
কলকাতায় টিকে থাকা চট্টগ্রামের পাহাড়ি উপত্যকার স্মৃতি-সুগন্ধী হাওয়া এই রেস্তোরা
সে কি আর আজকের কথা! বাংলাদেশের পূর্ব-পাহাড়ি অঞ্চলের চট্টগ্রামের রূপসী একটি নদী, সাঙ্গু ওরফে শঙ্খ যার নাম, সেই নদীটি এবং তার তরুণ উপত্যকাকে মনে রেখে, ১৯৪৫ সালে খাস দক্ষিণ কলকাতার এস পি মুখার্জি রোডে পূর্ণ সিনেমা হলের পাশে বহুমূল্যে(১১ টাকা) একটুকরো জায়গা কিনে ফেলেন এইচ পি বড়ুয়া। সেই একটুকরো জায়গায় তিনি একটি রেস্টুরেন্ট শুরু করেন, ভালোবেসে নাম রাখেন ‘সাঙ্গুভ্যালি’। উপাদেয় নানান চাইনিজ আর ইন্ডিয়ান খাবারের পসরা নিয়ে আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি বড়ুয়া বাবুকে।
পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি কারণ, তখন বাংলা-বাজারে পিৎজা-বার্গার-সিসিডি’র ‘মার্কেট’ ছিল না। তখন কলকাতায় ‘চালু’ ছিল এই ধরনের রেস্তোরাই। এগুলোই তখন ছিল ‘কালচারাল’ ঠেক; কফিহাউস, বসন্ত কেবিন, অ্যালেন কিচেন, মিত্র ক্যাফে এরকম আরও কত ঠেক এখনও আগলে রেখেছে কলকাতা। যাই হোক, যেটা বলছিলাম… মোগলাই পরোটা, চিকেন কাটলেট অথবা এক কাপ ‘স্পেশাল’ সুগন্ধি চা খেতে ছবি বিশ্বাস, ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়, অনিল চট্টোপাধ্যায়, নবদ্বীপ হালদার, রবিন গুহ, ধনরাজ-ভেঙ্কটেশ, দীনেশচন্দ্র সেন, যোগমায়া দেবী কলেজে পড়ার সময় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সবাই নাকি নিয়মিত যেতেন সাঙ্গুভ্যালিতে। কেমন আছে বড়ুয়া বাবুর সাধের সেই ‘ভ্যালি’?
সাঙ্গুভ্যালির অন্দরে
“আগের মতো সেই ভিড়টা এখন টের পাওয়া যাচ্ছে না। করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে সময় লাগবে, আশা করছি ধীরে ধীরে সব ঠিক হয়ে যাবে। বর্তমানে আট জন কর্মচারীকে নিয়ে রেস্টুরেন্ট চালাচ্ছি। একসময় অনেক নামীদামী মানুষরা এখানে আসতেন, ঘন্টার পর ঘন্টা আড্ডা দিতেন। অল্পবিস্তর গল্প শুনেছি বাবার কাছে। আমি সেসব কিছু দেখিনি, আমাদের সময় থেকে পরিবেশটাই পাল্টে যেতে শুরু করলো। আমাদের দোকানে একটা পুরোনো ছাপ রয়েছে, সেটা যে খুব সচেতনভাবে পরিকল্পনা অনুযায়ী নির্ধারিত, এমনটা নয়। আমাদের অন্য কোনও শাখা নেই, এই বাড়িটা অনেক পুরোনো, তা ছাড়া ‘প্রপার্টি’জনিত অনেক ঝামেলাও আছে। যতটুকু সম্ভব ঠিকঠাক রাখার চেষ্টা চালাচ্ছি।”
বলছিলেন এইচ পি বড়ুয়ার উত্তরসূরি, রেস্টুরেন্টের বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক প্রসূন বড়ুয়া। আর তাঁর কথাগুলো আমি শুনছিলাম তাঁদের সাঙ্গুভ্যালি-তে বসে, চিকেন চপসি খেতে খেতে।
সাঙ্গুভ্যালির চিকেন চপসি
বুঝতে পারছিলাম তাঁরা চেষ্টা চালাচ্ছেন রেস্টুরেন্টটা বাঁচিয়ে রাখার। আপ্যায়নেও তাঁদের কোনও ক্রুটি ধরা যাবে না। দোকানের মত, কর্মচারিরাও তো ‘পুরোনো’! এত বছরের রেস্টুরেন্ট, মেনুতে কোনও পরিবর্তন আনেননি তাঁরা, বাজার অনুযায়ী দামে সামান্য হেরফের হয়েছে। আগে যা যা পাওয়া যেত, এখনও তাই তাই পাওয়া যায়। এখনও একইভাবে জনপ্রিয় এখানকার কাটলেট, মোগলাই, চাইনিজ। তবে, আগের মতো শুধু চা বা কফি খেতে এখন আর কেউ এর খোঁজ করে না। অধুনা ‘ক্যাফে-কালচার’ থেকে বাদ পড়েছে ‘সাঙ্গুভ্যালি’। সময় পাল্টেছে, পাল্টাতে পারেননি বড়ুয়ারা, পাল্টায়নি এই শহরটার প্রতি তাঁদের ভালোবাসা। অনেকেই আসে, খায়, চলে যায়। অনেকে আবার পুরোনো গল্প জেনে আসে, খায়, চলে যায়…কিন্তু মনে ধরে রাখে। আমার মতো। একটা চিকেন চপসি হজম করে আর একটা কাটলেট ‘প্যাক’ করে বেরিয়ে আসার সময় বেশ ভালো মতোই টের পাচ্ছিলাম- ‘সাঙ্গুভ্যালি’, কলকাতায় টিকে থাকা চট্টগ্রামের পাহাড়ি উপত্যকার স্মৃতি-সুগন্ধী হাওয়া।
ছবি নিজস্ব
