হেরিটেজ ট্যাগ ক্ষয়ে যাচ্ছে, শ্যাওলা জমছে বাঙালির আত্মগরিমার পাঁচিলে

বিশ্ব ঐতিহ্য দিবস

খানে একটা বাড়ি ছিল। যে বাড়িতে রেওয়াজ করতেন বিসমিল্লা খাঁ। ছিল—অর্থ হয়, এই মুহূর্তে আর নেই। ভেঙে ধুলো হয়েছে। রাষ্ট্রের মদতে। বারাণসীতে, সেই বাড়িটির পরিবর্তে, আপনি দেখতে পাবেন, ঝাঁ চকচকে কমার্শিয়াল কমপ্লেক্স! যেখানে সানাইয়ের সুর নেই। সুর, আসলে যা স্মৃতির অংশ, সংরক্ষণের বোধ নেই। ইতিহাসের বালাই নেই। এভাবেই আমরা দেউলিয়া হয়েছি, হে পাঠক। রক্তমাংসের ভেতর ভেতর। নিরালম্ব এবং বায়ুভূত। ঋত্বিক ঘটকের রাজশাহীর বাড়ির কথা মনে পড়ে? আশৈশব কাটিয়েছিলেন যেখানে? সেই বাড়ি বর্তমানে ধ্বংসস্তূপ। ‘ছিল’ হয়েছে চিরতরে। ভাঙা পাঁচিল। শ্যাওলা। অনন্ত ভয়েড!

সংরক্ষণের যে বোধের কথা লিখেছিলাম, তা বোধহয় জারিত হয়নি আমাদের মস্তিষ্কে। অথচ, গ্রিস। ইতালি। স্পেন। ফ্রান্স। এহেন প্রথম বিশ্বের বহু দেশ, আগলে রেখেছে আপন ইতিহাস। যেমন, আয়ারল্যান্ডের ডাবলিন শহর।

সহজ সত্য হল, শিকড়ের প্রতি উদাসীনতা। হতে পারে, সংরক্ষণে আমরা অপারগ। তাচ্ছিল্যই শিখেছি। অথবা, যত সময় এগিয়েছে, পুঁজির কাছে হেরে গেছি গো-হারা। কখনও-বা একখানা ইরেজার দিয়ে মুছে ফেলেছি নিজেদের অতীত। ঠিক সেভাবেই, রাষ্ট্রও ভেবেছে, মুছে দেবে আমাদের যাবতীয় হেরিটেজ। তারপর, যেন লড়িয়ে দেবে সহোদরের সঙ্গেই।

কিন্তু ‘হেরিটেজ’ আসলে কী? কেমন সেই ধারণা? ধরা যাক, প্রাচীন এক রাজবাড়ি। এক পা, দু-পা করে রোমাঞ্চ। কিংবা স্মৃতিসৌধ। তাজমহলের মতো। অনাদিকালের কোনও মন্দির, মসজিদ অথবা গির্জা। হতে পারে, সমগ্র শান্তিনিকেতন। প্রত্যেকেই যেন ধারণ করে আছে একেকটা সময়গ্রন্থি। শিল্পের ম্যাজিক। আশ্চর্য স্থাপত্যকীর্তি। কতশত প্রাজ্ঞজনের দীর্ঘ যাতায়াত। এবং, আস্ত একটা জাতির ঐতিহ্য। আইডেন্টিটি। শুধুই কী তাই? হেরিটেজ যেমন হতে পারে, মায়াবী সুন্দরবন। বাঘ। মধু। লুপ্তপ্রায় অসংখ্য পতঙ্গ আর সাপ। অর্থাৎ, বাস্তুতান্ত্রিকভাবে যে অঞ্চলে ইতিহাসের একটা খরস্রোত বইছে। অথবা এত আহামরি কিচ্ছুটি নয়, হেরিটেজ কেবলমাত্র একটি মানুষের ব্যবহৃত ঘড়ি, কলম অথবা লেখার টেবিল। সেই সামান্যের ভেতরেই, অতীতের সঙ্গে নিরন্তর কথোপকথন। এবং ভবিষ্যতের ভিত গেঁথে রাখার প্রক্রিয়া।

