নয়া নজির– ইয়কসাম থেকে জোংরি টপ, একদৌড়ে মাত্র সাড়ে ৬ ঘণ্টায়

জোংরি উঠে নেমেও আসা একদিনেই

“When you run on the earth and with the earth, you can run forever.”

উপরের বাক্যটা একটি রারামুরি প্রবাদ। রারামুরি উপজাতির মানুষরা মেক্সিকোর দুর্গম উপত্যকায় বসবাস করে, যাঁদের খুজে পাওয়া গিয়েছে মাত্র কয়েক দশক আগে। এঁরা নাকি স্রেফ মজা করার জন্যে ২০০-৩০০ কিমি দৌড়তে পারে! মানুষের শারীরবৃত্তীয় নানা ঘটনাবলী প্রমাণ করে, আমাদের বিবর্তন হয়েছে লম্বা দৌড়ের উপযোগী হিসেবেই। পৃথিবীতে খুব কম প্রাণী আছে যারা দূরপাল্লার দৌড়ে মানুষকে হারাতে পারে। এমনকি ১০০ মাইল দৌড়ে একটি ঘোড়াকেও হারিয়ে দিতে পারে মানুষ।

প্রকৃতির মাঝে তাই প্রকৃতিগতভাবে পাওয়া দৌড়ের অভ্যেস অন্যরকম আনন্দ এনে দেয়।

সে’রকমই আনন্দ পেতে গিয়েছিলাম কাঞ্চনজঙ্ঘা অভয়ারণ্যে। কাঞ্চনজঙ্ঘার ঠিক নিচে সিকিমের পশ্চিমাংশ জুড়ে রয়েছে এই অভয়ারণ্য। দুর্গম এই অরণ্যের মধ্যে রয়েছে দুটো জনপ্রিয় ট্রেকরুট, জোংরি এবং গোচালা। জোংরি ট্রেকরুটের মতো কঠিন ট্রেক হিমালয়ে খুব কমই আছে। ভাঙাচোরা রাস্তা, হঠাৎ হঠাৎ চড়াই ঢাল, সঙ্গে উচ্চতা পুরো রুটকে বেশ চ্যালেঞ্জিং বানিয়ে তুলেছে। ট্রেকাররা শেষ গাড়ির রাস্তা ইয়ুকসাম (উচ্চতা ১৯০০ মিটার) থেকে জোংরি গিয়ে পৌছায় ২-৩ দিনে, নেমে আসতে সময় নেয় আরো ১-২ দিন। অর্থাৎ, ওঠা-নামা মিলিয়ে ৩-৫ দিন সময় লাগে। আমরা দেখতে চাইছিলাম, গোটাটা একদিনে সম্ভব কিনা!

আমরা, মানে দ্য আলট্রা হিমালয়ানস-এর বন্ধুবান্ধবরা, গিয়েছিলাম পুরনো একটি রুট খুঁজে বের করার জন্যে, রাউন্ড গোচালা রুট। তখন মার্চের শুরুর দিক। এতটাই বরফ চারপাশে যে সেই রুট ধরে যাওয়াটাই অসম্ভব ছিল। ঠিক করলাম, একদিন স্থানীয় মনেষ্ট্রিগুলো ছুঁয়ে-ছুঁয়ে দৌড়ব। আরেকদিন জোংরির দিকে উঠব আর নামব। 
সেইমতো, প্রথম দিন গেলাম একে একে দুবডি, সিনোন, হোংরি মনেষ্ট্রি হয়ে লাবডাং অবধি। ফের ফিরে এলাম ইয়কসাম, সব মিলিয়ে ৪২ কিমি দৌড়নো হল। দ্বিতীয় দিন বেরলাম জোংরির উদ্দেশ্যে। 

ভোর ৬টার দিকে দৌড়নো শুরু করেছিলাম সবাই। ঠিক ছিল যে যার মতো স্পিডে দৌড়ব। কিন্তু, দুপুর ১টায় ফিরে আসা শুরু করব। আমি আমার মতো স্পিড বাড়িয়ে ছুটে চলেছি, প্রথমে একে একে চারটে ব্রিজ পেরোতে হয়। ঘন জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে সামান্য চড়াই-উতরাই পেরিয়ে যখন প্রথম ক্যাম্পসাইট সাচেন পৌঁছলাম, তখন ১ ঘণ্টা ২০ মিনিট পেরিয়েছে। দেখলাম জোংরি ট্রেকার্স হাটের চৌকিদার উঠছে, প্রাণান্তকর চড়াই পেরিয়ে তাঁকে ধরেও ফেললাম দ্রুতই। এই চড়াই সোজা গিয়ে শেষ হয়েছে দেওরালি টপে। 

