
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে বোধবুদ্ধির ধারণা পাল্টেছে
লেখিকা জয়া মিত্রের বন্দিজীবন নিয়ে লেখা ‘হন্যমান’ বইটা বা কিছুকাল আগে প্রয়াত মীনাক্ষী সেন এর খ্যাত বই ‘জেলের ভিতর জেল’ যারা পড়েছেন, তাঁরা জানেন অন্তত সত্তরের দশকে আমাদের জেলগুলিতে নন-ক্রিমিনাল পাগলদের কী ধরণের অমানবিক নিষ্ঠুরতার মধ্যে রাখা হত। একটা বড়ো ঘরে তাঁদের বিবস্ত্র অবস্থায় শেকল দিয়ে দেওয়ালের আংটায় বেঁধে রাখা থেকে থালাবাটির বদলে মাটিতে ছুড়ে ছুঁড়ে তাঁদের খাবার দেওয়ার রীতি ছিল। হতভাগ্য মানবীরা মাটি থেকে কুড়িয়ে বাড়িয়ে নাগালের বাইরে থাকা খাবারটুকু ছুঁতে পারতেন। খেতে পারতেন কি না জানি না, খাওয়া কাকে বলে তার একটা সাধারণ চিত্রকল্প আছে, এটা যে ঠিক তার সঙ্গে মেলে না, এটুকু অনুমান করা যায় । হয়তো বিগত চার দশকে তার কিছু পরিবর্তন হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে জেলখানায় এখন আর নন-ক্রিমিন্যাল লুন্যাটিকদের রাখা হয় না। জেলখানার নাম পালটে হয়েছে সংশোধনাগার। সেখানে কিছু কিছু সংস্কার এসেছে।
আলিপুর সেন্ট্রাল জেলের বন্দিদের দিয়ে ‘বাল্মীকি প্রতিভা’ অভিনয় করিয়ে শ্রীমতী অলকানন্দা রায় প্রায় একটা যুগান্তকারী কাজ করে ফেলেছেন। সম্প্রতি তিনি পশ্চিমবঙ্গ সরকারের লিলুয়া হোমের আবাসিকদের দিয়েও কিছু সাংস্কৃতিক প্রযোজনার কাজে হাত দিয়েছেন। আলিপুর জেলের কয়েদিদের নিয়ে শ্রীমতী রায়ের এই যুগান্তকারী কাজের প্রক্রিয়া তাঁর নিজের মুখে শোনার সুযোগ ঘটেছিল যখন আমি প্রায় চমকে উঠেছিলাম। তাঁর এই ব্যতিক্রমী কাজ নিয়ে বাংলায় চলচ্চিত্রও তৈরি হয়েছে।অন্যদিকে মানবাধিকার আন্দোলনের ধারাবাহিক প্রভাবে সাধারণ বন্দিরা কিছু কিছু অধিকারের স্বাদ পেয়েছেন। কিন্তু এগুলো নন-ক্রিমিন্যাল লুনাটিকদের জন্য তেমন ভাবে প্রযোজ্য কি না সেটা আমরা জানি না। তবে খুব বেশিদিন আগের কথা নয়, মনোরোগীদের জন্য নির্দিষ্ট সরকারি পাভলভ হাসপাতালে রোগী বিশেষত রোগিনীদের বিবস্ত্র করে রাখা হচ্ছে, এমন একটা প্রতিবেদন উঠে এসেছিল সংবাদমাধ্যমে। সেটা নিয়ে হইচই হতে হাসপাতালের কর্তাদের টনক নড়ে এবং ইদানীং বিধিব্যবস্থার কিছু পরিবর্তন হয়েছে বলে খবর পাওয়া যায়। বিশেষ করে একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা এটা নিয়ে সরকারের উঁচু মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করায় কাজ হয় খুব দ্রুত, সেই প্রতিষ্ঠান নিয়মিত নজরদারি রাখার কাজটাও তাঁরা করছেন। স্বজনহীন, রোগাক্রান্ত, প্রায় ভবিষ্যৎহীন এই মানব-মানবীদের প্রতি তাঁদের দায়বদ্ধতাকে আমরা কুর্ণিশ জানাতে পারি।
