
পাইরেসি হয়ে উঠেছে এক লাভজনক ব্যবসা
‘পাইরেসি’ শব্দটির সঙ্গে আমরা অতপ্রতভাবে জড়িত। যদিও ব্যুৎপত্তিগত অর্থ হিসেবে পাইরেসি কথাটার আভিধানিক অর্থ ‘সমুদ্র ডাকাত’। খুব সাধারণভাবে তথ্য ঘাঁটলে দেখা যায় এটি গ্রীক শব্দ ‘Peirātes’ (আক্রমণকারী) থেকে ল্যাটিন ‘Pirata’ হয়ে আধুনিক ইংরেজি ও বাংলা ভাষায় এসেছে, যা আগেকার সমুদ্রে ডাকাতি বা অবৈধভাবে মালপত্র লুঠ করাকে বোঝাতো। আজকের দিনে দাঁড়িয়ে এটির অর্থ একটু অন্যরকম। বস্তুত শিল্প, সাহিত্য এমনকী সংস্কৃতির যে কোনও বিষয়ের অনুকরণ না হয়ে পুরোপুরি প্রতিলিপি তৈরি করে অসংখ্য সংখ্যায় জনসমাজে বা বৃহত্তর জনগণের হাতে সুলভে পৌঁছে দেওয়ার পদ্ধতি। আমরা সচারচর দেখি সিনেমা অথবা পাঠ্যপুস্তক এই দুটি ক্ষেত্রে মারাত্মকভাবে পাইরেসি বিষয়টির গুরুত্ব বেড়েছে দিনের পর দিন। একটু অন্যভাবে যদি বলি তাহলে দেখব মূল ধারার যেকোনো উৎকৃষ্ট মানের সাহিত্য ও শিল্পকে বাণিজ্যিক মুনাফা লাভের জন্য রাষ্ট্র অথবা অর্থনৈতিক পরিকাঠামোয় নিয়ন্ত্রিত কোনও প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি সেটিকে বিপুল পরিমাণে সহজলভ্য করে ক্রেতার (এক্ষেত্রে শিল্পের ক্ষেত্র হলে কোনও শিল্পমনস্ক গুণগ্রাহী ব্যক্তি। অথবা সাহিত্য হলে তা যদি পুস্তক জাতীয় কিছু হয়ে থাকে, তাহলে সেটিকে হুবহু নকল অসংখ্য পাঠকের) হাতে ছড়িয়ে দেওয়া।
একটি পরিসংখ্যান থেকে জানা যায় ভারতে বইয়ের পাইরেসি বেশ বেশি, হিসেব করলে প্রায় পাঁচ হাজার থেকে সাত হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ এই বিপুল অর্থমূল্যের বই পাইরেটেড হচ্ছে এবং এই পাইরেটেড বইয়ের বিরাট অংশের পাঠকের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে।
আজকের দিনে দাঁড়িয়ে সোশাল মিডিয়া যেহেতু মারাত্মকভাবে সচল, সেহেতু এই পাইরেসি কন্ট্রোল করাটা খুবই কঠিন। বর্তমানে বিভিন্ন সোশাল মিডিয়া গ্রুপ যেগুলো মূলত পুরনো বইয়ের পিডিএফ সরবরাহ করার জন্যই তৈরি হয়েছে। এবং সেই সমস্ত মিডিয়া গ্রুপগুলির প্রত্যেকটিতেই রয়েছে নির্দিষ্ট গ্রুপ এডমিন। অথচ তবুও নির্ভাবনায় ও অনায়াসেই বহু বইয়ের পিডিএফ শেয়ার করা হয় এই গ্রুপগুলিতে, এই উদ্দেশ্যে যে এই গ্রুপের সমস্ত মেম্বার বা ফলোয়াররা সহজলভ্যে ডাউনলোড করে পিডিএফটি নিজের সংগ্রহে রাখতে পারবে। কিন্তু বাস্তবে যা দেখা যায় তা অনেকাংশে সম্পূর্ণ বিপরীত। বিভিন্ন উপায়ে বাজার চলতি বইগুলিরও পিডিএফ অনায়াসে সোশাল মিডিয়ায় ঘোরাফেরা করতে দেখা যায়। এই নিয়ে অনেক আলোচনা- সমালোচনা- তর্কবিতর্ক সবই করা যেতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এর কারণ কী? উৎসই বা কী? ঠিক কি ধরনের ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান এই ধরনের কাজগুলি করে থাকে? এগুলো নিয়ে খুব সহজে একক মত প্রয়াস কখনোই সম্ভব নয়। এর মূলে রয়েছে খুব অল্প সময়ের মধ্যে বিরাট বাজার দখল করে নেওয়ার প্রবৃত্তি। সাধারণত দেখা যায় কোনও বৃহৎ প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান তাদের প্রকাশিত বইয়ের মধ্য দিয়ে বাংলা এমনকী ভারত সহ পার্শ্ববর্তী দেশ বাংলাদেশেও বিরাট পাঠক তৈরি করতে পেরেছে। সেক্ষেত্রে সুবিধাবাদী ও মুনাফালোভী ব্যবসাদার কিন্তু সেই বইটিকে হুবহু নকল করে হাজার হাজার কপি অনায়াসেই খোলা বাজারে বিক্রি করতে পারে। এবং এখান থেকেই তার মোটা টাকা মুনাফা লাভ হচ্ছে।
আরও পড়ুন: গবেষণার ধাঁচ এভাবে বদলে ফেলা দরকার
আমাদের কলকাতার বাজারের দিকে তাকালে দেখতে পাওয়া যাবে এই পাইরেসি খুব একটা প্রভাব ফেলেনি। বিপরীতে এর প্রভাব মারাত্মকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে বাংলাদেশে। প্রকাশনার সঙ্গে যুক্ত সব প্রকাশকদেরই এ নিয়ে বিরাট ক্ষোভ রয়েছে, কিন্তু সেই ক্ষোভের কোনও সমাধান সূত্র এখনো পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়িত করা যায়নি। কারণ বাংলা প্রকাশনায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিকারক দিক হলো প্রকাশকদের একাত্মতার অভাব। একটি বই প্রকাশের মুহূর্তের মধ্যেই সেটি ডিজিটাল প্লাটফর্মে পিডিএফ হয়ে পাঠকের বা ক্রেতার হাতে হাতে খুব সহজেই স্মার্টফোনের দৌলতে পৌঁছে যাচ্ছে। আবার কোনও বইয়ের হুবহু প্রতিলিপি তৈরি হয়ে সেলার মারফত বইটি হাজার হাজার কপি অনায়াসেই বিক্রি হচ্ছে। এর প্রত্যক্ষ কারণ যেমন রয়েছে পরোক্ষ কারণও রয়েছে বেশ কিছু। আমাদের কলকাতার বিভিন্ন প্রকাশকদের বক্তব্যগুলি যদি একটু এই আলোচনার মধ্যে নিয়ে আসি তাহলে খুব সহজেই বুঝতে পারা যাবে এই পাইরেসিকে রুখে দেবার জন্য প্রত্যেকের সমবেত বিরাট প্রচেষ্টা রয়েছে, কিন্তু অযাচিতভাবেই তারা প্রত্যেকেই নিরুপায়। আরো একটা বিষয়, একটি বই যখন সোশাল মিডিয়া বা অন্যান্য প্ল্যাটফর্মে পাতার পর পাতা বিনামূল্যে পাঠকদের বিতরণ করা হচ্ছে, তখন কোনও প্রকাশককেই অন্য একটি প্রকাশকের বই পাইরেসিকে তৎক্ষণাৎ রুখে দিতে বা কোন আইনি ব্যবস্থা নিতে দেখা যায় না। এ নিয়ে প্রকাশকদের মধ্যেও দ্বিমত রয়েছে।
