
মিলেছে ইন্ডিয়া বুক অফ রেকর্ডসের স্বীকৃতি
ছোটোবেলা থেকেই শব্দছকের নেশা। খবরের কাগজের শব্দছক কাঁচি দিয়ে কেটে স্কুলে নিয়ে যেতেন। ক্লাসে বসে সমাধান করতেন লুকিয়ে। তাঁর বাবা ওই স্কুলেরই শিক্ষক। একবার বাবার হাতে ধরা পড়ে ক্লাস থেকে বেরিয়ে যেতে হয়েছিল। কিন্তু ভূত নামেনি মাথা থেকে। দশম শ্রেণিতে পড়ার সময়ে ডাইনোসোর নিয়ে শব্দছক বানিয়ে পাঠালেন এক সংবাদপত্রের অফিসে। প্রকাশিত হওয়ার পর ওই বিভাগের সম্পাদক আরও শব্দছক বানাতে উৎসাহ দিয়েছিলেন। তাকেই পেশা হিসেবে বেছে নিলেন শুভজ্যোতি রায়।

উচ্চমাধ্যমিকের পর প্রাতিষ্ঠানিক লেখাপড়ায় উৎসাহ খুঁজে পাননি। তার জন্য গঞ্জনা সহ্য করতে হয়েছে অনেক। তবে দমে যাওয়ার পাত্র নন সন্তোষপুরের বাসিন্দা শুভজ্যোতি। প্রতিদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত শব্দছক বানানোর কাজে মগ্ন থাকেন। হাতের কাছেই রাখা থাকে বেশ কয়েকটি অভিধান। এছাড়াও নানা ধরনের বই। কোনোদিন ৫টি, কোনোদিন বা ১৫টি শব্দছক তৈরি করে ফেলেন। বিষয়ভিত্তিক শব্দছক বানানোয় জুড়ি নেই তাঁর। বাংলা নববর্ষ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, স্বামী বিবেকানন্দ, সুকুমার রায় – কিছুই বাদ দেননি। লকডাউনে করোনার ওপর শব্দছক বহু মানুষের প্রশংসা পেয়েছে। অতিমারি সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করতেই তাঁর এমন উদ্যোগ। সম্প্রতি শব্দছক তৈরি করেছেন কিংবদন্তি অভিনেতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে নিয়ে। তবে এখনও তা প্রকাশিত হয়নি।
শুভজ্যোতি আমাদের বললেন, “দীর্ঘ ২৩ বৎসর অতিক্রান্ত হতে চলল আমার প্রাণের এই শব্দছক। এগুলো আমার আপনজনের থেকেও বেশি আপন। কতটা আপন তা আমি বর্ণনা করতে পারব না। ভবিষ্যতে শব্দছক আরও অনেক দূরে নিয়ে যেতে চাই”। ২০১৮ সালে তাঁর শব্দের ছকবাজি ১৭০০ ছাড়িয়ে গেল। ভারতের কনিষ্ঠতম শব্দছকের স্রষ্টা হিসেবে ইন্ডিয়া বুক অফ রেকর্ডসের স্বীকৃতি পেলেন।
বছর আটত্রিশের শুভজ্যোতি এখন নিজের রোজগারে স্বাবলম্বী। শাড়ির নকশায় তাঁর শব্দছক ব্যবহার করেছেন বুটিক ডিজাইনার ডালিয়া মিত্র। একটি সংস্থা বাংলা শব্দছক নিয়ে অ্যাপ বানানোর প্রস্তাব দিয়েছে। শুভজ্যোতির কথায়, “সামনের বছর বাংলা শব্দছকের অ্যাপ আনতে চলেছি। যা সম্পূর্ণ অন্যরকমের হবে। এমন অ্যাপ ভারতের ইতিহাসে প্রথম।”

তাঁর সৃষ্টির সংখ্যা বর্তমানে ৩০০০ ছাড়িয়ে গিয়েছে। লিমকা রেকর্ডসে নাম নথিভুক্ত করেছেন ইতিমধ্যেই। তবে করোনা পরিস্থিতিতে কাজ বন্ধ সেখানে। শুভজ্যোতির আশা, জানুয়ারিতে মিলবে স্বীকৃতি। অবশ্য একটা খেদও রয়ে গিয়েছে তাঁর মনে। অকপটে জানালেন, “আমার এই শব্দছকগুলো কেউ যদি সংরক্ষণ করে তাহলে খুব ভাল হয়। এই একটাই আবেদন রইল আপনাদের কাছে। কারণ, ওই শব্দছকগুলো আমার কাছে থাকে আর আমি খুব যত্ন করে রেখে দিই ওদেরকে। তাই আমার অবর্তমানে ওরা খুব কষ্ট পাবে। আবারও অনুরোধ করছি একটু সংরক্ষণ করলে আমি খুব খুশি হব।” তাঁর লক্ষ এখন ৫০০০টি শব্দছক তৈরি করা। তারপর গিনেস বুক অফ ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে আবেদন করতে চান। বাংলার মুকুটে নতুন পালক যোগ করতে অক্লান্ত পরিশ্রম করে চলেছেন শুভজ্যোতি রায়।
