লোকায়ত ও নাগরিক সংগীতের মেলবন্ধনে সহজিয়া

১৭ নভেম্বর রবীন্দ্র সদনে ছিল সহজিয়া উৎসব

বিগুরুর ‘তালগাছ’ কবিতা বাঙালির বহুপঠিত। কবিতাটিতে তালগাছটি বাসা খানি ফেলে আকাশে উড়তে চায় তার গোল গোল পাতায় ভর করে, তবে দিনের শেষে যখন হাওয়া কমে আসে, পাতা আর সেভাবে কাঁপে না তখন ‘ফেরে তার মনটি’। শিকড়ের টানকে আঁকড়ে সে বোঝে মাটিই তার মা, তার নিশ্চিন্ত আশ্রয়। কবিতার ওই গাছটি যেন একুশ শতকের সদাব্যস্ত ছুটে চলা মানুষের প্রতিভূ। যাদের লক্ষ্য আকাশছোঁয়া, সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে উঠতে চায় উঁচুতে আরও উঁচুতে, তবে শিকড় রয়েই যায় মাটিতে‌। আর এই শিকড়ের টানই অনুভব করায় লোকসংগীত, লোকসংস্কৃতি, যা মানুষের পরিচয়, একইসঙ্গে আশ্রয়ও বটে। কলকাতার নাগরিক জীবনের ব্যস্ততার মধ্যেও এই শিকড়ের টানকে ১৭ নভেম্বর সন্ধ্যায় মনে করালো সহজিয়া গানের দল। কলকাতায় হেমন্তের সেই সন্ধ্যায় রবীন্দ্র সদনের পূর্ণ প্রেক্ষাগৃহে সহজিয়া সেদিন জ্বালালো সাঙ্গীতিক আকাশবাতি। প্রখ্যাত শ্রীখোলবাদক তিলক মহারাজ-এর স্মরণে আয়োজিত হয়েছিল এদিনের অনুষ্ঠান। তিলক মহারাজ তাঁর দীর্ঘ সংগীত জীবনে পণ্ডিত রবিশঙ্কর, পূর্ণদাস বাউল, গোষ্ঠগোপাল দাস প্রমুখ শিল্পীদের সঙ্গে দেশ-বিদেশে সঙ্গত করেছেন। এছাড়াও ভারতীয় সংস্কৃতি মন্ত্রক, পূর্বাঞ্চল সংস্কৃতি কেন্দ্র ও সহজিয়া ফাউন্ডেশন-এর যৌথ উদ্যোগে ‘গুরু-শিষ্য পরম্পরা’ প্রকল্পের শ্রীখোলের প্রশিক্ষক ছিলেন গত একবছর‌। শুধু তিলক মহারাজ নন, সাধন দাস বৈরাগ্য, ঝুমুরিয়া সুভাষ চক্রবর্তী, মহীনের আদি ঘোড়ার অন্যতম তাপস বাপি দাস-কেও এদিন গানে গানে স্মরণ করেন সহজ সুরের পাঠশালার শিল্পীবৃন্দ। পাশাপাশি বাংলার অনেক খ্যাতনামা শিল্পী, শিশু শিল্পীরাও মাটির গানে মাতালেন ভরা প্রেক্ষাগৃহ।

সংগীত মানে না‌ কোনো ভৌগোলিক বেড়াজাল। তাই তার কোনো নির্দিষ্ট পরিধি নেই। তবু মানুষের সৃষ্ট গ্রাম শহরের ভেদাভেদ এসেই পড়ে সর্বক্ষেত্রে, সংগীতও তার ব্যতিক্রম নয়। এই লোকায়ত আর নাগরিক সুরের স্রোত একসঙ্গে মিশে গেল সহজিয়ার মঞ্চে।

শুধু এই বছর নয়, বরাবরই অগ্রজদের সম্মাননা ও স্মরণ সহজিয়া ফাউন্ডেশনের অনুষ্ঠানের অন্যতম এক রীতি। সহজিয়ার প্রাণপুরুষ শিল্পী দেব চৌধুরী বঙ্গদর্শন.কম-কে এ প্রসঙ্গে জানান, “অগ্রজদের স্মরণ করা এই উৎসবের একটা পরিসর। তবে শুধু স্মরণ করাই নয়, বর্ষীয়ান যাঁরা আমাদের মধ্যে আছেন, তাঁদের কাজকে এই সময়ের কাছে তুলে ধরাও আমাদের একটা মুখ্য উদ্দেশ্য। তাই সহজিয়া উৎসব ২০২২–এ ‘লাল পাহাড়ির দেশে যা’ গানের ৫০ বছর পূর্তি উদযাপন করেছিলাম। ২০১১-তে আমাদের প্রথম উৎসব কালাচাঁদ দরবেশকে নিয়ে করা হয়েছিল, যার ফলে শহরবাসীর দরবেশি গান সম্পর্কে একটা ধারণা হয়েছিল। এই উৎসব কখনও মনসুর ফকির বা পবনদাস বাউলকে মধ্যমণি করেও হয়েছিল। আবার সনাতন দাস বাউল, তিনকড়ি ক্ষ্যাপা, কালাচাঁদ দরবেশ, অমর পাল – এঁদের স্মরণেও আমরা বিভিন্ন বছরে সহজিয়া উৎসবের আয়োজন করেছি।”

