রুই মাছের টিকলি ভাজা

রান্না নিয়ে বাঙালির হেঁশেলে এক্সপিরিমেন্ট

বাংলায় ব্রিটিশ বিরোধিতা শুধুই যুদ্ধক্ষেত্রেই নয়, এই আন্দোলন চলত বাঙালির অন্দরমহলেও। গৃহিণীদের দুপুরের গল্পের আসরে থেকে শুরু করে হেঁশেলেও। এদিকে ইংরেজি শিক্ষিত গৃহস্বামীর আনা ইংরেজি খাবারের রেসিপির পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে চলত দেশীয় পদ্ধতিতে সেই সব খাবার তৈরির অভ্যাস। আজও বেশ কিছু বনেদিবাড়ির মানুষজনের মুখে শোনা যায় এমই সব কিছু কথা। ভিক্টোরিয়া আমলে মনে করা হত, ঘরের আসবাবপত্র থেকে শুরু করে যে-কোনও উপকরণই ঢেকে রাখা উচিত। কারণ খোলা বা নগ্নতা অসভ্যদের প্রতীক। এই ঢাকা দেওয়ার রীতির প্রভাব পড়ল রান্নায়। ইংরেজরা মনে করত শুধু নুন-হলুদ লাগিয়ে মাছ ভাজা খাওয়া খুব নিম্নশ্রেণীর রুচি। অতএব দেশী মাছকে বিস্কুটের গুঁড়ো অথবা বেসনের প্রলেপ দিয়ে বানালো হল ফিস কাটলেট। বাঙালির খাদ্য তালিকায় যুক্ত হল কাটলেট, চপের মত প্রলেপ দেওয়া সান্ধ্যকালীন খাবার। বাঙালিরাও কম যায় না। তারাও বিলিতি সংস্কৃতিকে টেক্কা দেওয়ার জন্য তৈরি করল মাছের পাতুরি। বিস্কুটের গুঁড়ো, বেসন, বেকিং পাউডার ভারতীয়রা জানে না। সরষে বেটে অথবা পোস্ত বেটে তার সঙ্গে গোটা কাঁচালঙ্কা দিয়ে গাছপালার পাতায় মুড়ে সুতো দিয়ে বেঁধে দিল। পাতায় বাঁধা মশলা মাখানো মাছকে বসিয়ে দিল উনুনের আঁচে। যাকে বলে বেক/ফ্রাইড ফিস।

আজ আমরা বারবিকিউ-এর মতো বড় বড় রেস্তোঁরায় নানা বিদেশি নামের খাদ্যতালিকা পাই। সেই আমলেই শুরু হয় রান্না নিয়ে হাজারো রকমের এক্সমেরিমেন্ট। এই সব দেশি খাবারও যুক্ত হল সেই সময়কার রাজ-রাজাদের অনুষ্ঠানের ভোজন তালিকাতে। চিত্র দেবের লেখা বিবাহবাসরের কাব্যকথায় উল্লেখ পাওয়া যায় এমন হরেক রকমের খাবারের। এই বইতে উল্লেখ আছে, বিশ শতকের কৃষ্ণনগরের মহারাজ কুমার সৌরীশচন্দ্র রায়ের ‘পাকা-দেখা’ উপলক্ষে প্রকাশিত ক্রমণী-পুস্তিকা ছাপা হয়েছিল একশো আটত্রিশ রকম দেশি-বিদেশি খাবারের তালিকা। এত খাবার ছিল যে খেয়ে অতিথিরা যাতে অসুস্থ না হয়ে যায় তার জন্য ছিল হজমের ওষুধ। এবং যাতে খাবার খেয়ে ভালো ঘুম হয় তার জন্য ছিল ঘুমের ওষুধও। সেই খাদ্যতালিকার একটি খাবার তৈরির রেসিপি এবার আপনার জন্য। খাবারের নাম- ‘রুই মাছের টিকলি পোলাও’। আজ আমরা এই রুই মাছের টিকলি কিভাবে তৈরি করতে হয় তার রেসিপি দিলাম। বানিয়ে দেখুন কেমন লাগে খেতে।

রুই মাছের টিকলি ভাজা
রুইমাছ অল্প সিদ্ধ করে বা তেলে অল্প ভেজে কাঁটা বেছে নিতে হবে। মাছের মধ্যে নুন, হলুদ, লঙ্কাবাটা, অল্প লেবুর রস অথবা দই দিতে পারেন। যদি লেবু অথবা দই না থাকে অল্প ভিনিগারও দিতে পারেন। তবে মনে রাখবেন, যেটাই দেবেন খুব অল্প পরিমাণে দেবেন। অল্প আদা, একটি ডিম, পেঁয়াজবাটা, রসুনবাটা মেশাতে হবে। মাখাটি ভালো করে শুকনো করে মাখতে হবে। ঝাল খেতে চাইলে একটু লঙ্কার গুঁড়োও দিতে পারেন। ভালো করে মাখা হয়ে গেলে ছোট ছোট গোলাকার টিকলি বা বলের মত করে নিন। টিকলিগুলিকে বেসন বা ময়দা চুবিয়ে সাদা তেলে অথবা ঘিয়ে ভেজে নিন। ভাজা টিকলি দিয়ে টিকলি কালিয়া রান্না করতে পারেন। আবার । মাছের টিকলি করার জন্য কাতলা, বাউস, মৃগেল ও মহাশোল মাছ ব্যবহার করা হয়। রুই মাছের টিকলি পরিবেশন করুন ধনে পাতার চাটনি অথবা টমেটো সস দিয়ে। সন্ধ্যাবেলায় গল্প করতে করতে খান। পাশাপাশি, পোলাও রান্না করে রুই মাছের টিকলিগুলি তাতে দিয়ে দিন। হয়ে যাবে রুই মাছের টিকলি পোলাও।   

Developed by DXDasia