
প্রথমে ১০ কিমি, তারপর হাফ ম্যারাথন। মাথায় অন্য স্বপ্ন…
প্রথম পর্ব
২০১৭-এর জুন মাসে হিমাচল প্রদেশে একটা এক্সপিডিশনে গিয়েছিলাম। লাহুল স্পিতি জেলার মাউন্ট মেন্থসা নামে এক শৃঙ্গ ছোঁয়ার উদ্দেশ্যে। এসব অবশ্য নতুন কিছু নয়, সেই অতীশ দীপঙ্করের সময় থেকেই বাঙালি হিমালয় অভিযানে অভ্যস্ত। রোপ ফিক্স করে, একের পর এক ক্যাম্প স্থাপন করতে করতে যখন আমরা শৃঙ্গের প্রায় কাছে পৌঁছে গিয়েছি, বাধ সাঁধলো প্রকৃতি। তীব্র তুষারপাত আর ঝড়ের মধ্যে কোনওক্রমে বেসক্যাম্পে ফিরে দুদিন অপেক্ষা করেও যখন আবহাওয়া উন্নতির কোনো লক্ষণ দেখা গেল না, বাধ্য হয়েই এক্সপিডিশনের সমাপ্তি ঘোষণা করা হল।
ক্যাম্পের শেষ রাতকে বলা হয় 'ক্যাম্প ফায়ার'। এক্সপিডিশন শেষ করতে না পারার মনখারাপ নিয়েই সবাই মিলে বসলাম আড্ডা মারতে। পূর্ণিমার চাঁদ ততক্ষণে খানিক মেঘের আড়াল থেকে উঁকি মারছে। তার রুপোলি আলোয় হঠাৎ ঝলমল করে উঠল সামনের মাউন্ট মেন্থসা। সেই সুন্দরী রহস্যময়ীর হাতছানি উপেক্ষা করার শক্তি যেন কারও ছিলনা।
কেমন একটা নেশা লেগে গেল। মনে মনে ভাবলাম, সেই রাতেই সোজা শৃঙ্গে উঠে যাই। সকালের মধ্যেই শৃঙ্গ ছুঁয়ে ফের নেমে আসব। কিন্তু, সেটা কি সত্যিই সম্ভব? একদৌড়ে প্রায় ৩০০০ মিটার ওঠা? যে উচ্চতা ভাঙতে আমাদের প্রায় পাঁচদিন সময় লেগেছে, সেটা মাত্র পাচঘন্টায় ওঠা? আমি নিজে কি এর জন্য সামান্যও প্রস্তুত শারীরিকভাবে?
কিন্তু ঘোড় লেগে গেছে তদ্দিনে। চ্যালেঞ্জটা তাই নিয়েই ফেললাম। শুরু হল এক লম্বা প্রস্তুতির।
২০১৪-তে হিমালয়ে এরকম এক এক্সপিডিশনেই পায়ের লিগামেন্ট গুরুতর জখম হয়েছিল। তারপর প্রায় ২ বছর এক্সারসাইজের বাইরে থেকেছি। সেই অর্থে আমি কখনও এথলিট ছিলামও না। পড়াশোনার জগতেই থেকেছি, মাঝেমধ্যে ট্রেকিং করেছি, এক্সপিডিশনে গিয়েছি। বর্তমানে অধ্যাপনার সঙ্গে যুক্ত। আর পাঁচটা ভেতো, শিক্ষিত, চাকুরিজীবী বাঙালিই বলা চলে। শুধু পাহাড়ের ভূতটা চেপে বসেছিল মাথায়। সেই থেকেই এক্সপিডিশন। আর, তারপর ভূত চাপল দৌড়ে পাহাড়ে চড়ার।