কোনও কোনও প্রকাশকদের বক্তব্য, বর্তমান সোশাল মিডিয়ার যুগে মানুষ পিডিএফ বই পড়তে বেশি উৎসাহী হয়ে পড়ছে। যার ফলে বেশ কিছু বই যা অন্তত বছর পাঁচেক প্রকাশ হয়নি সেই বইয়ের পিডিএফ বৃহত্তর পাঠক সমাজে ছড়িয়ে পড়তেই পারে, এবং ছড়িয়ে পড়লেও তার বিরাট আইনি বিধি জটিলতা না থাকাই শ্রেয়। আরো একদল প্রকাশকের বক্তব্য, যে বইটি দীর্ঘদিন ধরে প্রকাশের সম্ভাবনা থেকে অনেকটা দূরে থেকেছে, এবং এই দূরে থাকার সময় বইটির বিরাট একটি পাঠক চাহিদা তৈরি হয়েছে, অথচ আজকের আর্থসামাজিক পরিস্থিতির কথা ভেবে কোনও প্রকাশক হয়তো সেভাবে বইটিকে গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ করতে সাহস পাচ্ছে না। সেক্ষেত্রে অন্তত পাঠক চাহিদা পূরণের জন্য দু-একটা বইয়ের পিডিএফ সোশাল মিডিয়ার হাওয়া বাতাসে জল পেলে, তাতে কোনও ক্ষতি নেই। একটি পরিসংখ্যান থেকে জানা যায় ভারতে বইয়ের পাইরেসি বেশ বেশি, হিসেব করলে প্রায় পাঁচ হাজার থেকে সাত হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ এই বিপুল অর্থমূল্যের বই পাইরেটেড হচ্ছে এবং এই পাইরেটেড বইয়ের বিরাট অংশের পাঠকের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে।
কিন্তু এক্ষেত্রে ভাববার বিষয়, পাইরেটেড বই যত বেশি পরিমাণ বিক্রিজাত হয়ে উঠবে ততই একটি বিশেষ শ্রেণীর প্রকাশন বিভাগ এর মুনাফা অর্জন করতে করতে এগিয়ে যাবে। তবে শুধু যে সাহিত্য অর্থাৎ মূল ধারার বই পাইরেট হয়েছে তা নয়, আরও একটি তথ্যসূত্র থেকে জানা যায় – পাঠ্যপুস্তকের পাইরেসি ভারতে ব্যাপক। ২০২৪ সাল থেকে ভারত জুড়ে ৪.৭ লক্ষেরও বেশি জাল NCERT বই বাজেয়াপ্ত হয়েছে। দিল্লি পুলিশ ২০২৫ সালের মে মাসে ২.৪ কোটি টাকা মূল্যের ১.৭ লক্ষেরও বেশি পাইরেটেড NCERT বই উদ্ধার করেছে। সুতরাং আগামী দিনে প্রকাশনার আকাশে ঘন কালো মেঘের ঘনঘটা, তা জোর দিয়ে বলাই যায়।
পাইরেসি মূলত খুব ছোটো প্রকাশনা সংস্থা থেকে শুরু করে শুধুমাত্র বুকসেলার এই কাজগুলো করে থাকেন। সচরাচর এই প্রকাশনা বাজারে টিকে থাকতে গেলে ঝট করে কোনও মাঝারি বা বড়ো প্রকাশক ‘পাইরেটেড’ শব্দটা নিয়ে খুব একটা মাথা ঘামাবে না, যতটা ঘামাবে একজন ছোটো বুক সেলার।
এখন আমাদের প্রশ্ন এই পাইরেসি কারণ কী? – এ প্রশ্নের উত্তর দিতে গেলে বেশ কিছু স্বাভাবিক বাস্তবতার ছবি আমাদের প্রত্যেকের কাছেই পরিষ্কার হয়ে ওঠে। করোনা পরবর্তী বাংলা প্রকাশনা জগতের আমূল পরিবর্তন হয়েছে। উন্নত মানের সফটওয়্যার যা খুব সহজেই একজন সবল সুস্থ ও কর্মঠ প্রকাশকের বার্ষিক ব্যবসায়িক আয়কে অনেকাংশে নামিয়ে দিয়েছে নিচের সারিতে। যদিও এক্ষেত্রে আমাদের বাংলা অর্থাৎ কলকাতার বৃহত্তর প্রকাশনার সঙ্গে যুক্ত প্রকাশক এবং বুক সেলার প্রত্যেকেই বিষয়টি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল। কিন্তু যখনই তাদের কাছে প্রশ্ন করা হয় তখনই অদ্ভুতভাবে উত্তর আসে, এই বিরাট পাইরেসি রুখতে যে পরিমাণ অর্থ ব্যয়ে আইনি সহযোগিতা বা আইনের পথ ধরতে হবে, সেদিকে পা না বাড়ানোই ভালো। উল্টে যদি সেই পাইরেটেড সংস্থা বা ব্যক্তির সঙ্গে