
রবীন্দ্রনাথের শিক্ষাদর্শন
রবীন্দ্রনাথ কেবল একজন নোবেলজয়ী সাহিত্যিকই নন, তাঁর চিন্তাধারা সব রকমের সংকীর্ণতাকে অতিক্রম করেছে। তিনি একজন দক্ষ সংগঠকও বটে। গোটা পৃথিবীই তাঁর বাসস্থান। ‘বিশ্বভারতী’ নামেও সেই বাঁধন ভাঙার ইশারা। ‘বিশ্ব’ এখানে প্রথাগত বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে ছড়িয়ে থাকা বিশাল জগৎ। রবি ঠাকুরের মতে এই প্রতিষ্ঠান শান্তিনিকেতন অথবা বীরভূম কিংবা বাংলার শুধু নয়, সারা পৃথিবীর শিক্ষাক্ষেত্র। তাই দুনিয়ার প্রান্ত থেকে শিক্ষার্থীরা এখানে আসেন, ক্যাম্পাসে থেকে পড়াশোনা এবং মতবিনিময় করেন।
কালো বাড়ি, শান্তিনিকেতন
সমগ্র মানবজাতির মুক্তি হবে শিক্ষায়, তাই কলা এবং বিজ্ঞানের সমন্বয় দরকার। একথা রবীন্দ্রনাথ বুঝেছিলেন, কারণ, তিনি ছিলেন একজন বিশ্বমানবতাবাদী। প্রাচীন কাল থেকে আমাদের ঐতিহ্যে মিশেছে চিন, পারস্য মতো নানা প্রাচ্য দেশের সংস্কৃতি। আর ভারতের নিজস্ব উত্তরাধিকার তো রয়েছেই। তারই সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ চেয়েছিলেন পশ্চিমি সভ্যতার সমন্বয় ঘটাতে। তাঁর প্রতিষ্ঠানের ‘ভারতী’ শব্দটি অনেক রকমের অর্থ বহন করে। একদিক থেকে তার মানে বিদ্যার দেবী সরস্বতী, অন্যদিকে বোঝায় ভারতবর্ষকে। বিশ্বভারতী এমন এক শিক্ষাঙ্গন, যেখানে পূর্ব এবং পশ্চিমের মিলন ঘটেছে।
মহাত্মা গান্ধি এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মৃত্যুর বছরখানেক আগে মহাত্মা গান্ধিকে চিঠি লিখে বিশ্বভারতীর জন্য সহায়তা চান রবীন্দ্রনাথ। ১৯৪০ সালের সেই চিঠিতে বলেন, “এই জাহাজে বোঝাই করা আছে আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ সম্পদ। আশা রাখি, এটিকে সংরক্ষণ করতে আমাদের দেশবাসী বিশেষ যত্ন নেবেন।” সেই দিনই গান্ধি উত্তর দেন, “আমার ওপর নির্ভর করতে পারেন আপনি। এই প্রতিষ্ঠানকে চিরস্থায়ী করে রাখতে সাধারণ মানুষের তরফ থেকে আমি উদ্যোগ নেব।” তিনি আরও লেখেন, “বিশ্বভারতী একই সঙ্গে জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান।”
রবীন্দ্রনাথ মনে করতেন, শিক্ষা হল মনের মুক্তি। তাই কেবল ব্ল্যাকবোর্ডে কলা এবং বিজ্ঞান পড়ানোয় তা সীমাবদ্ধ নয়। শিক্ষার্থীদের একাত্ম হতে হবে সংস্কৃতির মধ্যে, সঙ্গীত, চিত্রকলা, ভাস্কর্যের মতো সুকুমার বৃত্তিগুলির চর্চা করতে হবে। এভাবেই বিশ্বভারতী হয়ে ওঠে ‘প্রকৃত বিশ্ববিদ্যালয়’। এখনকার ইউনিভার্সিটি অফ লিবারেল আর্টস নামের প্রতিষ্ঠানগুলি চালু হওয়ার অনেক বছর আগেই রবীন্দ্রনাথ প্রয়োগ করেছেন তাঁর চিন্তাধারা। যেখানে স্নাতক স্তরের ছাত্রছাত্রীরা অবাধে ভাষাতত্ত্ব, কম্পিউটার, সংগীত, চিত্রকলা, পদার্থবিদ্যার মতো নানা পছন্দের বিষয় নিয়ে কোর্স করার সুযোগ পাবেন।
আরও পড়ুন: চিত্ত যেথা ভয়শূন্য
রবি ঠাকুরের শিক্ষানীতি অনন্য। গাছের শিকড়ের মতো প্রাথমিক স্কুল থেকে শুরু হয় শিক্ষা। কাণ্ড, ডালপালা দিয়ে বেড়ে ওঠে বিশ্ববিদ্যালয়ে। বিশ্বভারতীর ভিত্তি তাই পাঠভবন আর শিক্ষাসত্র। রবীন্দ্রনাথ নিজে পাঠভবনে ক্লাস নিতেন। সব থেকে সহজ উপায়ে সেখানে বিজ্ঞান শেখানো হয়। অমর্ত্য সেনের মতো বিশিষ্টজনেরা পড়েছেন সেই স্কুলে।
শান্তিনিকেতন গৃহ
শিক্ষাসত্রের যাত্রা শুরু হয়েছিল শিশুদের গ্রামে নিয়ে গিয়ে হাতে-কলমে শিক্ষা দেওয়ার জন্য। সুরুলের আশেপাশে গ্রামগুলিতে গিয়ে ছাত্রছাত্রীদের শেখানো হয় মাটির কাজ, তাঁত বোনা, গ্রামীণ জৈবপ্রযুক্তির মতো নানা বিষয়। রবীন্দ্রনাথ চাইতেন, এভাবেই তাঁর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছড়িয়ে পড়ুক চারদিকে। প্রথাগত সীমানা যেন না থাকে। গ্রামের শিশু এবং তরুণ-তরুণীদের সঙ্গে একাত্ম হয়ে গিয়েছে বিশ্বভারতী। ফুটে উঠেছে শিক্ষার সামগ্রিক রূপ।