প্রস্তুতিবিহীন কোনও জেদকেই পাহাড় কখনও প্রশ্রয় দেয় না। তাই ঠিক করলাম নিজেকে গড়েপিটে নেওয়া শুরু করব একদম শূন্য থেকে। পায়ে জোর বাড়াতে হবে, দম বাড়াতে হবে, তাই লম্বা দৌড়নো শুরু করলাম। ঠিক কতটা লম্বা? প্রথমে নিয়মিত ৪-৫ কিমি দৌড়োতাম। তারপর একদিন সাহস করে ১০ কিমির জন্য বেরোলাম। আমি প্র্যাক্টিসের জন্য রাস্তাগুলো এমনভাবেই বেছে নিতাম, যাতে দৌড় শেষ না করলে গন্তব্যে পৌঁছানোর জন্য আর অন্য কোনো উপায় না থাকে। এক একটি দৌড় যেন এক একটি অভিযান।
১০ কিমি! সাইকেলেও কখনও এতটা রাস্তা একবারে যাওয়ার সাহস দেখাইনি, আর দৌড়ে যাব! শুরু করার পরে খুব কষ্ট হচ্ছিল, মনে হচ্ছিল এই লম্বা দৌড় আমার জন্যে নয়। স্কুল জীবনে কয়েকবার ১০০ মিটারে নেমেছিলাম, সবার শেষে বরাবর শেষ করেছি। পারব না পারব না করতে করতেই ১০ কিমি শেষ করে ফেললাম। সময় লেগেছিল পাক্কা ১ ঘন্টা! মায়ের কাছে ফিরে একটা যুদ্ধজয়ের হাসি হেসেছিলাম।
আরও পড়ুন
পায়ে-পায়ে পেডং
তারপর থেকে প্রতি সপ্তাহান্তেই একবার করে ১০কিমি দৌড়তে বেরোতাম। আর নিজেকে বলতাম, এটা সবে শুরু। পরের ধাপগুলো কঠিন হতেই হবে আরও। প্রথমে হাফ ম্যারাথন, পরে ম্যারাথন। তারপর সমতল পেরিয়ে পাহাড়ে দৌড়। এবং তারওপরে এক দৌড়ে পাহাড়চুড়োয়…
আমার বাড়ি তমলুকে, পূর্ব মেদিনীপুরের জেলাসদর। একটি আদ্যোপান্ত মফস্বল। এখানেও একটা ২১কিমি লম্বা হাফ ম্যারাথন অনুষ্ঠিত হয় প্রতিবছর। প্রথম ১০ কিমি দৌড়োনোর মাস দেড়েকের মধ্যেই চলে আসে সেই ২১ কিমির ইভেন্ট। ছোটবেলা থেকেই দেখে এসেছি এই হাফ ম্যারাথন। রোগা লিকলিকে চেহারার সব দৌড়বিদদের মাঝে নিজেকে কখনও কল্পনাতেও ঠাঁই দিইনি। কিন্তু জীবনের আশ্চর্য মজা বা পরিহাস, সেই ২১ কিমির ইভেন্টেই আমি শেষে নামলাম। আশেপাশের অভিজ্ঞ দৌড়বিদদের মাঝে নিজেকে সত্যিই বেমানান লাগছিল।

খুব আস্তেই শুরু করেছিলাম প্রথমে। লক্ষ্য ছিল স্রেফ শেষ করা। প্রথম ৫ কিমি প্রায় সবার শেষের দিকে ছিলাম। তারপর সাহস নিয়ে একটু একটু করে গতি বাড়াতেই একের পর প্রতিযোগীকে পেরতে শুরু করলাম। তবে শেষ ২ কিমিতে রীতিমতো হাত পা কাঁপতে শুরু করেছিল, মাথা ঘুরতে শুরু করেছিল। তবু শেষ করলাম কোনওক্রমে জীবনের প্রথম হাফ ম্যারাথন। সময় লেগেছিল ২ ঘন্টা ৫ মিনিট। পাশে বাবা স্কুটি নিয়ে ক্রমাগত জল আর খাবার দিতে দিতে গেছিল।
২১ কিমি হাফ ম্যারাথনেই এই অবস্থা। এরপর আর ৪২ কিমি ফুল ম্যারাথনের কথা ভাবতেই পারছিলাম না। কিন্তু, ওই নেশাটা তখনও ছাড়েনি আমায়। সাদা বরফচুড়োর একটা নেশাধরানো হাতছানি। এক দৌড়ে ওঠার ডাক…
(ক্রমশ…)