পরের ক্যাম্পসাইট বাকহিম পৌছলাম ২ ঘণ্টা ১০ মিনিটেই, উচ্চতা ২৭০০ মিটার, পেরিয়েছি ১২ কিমি। এখানে একটু রুটি আলু খেয়েই চললাম পরের ক্যাম্পসাইট শোকাতে, উচ্চতা ৩০৫০ মিটার, পৌছলাম ৩ ঘণ্টায়। শোকা পেরিয়ে একটু উঠতেই বরফ শুরু হল। প্রচণ্ড শক্ত পিচ্ছিল বরফে রানিং শু রাখতেই পিছলোতে শুরু করল। একবার ভাবলাম ফিরেই যাই, আরেকবার ভাবলাম সময় আছে এখনো, চেষ্টা করে দেখি। দুটো স্টিক বরফে গেঁথে গেঁথে কোনোক্রমে পিছলাতে পিছলাতে উঠছি। বরফে ঢাকা জঙ্গলের অপূর্ব রূপ তখন মন ভরিয়ে দিচ্ছে। ফেদাং পৌঁছলাম ৩৭৭০ মিটার উচ্চতায়, ৪ ঘণ্টা ৩৫ মিনিটে। ততক্ষণে মেঘে চারিদিক ঢেকে গিয়েছে। একা দৌড়ে চলেছি দেওরালি টপের দিকে। বরফ কাদা চড়াই ঠান্ডা হাওয়া মিলিয়ে চ্যালেঞ্জিং পরিবেশ তৈরি করেছে। অবশেষে উঠে এলাম দেওরালি টপে, উচ্চতা ৪১০০ মিটার। সময় লাগল মোট ৫ ঘণ্টা ২০ মিনিট। এরপর ৪০৪০ মিটার উচ্চতার জোংরি পৌঁছে গেলাম ৫ ঘন্টা ৫২ মিনিটেই। ট্রেকার্স হাটে চা বানাতে বলে দৌড় লাগালাম জোংরি টপের দিকে।

জোংরি টপ, উচ্চতা ৪২৬৫ মিটার। ট্রেকার্সরা এখানে এসে দাঁড়ায় একদম সামনে থেকে তিংচেনকাং, পান্ডিম, কাঞ্চনজঙ্ঘা, কার্বু, কুম্ভকর্ণ শৃঙ্গ দেখার জন্য। ইয়ুকসাম থেকে এখানে উঠে আসতে সময় নেয় প্রায় ৩ দিন, আমি গিয়ে পৌছলাম মাত্র ৬ ঘণ্টা ২৫ মিনিটে! নিজের আবেগকে তখন নিয়ন্ত্রণ করতে পারছি না, নিজের ক্ষমতাকে বিশ্বাস করতে পারছি না। দাবি করতেই পারি, একাকী স্বনির্ভরভাবে এটি জোংরি টপে পৌঁছনোর এখনো অবধি দ্রুততম সময়। ভালো পরিবেশে আমি হয়তো আরো দ্রুত শেষ করতে পারি, কিন্তু আরো ভালো লাগবে যদি কোনো ভারতীয় এই রেকর্ড চ্যালেঞ্জ জানাতে পারে।

আমার কাছে উপরে রাত কাটানোর কোনো সরঞ্জাম ছিল না, তাই নেমে আসার মত এনার্জি বাঁচিয়ে চলতে হচ্ছিল। জোংরি হাটে এক কাপ চা খেয়ে ফের নামতে শুরু করলাম বরফে আছাড় খেতে খেতে। সব মিলিয়ে ইয়ুকসাম নেমে আসতে সময় লাগলো ১১ ঘন্টা ৩০ মিনিট! পেরোতে হল ৪২ কিমি, সঙ্গে মোট চড়তে হল ৫০০০ মিটার।

রাতে চিকেন ডিনার খেতে খেতে ভাবছিলাম এবার একদিনে জোংরি-গোচালা ট্রেক শেষ করলে কেমন হবে?

Post Tags
Developed by DXDasia