সংগীত মানে না‌ কোনো ভৌগোলিক বেড়াজাল। তাই তার কোনো নির্দিষ্ট পরিধি নেই। তবু মানুষের সৃষ্ট গ্রাম শহরের ভেদাভেদ এসেই পড়ে সর্বক্ষেত্রে, সংগীতও তার ব্যতিক্রম নয়। এই লোকায়ত আর নাগরিক সুরের স্রোত একসঙ্গে মিশে গেল সহজিয়ার মঞ্চে। সহজিয়া ফাউন্ডেশনের পক্ষে দেব চৌধুরী বলেন, “আমরা নাগরিক মানুষেরা লোকগান পরিবেশনার ক্ষেত্রে সমকালীন বিশ্বসংগীতের অনুষঙ্গে ভাবি, তেমনই লোকসংগীতও কিন্তু পথ হাঁটে। আটচালায় বসে, নদীতে নৌকার দাঁড় বাইতে বাইতে, ধান রুইতে রুইতে গাওয়া, ইত্যাদি কর্মসংগীত কিন্তু মঞ্চে বা টিভিতে পরিবেশন করার সময় ভীষণ স্ট্রাকচারালি পরিবেশন করতে হয়। এটা সংগীতের বিজ্ঞানভিত্তিক জায়গা। সহজিয়া উৎসবের একটা অন্যতম উদ্দেশ্য লোকশিল্পী বিশ্বনাথ দাস বাউল, দীনদয়াল, রামপুরহাটের রাধেশ্যাম দাস, কানাই দাস, উত্তরবঙ্গের ধনেশ্বর মাস্টারমশাই, নরেন রায়ের মতো প্রান্তিক অঞ্চলের মানুষজনের সঙ্গে একই মঞ্চে একই যন্ত্রানুষঙ্গে কখনও কখনও বাংলার স্টার তারকারা, যেমন ভূমির সৌমিত্র, ফসিলসের রূপম, কখনও ইমন, ক্যাকটাসের সিধু-পটা বা চন্দ্রবিন্দুর উপল-অনিন্দ্যদের স্টেজ শেয়ারের জন্য জায়গা তৈরি করা। এই যে লোকায়ত এবং নাগরিক সংগীতের মিশ্রণ বা মেলবন্ধনই সহজিয়া উৎসবের প্রাণ।”

সহজিয়ার পথ চলা শুরু হয় ২০০৯ সালে। তখন থেকেই সহজিয়া ফাউন্ডেশন বর্ষীয়ান লোকশিল্পীদের জন্য সহায়তার এবং বাংলার লোক সংগীতের প্রচার ও প্রসার-এর কাজ করার চেষ্টা করছে। পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের গায়কদের লোকসংগীতের সঙ্গে আলাপ করাচ্ছে সহজিয়া। দেব জানান, এই প্রজন্মের গায়কদের লোকসংগীত নিয়ে উৎসাহ বাড়ছে। বিভিন্ন রিয়্যালিটি শোয়ের মঞ্চেও লোকগান আলাদা বিভাগ হিসাবে যথেষ্ট গুরুত্ব পায়। দেশ বিদেশেও ১৫-২৫ বছর বয়সীদের মধ্যে লোকগান শেখার আগ্রহ উল্লেখযোগ্য ভাবে চোখে পড়ে। তবে মাটির টান কতটা অনুভব করে এই গান করে জেন ওয়াই? এই প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “মঞ্চে উঠে অন্যান্য গানের সঙ্গে কয়েকটা লোকগান গাওয়া বা রিয়্যালিটি শো-তে অংশগ্রহণ করা বা নাগরিক পরিমণ্ডলে জনপ্রিয় কোনো গ্রামীণ মেলায় গিয়ে দু-দিনের প্যাকেজে লোকশিল্পীদের সান্নিধ্য পাওয়ার মধ্যে অনেকেরই লোকগানের চর্চা সীমাবদ্ধ হয়ে যায়। তাদের মাটির টান সম্পর্কে আমি সন্দিহান। সারা বছর কাজ করে যাওয়ার লোক বর্তমান প্রজন্মের মধ্যে খুবই কম। তবে আমি আশাবাদী, কিছু ছেলে-মেয়ে নিশ্চয়ই তৈরি হবে, যারা লোকগানের শিকড় খুঁজে তাকে একাধারে লালন-পালন করে ও অন্যদিকে তার ছত্রছায়ায় নিজেদের সমৃদ্ধ করবে।”

আজকের বাঙালি গ্লোবাল। সারা বিশ্বের দরবারে তার অবাধ যাতায়াত। সারা বিশ্বের সংগীত সংস্কৃতির সঙ্গে আজ সবাই সুপরিচিত। তেমনই সারা বিশ্বে বাংলার লোকসংগীত চর্চা-র মাধ্যমে ভাদু, টুসু, গম্ভীরাও পৌঁছে যাচ্ছে বিশ্ববাসীর কাছে। আর মিলনক্ষেত্রই প্রস্তুত করছে সহজিয়া, যেখানে মাটির গানের মূল সুরই সমন্বয়।

Developed by DXDasia