কিন্তু সমস্যা হল, হাতে গোনা কয়েকটা মনোরোগের চিকিৎসাকেন্দ্র ছাড়া আমাদের সমাজের বেশির ভাগ মনোরোগীরা আছেন আমাদেরই ঘরে, পরিবারে, পাড়ায়, আবাসনে। হালের ব্যক্তিপুঁজির অবাধ চলাচলে স্বাস্থ্যব্যবস্থা যখন প্রায় পর্যটন ব্যবস্থার মতোই ফুলে ফেঁপে উঠেছে, পরিষেবার নিরিখে পাল্লা দিয়ে একেকটি গগনচুম্বী হাসপাতাল গড়ে উঠছে সার দিয়ে এখানে ওখানে – একটু নজর করলেই দেখা যাবে এই বিনিয়োগের একটা নির্দিষ্ট ধরন আছে। হৃদয়বিদারক রোগে বা অস্থি-সংক্রান্ত সমস্যায় অথবা ক্যান্সার বা কিডনির চিকিৎসায় যে ধরনের বিপুল পুঁজি ও প্রযুক্তির নিবিড় বিনিয়োগ হয়েছে, বিজ্ঞাপন ও পরিষেবার প্রতিযোগিতায় তার একটা আভাস পাওয়া যায় সহজেই।অমুক হাসপাতালের প্যাকেজের সঙ্গে তমুক হাসপাতালের প্যাকেজের তুমুল প্রতিযোগিতা – কিন্তু তার সবকিছুর কেন্দ্রে কিছু বিশেষ অপারেশন বা দামি চিকিৎসা। তুলনায় মানসিক রোগের চিকিৎসার পরিকাঠামোয় বিনিয়োগের গতি বেশ শ্লথ ও দুর্বল। খোদ কলকাতা শহরে বা তার আশেপাশে যতগুলি ঝাঁ-চকচকে দামি বেসরকারি হাসপাতাল রয়েছে, তার বেশির ভাগেই মনোরোগীদের জন্য কোনও আলাদা ওয়ার্ড নেই। অন্তত যেখানে কিছু বাড়তি অর্থের বিনিময়ে একজন মনোরোগীর পরিবার তাঁদের অসুস্থ সদস্য/সদস্যাটিকে প্রয়োজনে রাখতে পারেন। এমন নয় যে, মনোরোগীদের জন্য কোনও সময়েই হাসপাতালে ভর্তি করে চিকিৎসার দরকার পড়ে না। ক্ষেত্র বিশেষে হয় বইকি , এবং কী এক আশ্চর্য সমীকরণে হৃদরোগে আক্রান্ত কোনও মানুষ ভর্তি থাকেন আইসিইউ বা আইটিইউতে আর মনোরোগীরা যদি বা পাকেচক্রে কোনও প্রতিষ্ঠানে ভর্তিও থাকেন, তখন তার দিব্যি নাম হয়ে যায় ‘পাগলা গারদ’। লুনাটিক অ্যাসাইলাম শব্দটার এই চালু বাংলা প্রতিশব্দটার বয়স অনেক, যার মধ্যে জড়ো হয়ে আছে শিহরিত হওয়ার মতো এক অবহেলার বোধ ও মননহীনতা। ‘গারদ’ শব্দটি যেন তার ট্রাজিক সাইনবোর্ড হয়ে জানান দিতে চায় মানসিক রোগে আক্রান্ত মানুষ মানেই ‘পাগল’ আর তাঁকে ‘গারদে’ পুরে রাখাটাই একটি সুসভ্য সমাজের পক্ষে শ্রেয়তর!
সন্দেহ নেই, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই বোধবুদ্ধির ধারণাটা আমাদের কিছুটা পাল্টেছে। পরিবারের কারোর এমন কোনও মানসিক সমস্যার প্রকোপে আমরা মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের কাছে যাওয়ার কথা ভাবি বা পরামর্শ দিই। মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে আইন প্রণয়ন হওয়ার পর সরকারিস্তরে মানসিক রোগের চিকিৎসার পরিসর বাড়ানোর একরকম দায় সরকারের ঘাড়ে পড়েছে। এই রাজ্যের সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় জেলাস্তরের হাসপাতালে সেই পরিষেবা পাওয়ার ব্যবস্থা হয়েছে, তার নিচের স্তরে অবশ্য এখনো সেই পরিকাঠামো গড়ে তোলা যায়নি। বেসরকারি হাসপাতাল বা পলিক্লিনিকে আজকাল আর পাঁচটা রোগের বিশেষজ্ঞর মতো মানসিক রোগের বিশেষজ্ঞ ডাক্তার বসেন, থাকেন মনোবিদরাও – অন্তত শহরে-মফসসলে এটা সাধারন প্রথা। কিন্তু রাস্তায় ঘাটে ভবঘুরে উন্মাদ দেখলে সচরাচর আমরা তাঁদের এড়িয়ে যাই, অথচ ট্রেনের কামরায় সদ্য-আলাপ-হওয়া সহযাত্রীর হৃদরোগের কাহিনি শুনে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে চেনা ডাক্তারের নাম বাতলাই, কলকাতার থেকে চেন্নাই গেলে উন্নততর চিকিৎসা তিনি পেতে পারেন, এই কথা জানাতে ভুলি না। অথচ তথ্য বলছে, এই মুহূর্তে আমাদের চারপাশে যত মনোরোগী আছেন, তাঁরা রয়েছেন পরিবারের মধ্যেই বেশি। আর, এই কথাও সর্বজনবিদিত যে মানসিক রোগের নিরাময়ের ক্ষেত্রে পরিবার পরিজন তথা সামাজিক পরিবেশের একটা বড় ভূমিকা আছে।
