গ্রামের নাম গাংপুর আর আদুরে নাম ‘রাবড়ি গ্রাম’

এই গ্রামের প্রত্যেকটি ঘরের মানুষ রাবড়ি বানান, এটাই সকলের পেশা

গ্রামের নাম গাংপুর। পাশে আঁইয়া। না, গ্রামের নাম রাবড়ি নয়। তবু লোক-পরিচিতি এ নামেই। একটা গ্রামের নাম এভাবে বদলে যায়। কেন? পুরো গ্রামের মানুষের পেশা পরিচয়ে নামের বদল। হ্যাঁ, গ্রামের প্রত্যেকটি ঘরের মানুষ রাবড়ি বানায়। এটাই সকলের পেশা। পুরো গ্রামই যেন রাবড়ি ইন্ড্রাস্ট্রি। এসব মজার ঊর্দ্ধে জেগে থাকে একটা গ্রামের সত্তা। গ্রাম কি আর গ্রাম আছে, তার উপর কলকাতা থেকে মাত্র ৩৫ কিলোমিটার যার দূরত্ব – সে কি গ্রাম থাকতে পারে! তবু গাংপুরে একটা-দুটো টালির ঘর, অ্যালুমনিয়ামের বাসন, পাড়ার মোড়ে দুপুরের রোদ পোহানো বুড়ো-বুড়ি, গা এলানো পরচর্চা করা মহিলাদল গ্রাম নিয়ে আছে। একজন নতুন আগন্তুককে দেখে হুড়মুড়িয়ে বেরিয়ে পড়া পাড়ার ছেলে থেকে বুড়ো, কিশোরী থেকে বৃদ্ধার; তারপর নাম, বাড়ি জিজ্ঞেস করা এসবের মধ্যে যে সহজ আন্তরিকতা লুকিয়ে থাকে, তা একটা গ্রামের প্রাণ চেনায়। কিন্তু গাংপুরে এসবের সঙ্গে আর একরকম আপ্যায়ন মন্ত্র অভিভূত করে।

তথ্য পেয়ে আমরা তিন বন্ধু বেরিয়ে পড়লাম রাবড়ি গ্রামের খোঁজে। গুগল ম্যাপে লোকেশনে তীর রেখে চললাম গাংপুর। পৌঁছতে পৌঁছতে সন্ধে নামে। সামনের মূল রাস্তা থেকে গ্রামে ঢোকার মুখেই এক মধ্যবয়সী পুরুষ ‘রাবড়ি গ্রামে এসেছেন, রাবড়ি খাবেন?’ বলে আমাদের সচেতন করেন। একটু এগিয়ে পাড়ার মোড়ে আসা মাত্রই ক’জন আড্ডারত মহিলা প্রশ্নের পর প্রশ্নে জেনে নিতে চায় আমাদের উদ্দেশ্য, অবস্থান। আমরা রাবড়ি কিনবো এ উদ্দেশ্য নিয়ে ঠিক আসিনি। তবে একটু চেখে যাওয়ার ইচ্ছে তো ছিলো ষোলোআনাই। সেটা জানাতেই, ওরা, কার বাড়িতে ফুরিয়ে গেছে এসময়, কার বাড়িতে পাওয়া যেতে পারে এবং তারও মধ্যে কাদের বাড়ি সে রাবড়ি খুব ভালো স্বাদের হবে নিজেদের মধ্যেই এ সব সমস্যার ফয়সালা করে নিয়ে আমাদের সামনের একটি বাড়ি দেখিয়ে দিলো। শুধু দেখিয়ে দিয়েই ক্ষান্ত হলো না, এক মহিলা নিয়ে চললেন রাস্তা দেখিয়ে। আমাদের বাহন, বাইককে ওখানেই দাঁড় করালাম। তাঁরা আশ্বস্ত করলেন, কোনো চিন্তা নেই, তাঁরা ওখানেই আরো কিছুক্ষণ থাকবেন, কেউ নিয়ে যাবে না। তারপর হাসির পর হাসি।