যদি আলোচনা সাপেক্ষে আর্থিক ক্ষতিপূরণ দাবি করে নেওয়া যায়, বাজারের এই অকাল সময়ে খুব সহজেই বেশ কিছু পুঁজি চটজলদি হাতে চলে আসে। সম্প্রতি বেশকিছু প্রকাশক তাদের বক্তব্য অনুযায়ী যেমন বলছেন, ‘বই পাইরেসি কোনও ভাবেই আটকানো যাবে না। কারণ এই পাইরেসি আটকে দেওয়ার জন্য যে আইনি পদক্ষেপ রয়েছে, তা পালন করতে গিয়েই সারা বছরের ব্যবসা তলানিতে গিয়ে ঠেকবে। তখন পাইরেটেড সংস্থার বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নিয়ে মামলা চালাতে গেলে সর্বশান্ত হতে হবে।’ অন্য প্রকাশকের বক্তব্য, আমাদের প্রকাশনার বই যদি পাইরেটেড হয়, এবং আমরা যদি জানতে পারি, তাহলে ওই ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেব। আবার আরো এক প্রকাশনার প্রকাশকের কাছ থেকে জানা যায়, প্রত্যক্ষ পাইরেটেড কপি আমাদের প্রকাশনাকে ক্ষতি করলেও, নেগেটিভ পাবলিসিটির মধ্যে দিয়ে আমাদের সেই প্রোডাক্টটির বাজারজাত চাহিদা পরোক্ষভাবে অনেকটা বেড়ে যাবে।’
সম্প্রতি বাংলা বইয়ের বাজারে মূলত সাহিত্যের বইয়ের বাজার অনেকটা পড়েছে। প্রকাশনা ও প্রকাশকদের মূল লাভ কিন্তু একটি বইকে প্রকাশ করার পর তার সঠিক বাণিজ্যিকিকরণের মাধ্যমে পাঠকের কাছে উপযুক্ত মূল্যে বইটি পৌঁছানো। কিন্তু বর্তমানে কলকাতা বাজার ছেড়ে দিলেও পার্শ্ববর্তী বাংলাদেশে বিরাট সংখ্যক একটি চক্র সর্বদাই সক্রিয়। কলকাতার বিভিন্ন প্রকাশনার খুব মূল্যবান বই যা চলতি বাজারে কয়েক লক্ষ টাকা পর্যন্ত প্রকাশককে মুনাফা লাভ তুলে দিতে পারে। দুর্ভাগ্য সেই সমস্ত বই অনায়াসেই চোখের নিমিষে সবার অলক্ষে পাইরেটেড কপি হয়ে হাজার হাজার কপি বিক্রি হচ্ছে বাজারে। বিভিন্ন প্রকাশনা সংস্থা এমনকী ওপার বাংলাদেশ থেকেও বিভিন্ন প্রকাশক সংস্থার মাধ্যমে জানতে পারা যায়, এই পাইরেসি মূলত খুব ছোটো প্রকাশনা সংস্থা থেকে শুরু করে শুধুমাত্র বুকসেলার এই কাজগুলো করে থাকেন। সচরাচর এই প্রকাশনা বাজারে টিকে থাকতে গেলে ঝট করে কোনও মাঝারি বা বড়ো প্রকাশক ‘পাইরেটেড’ শব্দটা নিয়ে খুব একটা মাথা ঘামাবে না, যতটা ঘামাবে একজন ছোটো বুক সেলার।
পরিশেষে একটি মানবিক কথা। ধরুন বাংলায় থাকা প্রকাশকদের আজকের বাজারে দাঁড়িয়ে বই বিক্রির মুদ্রণ সংখ্যা একশোরও নিচে নেমে এসেছে। সেক্ষেত্রে পাইরেটেড কপি এই বিষয়টি কোথাও যেন ইউটোফিয়ার মতো ঘাঁটি গড়ছে। পরোক্ষ ভাবে পাইরেটেড কপি সেলার বা বিক্রেতাকে আয়ত্তে এনে, অনায়াসেই দুটি ব্যক্তি অথবা দুটি সংস্থার মধ্যে মৌ চুক্তি স্বাক্ষর হয়ে যাচ্ছে। তবুও সাহিত্যচর্চায় একনিষ্ঠ প্রকাশকদের একটাই চাহিদা পাইরেটেড যত কম হবে তত অফলাইনের বইয়ের বাজার বৃদ্ধি পাবে। দিনের শেষে প্রকাশকদের রুটি রোজগার বাড়বে।