কিন্তু এই সত্যিটা মাথায় রাখলেও অন্য একটা বিষয় আমাদের ভাবিয়ে তোলে। সেটা হল, একজন পরিবারের সদস্যের যে মনোরোগ হয়েছে তা বাকি সদস্যেরা বুঝবেন কী করে? এই প্রশ্নের জবাবে একদল সহজেই বলে দিতে পারেন, রোগ নির্ণয় তো প্রশিক্ষিত ডাক্তারের কাজ, সে কাজ অন্যেরা করবেন কী করে? আর কেনই বা করবেন? সংগত কথা, সন্দেহ নেই। কিন্তু এই প্রশ্ন যারা উচ্চকিতভাবে তুলবেন, তাঁদের মনে করিয়ে দিতে হবে, একটা কথা, একদা যা মজা করে লিখেছিলেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। তিনি বলেছিলেন, পৃথিবীতে একটা বিষয় সকলেই কিছু না কিছু জানে, সেটা ডাক্তারি। যে কোনও অসুস্থতার খবরে কোনও না কোনও মন্তব্য বা পরামর্শ আমরা নিজেরাও শুনি, কখনও নিজেরাও হয়তো উপযাচক হয়ে অন্যকে পরামর্শ দিই। কিন্তু মানসিক রোগের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি আমরা কক্ষনও নিই না। ঐতিহাসিকভাবে এই প্রবণতাকে নিশ্চয়ই ব্যাখ্যা করা যায়। চিকিৎসাশাস্ত্রের ইতিহাসে শারীরিক আধি-ব্যাধি ও তার প্রতিকার নিয়ে চর্চা যত প্রাচীন, মানসিক রোগ নিয়ে বিজ্ঞানভিত্তিক চর্চা ও নিরীক্ষণ তার অনেক পরের বিষয়। এমনকি একটা সময় পর্যন্ত মানসিক রোগের চিকিৎসাকে পূর্ণভাবে চিকিৎসা শাস্ত্রের মর্যাদাই দেওয়া হত না, শারীরিক অসুস্থতার সঙ্গে যে মনের অসুস্থতার কোনও নিবিড় যোগাযোগ থাকা সম্ভব, তার কোনও স্বীকৃতিই ছিল না, ধারনা ছিল না মানসিক স্বাস্থ্যের। এই বিচারবোধের কেন্দ্রে ছিল মন বিষয়টাকে একটা বিমূর্ত ধারনা হিসেবে দেখা, কারণ শরীরের প্রতিটি প্রত্যঙ্গ দেখা যায় কিন্তু মন দেখা যায় না, তাকে ছোঁয়া যায় না, যন্ত্র দিয়ে পরীক্ষা করা যায় না।
যাই হোক, সেইসব আদিম ধ্যানধারণার খোলস ছেড়ে এখন সারা পৃথিবীতেই মনোরোগের ও তার চিকিৎসা নিয়ে চর্চা ও গবেষণা বিপুলভাবে বিকশিত। বিশেষত, স্নায়ুমনোবিদ্যার উৎকর্ষ আমাদের অনেক মানসিক অসুস্থতাকেই চিহ্নিত ও নিরাময় করতে সক্ষম, অনেক রকমের মানসিক বিকলন চিহ্নিত হয়েছে তারই সূত্রে। অনেক কার্যকরী ওষুধ আবিষ্কার হয়েছে, তার সার্থক প্রয়োগে অনেক মানুষ রোগমুক্ত হচ্ছেন, চালু হয়েছে নানা রকমের থেরাপি। জাতীয় স্তরে বেঙ্গালুরুর মানসিক স্বাস্থ্য সংক্রান্ত জাতীয় প্রতিষ্ঠানটি ডিমড বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদা পেয়েছে। কিন্তু এত কিছুর পরেও মানসিক রোগী মানে সাধারণ ধারণায় শুধুই পাগল, আর কিছু নেই অনুষঙ্গে, এবং মানসিক রোগের চিকিৎসক মানেই পাগলের ডাক্তার! কেন এমন হল?
(চলবে)