গন্তব্যে পৌঁছলাম। বাড়িতে রাবড়ি চাখতে এসেছি শুনেই গৃহকর্ত্রী দু-এক পাত্র ঘেঁটে কতটা আছে দেখে নিয়ে আমাদের পরিবেশন করলেন। ছোটো প্লাস্টিকের চামচ এবং একটি চিনামাটির প্লেটে। চামচ দেখে বুঝলাম এখানে এটাই নিয়ম – আগে খাও, তারপর কিনবে। মুখে দিয়েই অমৃত আস্বাদের আনন্দ প্রায়। খুশি হলাম। জানালাম। কিনতে চাইলাম। কিন্তু বিধিবাম। তাঁদের বাড়িতেও শেষ আজকের মতো। সন্ধেবেলায় আবার বানাতে বসবেন কালকের অর্ডার সাপ্লাই দিতে। সেটা হতে দেড় ঘণ্টা দেরি হবে। জানালেন। আমরা অপেক্ষা করতে রাজি হলাম। অন্যদিকে বাড়ির যুবক ছেলেটি ততক্ষণে হাজির করেছেন পাঁচশোর মতো রাবড়ি, পাশের বাড়ি থেকে। জানালাম গরম গরম নিয়ে যাবো, তাই এটা আর নিচ্ছি না। কিন্তু যাঁদের বাড়ি থেকে আনলেন তারা কিছু মনে করবে না তো! জানালো, এইটাই রীতি এখানকার – একজনের বাড়ি নেই তো অন্যজনের। এখানে সে অর্থে বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতা নেই। আছে অতিথিসেবা।এই তো গাংপুর, এই তো গ্রাম। একটা গভীর কড়াইয়ে বানানো হয় রাবড়ি। সে কড়াইয়ের নিচের তলটা চ্যাপ্টা মত, আর দুই ধার খাড়াই। লোহার পাত যোগে বিশেষ ভাবে তৈরি হয় এই কড়াই। সেই কড়াইয়ে একসঙ্গে ছ’কিলো দুধের রাবড়ি তৈরি হয়। ছ’কিলো দুধে দু’কিলোর মতো রাবড়ি হয়। প্রতি কিলো রাবড়ি ২৫০ টাকা।

কীভাবে তৈরি হয় এই রাবড়ি? হালকা আঁচে দুধ গরম হয় আর উপর থেকে চলে হাত পাখার শীতল বাতাস, যাতে ঠান্ডা পাওয়া মাত্রই গরম দুধের উপর সর জমে। সে সর জমা মাত্রই একটা লোহার কাঠি দিয়ে তুলে দেওয়া হয় কড়াইয়ের উঁচু গায়ে। এভাবে চারিদিকে তুলতে তুলতে সরের স্তর জমে। যত স্তরীভূত সর জমে গায়ে তত নিচের দুধ হয় গরম, যেহেতু ক্রমাগত আঁচ পেয়ে জল মরে দুধ ঘন হয় – যাকে বলে থাকি মালাই। এক সময় এই ঘন মালাই-সহ কড়াই আঁচ থেকে নামানো হয়। তারপর মালাইটা সযত্নে অন্য পাত্রে তুলে রাখা হয়। আর স্তরীভূত সরের কড়াই ঠান্ডায় রেখে দেওয়া হয়, যাতে সরটা টেনে যায় – শুকিয়ে যায়। পর টেনে গেলে ছুরি দিয়ে গোল করে ও উপর নিচে পুরো কড়াই জুড়ে কেটে নেওয়া হয়। এভাবে কাটলে আপনা-আপনি শুকনো সর দেওয়াল ছেড়ে কড়াইয়ের নিচে জমা হয়। এরপর গরম মালাইয়ে টাটকা খেজুর গুড় দিয়ে ফুটিয়ে নিয়ে আঁচ থেকে নামিয়ে সরগুলো মিষ্টি মালাইয়ে ডুবিয়ে দেওয়া হয়। ভিজে গেলেই প্রস্তুত গরম রাবড়ি।পুরোটা দেখলাম। পাঁচশো করে আমরা কিনলামও। এর মধ্যে আবার কিছু ক্রেতা হাজির হন। কেনেন। এবং দেখি সকলকেই একই রকমভাবে আতিথ্য দেওয়া হচ্ছে। সন্ধেয় চা, বেগুনি, এমনকি মুড়িও। এই আন্তরিকতাই গাংপুরের প্রাণ। তখন সে রাবড়ি ইন্ড্রাস্ট্রিও নয়, রাবড়ি গ্রামও নয়। এর সঙ্গে বলার, বাড়ির কিশোর থেকে বয়স্ক সকলেই সময়-সুযোগ মতো হাত লাগায় রাবড়ি প্রস্তুতির নানা পর্বে। সেও এক শিল্প উদযাপন।

 

Developed by DXDasia