
সাইকেলে করে মাইলের পর মাইল পেরিয়ে মহিলাদের কাছে প্যাড পৌঁছে দিচ্ছেন সুমন্ত বিশ্বাস
সিঙ্গুর স্টেশন সংলগ্ন বস্তিতে থাকে রূপালি, টুনটুনি, টুম্পা আর স্বাগতার মতো ফুটফুটে কতগুলো মুখ। এদের বয়স ১৮ থেকে ৩০-এর মধ্যে। সঙ্গে থাকেন এঁদের মায়েরাও। প্রতি মাসের একটা নির্দিষ্ট দিনে এঁরা সবাই মিলে অপেক্ষায় থাকেন একজন মানুষের। তিনি চন্দননগর থেকে আসেন সাইকেলে চেপে। লকডাউনের মধ্যেও বাদ ছিল না তাঁর আসা। কিন্তু কেন? আসলে সংস্কার আর গোঁড়ামিতে এখনও এ দেশের নারীসমাজ নিমজ্জিত। একটা সহজ সাধারণ জৈবিক প্রক্রিয়াকে লুকিয়ে রাখার কত না কৌশল নিতে হয় নারীদের! তার উপর আর্থিক প্রতিবন্ধকতা। তার জেরে মাসে মাসে অতগুলো টাকা পাওয়া যাবে কোথায়?
গ্রামগঞ্জের কথা ছেড়ে দিলেও শহরের বুকেই দেখা যাবে মহিলাদের ঋতুস্রাব বা মাসিক নিয়ে কত ট্যাবু। সেই ট্যাবু দূর করতেই উদ্যোগ নিয়েছেন চন্দননগরের ভূগোলের শিক্ষক সুমন্ত বিশ্বাস। তিনিই রূপালি, টুম্পা, স্বাগতাদের হাতে প্রতি মাসে পৌঁছে দেন স্যানিটারি ন্যাপকিন।
মাসিক হলে মহিলারা পরিবারের সবরকম কাজ থেকে ব্রাত্য হয়ে যান। ঠাকুরঘর, রান্নাঘরের কাজ থেকে তাঁদের সরিয়ে দেওয়া হয়। শহরের বুকেও দোকানে ন্যাপকিন কিনতে গেলে কালো প্লাস্টিকে মুড়ে দেওয়া হয়। ঋতাভরী চক্রবর্তী অভিনীত ‘ব্রহ্মা জানেন গোপন কম্মটি’ ছবিতেও এমন অনেক নারী সচেতনতামূলক বার্তা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তাতে পাল্টেছে কি সমাজ?
কেউ প্রশ্ন তোলেন না, কীসের অশুচ? কীসের লুকোচুরি? সেই নিষিদ্ধ জায়গাটাই লড়াইয়ের জন্য বেছে নিয়েছেন সুমন্ত বিশ্বাস। সমাজে বদ্ধমূল সংস্কার দূর করতেই তাঁর ছাত্র-ছাত্রীদের নিয়ে ২০১৮ সালে গড়ে তুলেছেন ‘ভূ-সংকল্প’ নামের একটি সংস্থা। দরিদ্র নারীদের হাতে স্যানিটারি ন্যাপকিন তুলে দেওয়ার পাশাপাশি সর্বস্তরের মহিলাদের মনে সংস্কারের অন্ধকার দূর করতেই ছুটে বেড়ান পুরুলিয়া, বীরভূম, সুন্দরবন-এর প্রান্তিক গ্রাম-সহ নানা এলাকায়। সুমন্ত ‘বঙ্গদর্শন’-কে জানিয়েছেন, “২৮ মে আন্তর্জাতিক ঋতুকালীন স্বাস্থ্য দিবস। এটা ক’জন জানেন? আমাদের সমাজে সবচেয়ে অবহেলিত মহিলাদের ঋতুকালীন স্বাস্থ্যের দিকটি। এই অসচেতনতা থেকেই জরায়ুমুখ ক্যান্সার বাড়ছে। যতদিন বেঁচে থাকব ঋতুকালীন সংস্কার দূর করতে কাজ করব।”
