
বিজ্ঞান ও আধ্যাত্মিকতার মিলন
রবীন্দ্রনাথ ছিলেন বাউল এবং সুফি দর্শনের অনুরাগী। মুস্তাফা জালালউদ্দিন রুমি তাঁকে অনুপ্রাণিত করেছিলেন গভীরভাবে। প্রায় ৮০০ বছর আগে রুমির জন্ম হয় কবুলে, তবে জীবন কাটিয়েছেন পারস্যে। কেউ কেউ মনে করেন, তিনিই সুফিবাদের জনক। রুমিকে ভালোবাসে দু’বার ইরান গিয়েছেন রবীন্দ্রনাথ। সুফি আধ্যাত্মিকতার পাশাপাশি বাউলদের সাধনা এবং গানেও তাঁর আগ্রহ ছিল।
‘বিশ্বপরিচয়’ পড়লে বোঝা যায়, বিজ্ঞানের প্রতি কবিগুরুর ছিল গভীর কৌতূহল। আইনস্টাইনের সঙ্গে তাঁর আলোচনার বিষয়ে আমরা সবাই জানি। কোয়ান্টাম মেকানিক্সকে মেনে নিতে অনিচ্ছুক ছিলেন কিংবদন্তি বিজ্ঞানী আইনস্টাইন। রবীন্দ্রনাথ কিন্তু খোলা মনে তা গ্রহণ করেন। এমনকি বিজ্ঞান নিয়ে প্রথাগত চর্চা ছাড়াই ‘পর্যবেক্ষণীয়’, ‘তরঙ্গ-কণা দ্বৈততা’-র মতো জটিল বিষয়ে চিন্তাভাবনা করতেন, মতামত রাখতেন। তিনি কখনই বিজ্ঞানকে গান-কবিতার থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখেননি। বরং, সামগ্রিক জ্ঞানচর্চার অংশ মনে করতেন।
রোদেনস্টাইন এবং রবীন্দ্রনাথ
আইনস্টাইনের সঙ্গে কথাবার্তায় রবীন্দ্রনাথ টেনে আনেন উপনিষদের প্রসঙ্গ। ‘সোহং’ অর্থাৎ জীবাত্মা এবং পরমাত্মার সমন্বয়। প্রকৃতির মধ্যে ছড়িয়ে রয়েছে আমিত্ব। ছোটো ছোটো দুর্বল প্রাণী আর উদ্ভিদেও সেই পরম চেতনার প্রকাশ। জীবনের অভিজ্ঞতা দিয়ে বিজ্ঞানকে আপন করেছেন রবীন্দ্রনাথ। একালের ‘ঈশ্বর কণা’ মতবাদের সঙ্গে খুঁজে পাওয়া যায় তাঁর বিজ্ঞানচিন্তার যোগসূত্র।
‘বিশ্বপরিচয়’ বইয়ের ভূমিকায় বিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথ বসুকে তিনি লিখছেন –
“শিক্ষা যারা আরম্ভ করেছে, গোড়া থেকেই বিজ্ঞানের ভাণ্ডারে না হোক, বিজ্ঞানের আঙিনায় তাদের প্রবেশ করা অত্যাবশ্যক। এই জায়গায় বিজ্ঞানের সেই প্রথমপরিচয় ঘটিয়ে দেবার কাজে সাহিত্যের সহায়তা স্বীকার করলে তাতে অগৌরব নেই। সেই দায়িত্ব নিয়েই আমি এ কাজ শুরু করেছি। কিন্তু এর জবাবদিহি একা কেবল সাহিত্যের কাছেই নয়, বিজ্ঞানের কাছেও বটে। তথ্যের যাথার্থ্যে এবং সেটাকে প্রকাশ করবার যাথাযথ্যে বিজ্ঞান অল্পমাত্রও স্খলন ক্ষমা করে না। অল্প সাধ্যসত্ত্বেও যথাসম্ভব সতর্ক হয়েছি। বস্তুত আমি কর্তব্যবোধে লিখেছি কিন্তু কর্তব্য কেবল ছাত্রের প্রতি নয় আমার নিজের প্রতিও। এই লেখার ভিতর দিয়ে আমার নিজেকেও শিক্ষা দিয়ে চলতে হয়েছে। এই ছাত্রমনোভাবের সাধনা হয়তো ছাত্রদের শিক্ষাসাধনার পক্ষে উপযোগী হতেও পারে।
আমার কৈফিয়তটা তোমার কাছে একটু বড়ো করেই বলতে হচ্ছে, তা হলেই এই লেখাটি সম্বন্ধে আমার মনস্তত্ত্ব তোমার কাছে স্পষ্ট হতে পারবে।
আরও পড়ুন: শিক্ষার সীমানা ছাড়িয়ে
বিশ্বজগৎ আপন অতিছোটোকে ঢাকা দিয়ে রাখল, অতিবড়োকে ছোটো করে দিল, কিংবা নেপথ্যে সরিয়ে ফেলল। মানুষের সহজ শক্তির কাঠামোর মধ্যে ধরতে পারে নিজের চেহারাটাকে এমনি করে সাজিয়ে আমাদের কাছে ধরল। কিন্তু মানুষ আর যাই হোক সহজ মানুষ নয়। মানুষ একমাত্র জীব যে আপনার সহজ বোধকেই সন্দেহ করেছে, প্রতিবাদ করেছে, হার মানাতে পারলেই খুশি হয়েছে। মানুষ সহজশক্তির সীমানা ছাড়াবার সাধনায় দূরকে করেছে নিকট, অদৃশ্যকে করেছে প্রত্যক্ষ দুর্বোধকে দিয়েছে ভাষা। প্রকাশলোকের অন্তরে আছে যে অপ্রকাশলোক, মানুষ সেই গহনে প্রবেশ করে বিশ্বব্যাপারের মূলরহস্য কেবলই অবারিত করছে। যে সাধনায় এটা সম্ভব হয়েছে তার সুযোগ ও শক্তি পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষেরই নেই। অথচ যারা এই সাধনার শক্তি ও দান থেকে একেবারেই বঞ্চিত হল তারা আধুনিক যুগের প্রত্যন্তদেশে একঘরে হয়ে রইল।…”
(সুশান্ত দত্তগুপ্তের ‘A random walk in Santiniketan Ashram’ এবং শান্তিনিকেতন বিষয়ক আরও নানা বই থেকে অনুপ্রাণিত)

