ শতকের এই সরোদ-মায়েস্ত্রো।
নিজের ন’ কানওয়ালা সরোদের মাথায় রূপো দিয়ে বাঁধানো পাতে থাকতো বাবা আলাউদ্দিনের ছবি। রামপুরের বিখ্যাত সেনী বীণকার ঘরানার সার্থক প্রতিনিধি যতীন ভট্টাচার্য সরোদবাদ্যের ‘জবা’ নিয়েও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন। বাজানোর সময় কৃত্রিম নখও ব্যবহার করতেন। বীণ, রবার, সুরশৃঙ্গার যন্ত্রাদির বাদনশৈলীর সমনবয় সরোদের এক বিশিষ্ট ‘বাজ’ তৈরি করেছিলেন। সরোদে এই বাজেরই এক অনন্য রূপকার যতীন ভট্টাচার্য। অথচ, ১৯৭৬-এর পর তাঁকে আর রেডিওতে পাওয়া যায়নি, রটিয়ে দেওয়া হয়েছিল তিনি নাকি অসুস্থ। গ্রামোফোন কোম্পানিও নাকি তাঁর রেকর্ড পুনঃপ্রকাশ করতে চায়নি। যতীনবাবুর নিজের কথা থেকেই জানা যায়, অনুষ্ঠানের আমন্ত্রণ এলেও তার পর কী ভাবে যেন সব বাতিল হয়ে গিয়েছিল আমেরিকায়, এখানেও। ‘উস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ অ্যান্ড হিজ মিউজিক’ (১৯৭৯) ও ‘উস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ ও আমরা’ (প্রথম খণ্ড ১৯৯৫ ও দ্বিতীয় খণ্ড ১৯৯৬) – প্রকাশিত দুটি বইয়ে লিখেছেন নিজের স্মৃতিকথা, গুরুকে কেন্দ্র করে। এই বইয়ের অনেক কপি নাকি ইচ্ছাকৃত ভাবে নষ্ট করা হয়েছিল। অনেক বিতর্কিত কথা প্রকাশ্যে চলে এসেছিল। একঘরে হয়ে পড়েছিলেন যতীন ভট্টাচার্য।
মিথ, মিথ্যের বিড়ম্বনায় দুর্ভাগ্য শুধু এই যে, ইউটিউবের দু-তিনটি দুষ্প্রাপ্য সংগ্রহ ছাড়া তাঁকে শোনার মতো অন্য কোনও মাধ্যম আর কিছুই নেই। ২০২০ সালে যতীনবাবুকে নিয়ে একটি তথ্যচিত্র নির্মাণ করেন অরিন্দম সাহা সরদার—'যদি সত্যি কথা বলো’ (Jodi sotyi kotha bolo)। এই তথ্যচিত্রে উঠে এসেছেন অশ্রুত, বিস্মৃত এবং বঞ্চিত যতীন ভট্টাচার্য। কথা ছিল না তবু, সংগীত জীবনের মধ্যগগন থেকে কীভাবে-কোথায় হারিয়ে গেলেন তিনি? তথ্যচিত্রটিতে এই প্রশ্নেরই উত্তর খোঁজ করেছেন অরিন্দম। যতীন ভট্টাচার্যের আপনজন, বন্ধুদের কথায় এই ছবি আপোষহীন সত্যাগ্রহের কথা বলে। তবে, যতীনবাবু নিজে এগোলেন না নাকি এগোতে দেওয়া হল না, এসব প্রশ্ন অবান্তর হয়ে পড়ে যখন আঙুলের মূর্ছনায় বেজে ওঠে তাঁর সত্ত্বা। শেষ পর্যন্ত প্রতিভাই তো একমাত্র সত্য হয়ে ওঠে! 'যদি সত্যি কথা বলো’ তথ্যচিত্রটি ইউটিউবে মুক্তি পাচ্ছে আজ, ১৮ ফেব্রুয়ারি (২০২৩) রাত ৮টায়।
তথ্য ঋণঃ স্বপন সোম, বেঙ্গল রেপোর্টারি