গোঁড়ামি এ সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে। তাই সুমন্তকেও মাঝে মাঝে যথেষ্ট ঝামেলায় পড়তে হয়েছে বৈকি। হুগলির প্রান্তিক গ্রাম রসুলপুরে স্যানিটারি ন্যাপকিন বিলির কর্মসূচির ছবি সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশ পায়। এক মহিলার হাতে স্যানিটারি ন্যাপকিন, এই ছবি প্রকাশিত হয়। এতে মহিলার স্বামী চটে যান। এ যেন ফিল্মেরই গল্প। শুরু হল হাঙ্গামা। অবশেষে প্রশাসনের আধিকারিকদের হস্তক্ষেপে সব মিটমাট হয়। কিন্তু রসুলপুরে সুমন্তের ন্যাপকিন বিলির কর্মসূচি বন্ধ করতে হল। এ সব শুনতে শুনতে মনে পড়ে যাচ্ছিল অক্ষয় কুমার অভিনীত ছবি ‘প্যাডম্যান’-এর বেশ কিছু দৃশ্য। অরুণাচলম মুরুগানান্থমের উদ্যম যেমন তাঁকে ‘প্যাডম্যান’-এর স্বীকৃতি দিয়েছিল, তেমনভাবেই সুমন্তের পরিশ্রম আর আন্তরিকতায় তাঁকে ‘চন্দননগরের প্যাডম্যান’ বলাই যায়।
আপাতত ‘প্যাডম্যান’ সুমন্ত হুগলি সিঙ্গুর স্টেশন সংলগ্ন বস্তি এবং মোল্লা সিমলা গ্রামের হাই মাদ্রাসার পঞ্চম থেকে দশম শ্রেণিতে বিনামূল্যে স্যানিটারি ন্যাপকিন দেওয়ার দায়িত্ব নিয়েছেন। লকডাউনেও সে দায়িত্ব থেকে সরে আসেননি তিনি। সাইকেলে করে মাইলের পর মাইল পেরিয়ে মহিলাদের কাছে প্যাড পৌঁছে দিয়েছেন। স্যানিটারি ন্যাপকিন ভেন্ডিং মেশিন বসিয়ে দিলে কাজটা সহজ হত না? প্রশ্নের উত্তরে চন্দননগরের ‘প্যাডম্যান’ বলেন, “ভেন্ডিং মেশিন রি-ফিলিং করতে হয়, তাছাড়া মেশিন দেখাশোনার জন্য লোকবল লাগে। পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখতে হয়। সে সব হয় না বলেই ভেন্ডিং মেশিন জনপ্রিয় হয়নি।”
সচেতনতার বার্তা দিতে প্যাডম্যান সুমন্ত শুরু করেছেন ভ্রাম্যমাণ মেনস্ট্রুয়াল স্কুল। ঋতুস্রাবের প্রকারভেদ থেকে পলিসিস্টিক ওভারিয়ান সিনড্রোম ইত্যাদি বোঝানো হয়। ব্যানারে বিজ্ঞান দিয়ে ব্যাখ্যা করে সে সব বোঝানোর ব্যবস্থা থাকে। সুমন্ত বলেন, “কাজ করতে গিয়ে দেখেছি, অনেক নিম্নবিত্ত পরিবারে মহিলারা মাসে ৩০-৪০ টাকা খরচের ভয়ে ন্যাপকিন ব্যবহার করেন না। সে ক্ষেত্রে সরকার যদি রেশনের মাধ্যমে ন্যাপকিন বিলির ব্যবস্থা করে, তাহলে মহিলারা সুরক্ষিত থাকেন।”
১১ নভেম্বর সুমন্তের একমাত্র কন্যার জন্মদিন। সেই উপলক্ষে দিনটিকে সুমন্ত ঋতুকালীন সংস্কার দূরীকরণ দিবস হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। সুমন্ত এ সব কাজে পাশে পান তাঁর ছাত্র-ছাত্রীদের। অনীশ, মধুরিমার মতো বহু ছাত্র-ছাত্রী তাঁদের শিক্ষকের লক্ষ্য পূরণ করতে কাজে নেমে পড়েছেন। শিক্ষকের টিউশনি পড়িয়ে পাওয়া অর্থের সঙ্গে ছাত্র-ছাত্রীদের চাঁদা তুলে যা জমে, তা দিয়েই প্রতি মাসের কয়েকটা দিনের নিরাপত্তা দিতে স্যানিটারি প্যাড কিনে মহিলাদের কাছে পৌঁছে যায় টিম ভূ-সংকল্প। তা সে বোলপুর বা অযোধ্যা পাহাড়ের আদিবাসী গ্রাম হোক না কেন। ট্যাবু দূর করে প্রান্তিক পরিবারের মহিলারাও অপেক্ষায় থাকেন, কবে আসবে ‘চন্দননগরের প্যাডম্যান’।