ভিত কিংবা ভিত্তি—শব্দটি গুরুত্বপূর্ণ। উত্তরাধিকার সূত্রে, ট্রাঙ্ক ভর্তি দুষ্প্রাপ্য বই পেয়েছিল কেউ। ঐতিহাসিক মূল্য এবং অর্থমূল্য—উভয়ই চরম। সেই সমস্ত বই আসলে আত্মানুসন্ধানের পথগুলো খুলে দেয়। কতটা মানুষ হতে পেরেছি অ্যাদ্দিনে, জাতি হিসেবে বাঙালি উৎকর্ষতার গ্রাফ কত নিচে নামল, এই একুশ শতকে ধার্মিক হলাম কতখানি—তারই একধরনের খতিয়ান হিসেবে দাঁড়িয়ে থেকেছে বইগুলো। যখন ভিত্তিপ্রস্তর ফাঁপা, ঠুনকো আর মলিন হয়ে যায়, মনে হয় বইগুলো বিক্রি করে দিই। তেমন করেই, বাড়িগুলো। ম্যানগ্রোভ গাছগুলো। বিসমিল্লার সানাইগুলো। মূল্যবোধ এবং উন্মুক্ত অনুসন্ধিৎসু আগ্রহী মন—ক্ষীণ হতে হতে তিরিশ সেকেন্ডের ইন্সটাগ্রাম রিলে এসে ঠেকেছে। তাই ভবিষ্যৎ প্রজন্ম স্বাভাবিকভাবে, প্রায় নিঃস্ব। ভিত নেই। মগজে রোমাঞ্চ নেই। সে শোনে, দেশের যে কোনও স্থাপত্যের নিচেই মন্দির খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে ইদানীং। যে-কারণে খননই হয়ে ওঠে একমাত্র ভিত্তি। মাটি খুঁড়তে খুঁড়তে, কলকাতা শহরের ভীষণ পুরনো কোনও বাড়ি ভাঙতে ভাঙতে, সে পৌঁছয় অন্ধকুয়োয়। তারপর শূন্য।

সংরক্ষণের যে বোধের কথা লিখেছিলাম, তা বোধহয় জারিত হয়নি আমাদের মস্তিষ্কে। অথচ, গ্রিস। ইতালি। স্পেন। ফ্রান্স। এহেন প্রথম বিশ্বের বহু দেশ, আগলে রেখেছে আপন ইতিহাস। যেমন, আয়ারল্যান্ডের ডাবলিন শহর। মেরিওন স্কোয়্যারের একটি বাড়িতে চোখ আটকে যায়। গ্রেগরিয়ান আমলের টাউনহাউস। অস্কার ওয়াইল্ডের শৈশব কেটেছিল যেখানে এবং যা ছিল উনিশ শতকের আয়ারল্যান্ডের অন্যতম সাংস্কৃতিক প্রাণকেন্দ্র। সেই টাউনহাউস হেরিটেজ তকমা পেয়েছে, স্বাভাবিক। কিন্তু যে বিষয়ে ফোকাস করছি, অস্কার ওয়াইল্ডের সেই বাড়ি, ক্রমে ক্রমে হয়ে উঠেছে আয়ারল্যান্ডের একটি পর্যটন ক্ষেত্র। ঐতিহাসিক মূল্য এবং অর্থমূল্য—উভয়ই কী চমৎকার সংরক্ষিত! মানুষের মনে চারিয়ে গেছে দুর্দান্ত এক সচেতনতা। সময়ের প্রতি। স্বজাতির প্রতি। সংরক্ষণের প্রতি।

ঘনঘোর অসময়ে বাঙালির বহুস্তরীয় ইতিহাসের রিভিশান প্রয়োজন ছিল, প্রয়োজন ছিল একটি সহজ প্রশ্নের: ঠিক কোন কোন প্যারামিটারে বাঙালি জাতি হিসেবে অনন্য? মৌলিক? আন্তর্জাতিক? সেই সবকিছুই হেরিটেজ ট্যাগ পেয়ে পেয়ে ক্ষয়ে যাচ্ছে।

এইবার নিজেদের পর্যবেক্ষণ করি? কলকাতা শহরেই, বিবাদী বাগ চত্বরে, বেঙ্গল বণ্ডেড ওয়্যারহাউস অ্যাসোসিয়েশানের একটি বাড়ি ভেঙে ফেলা হল। যে বাড়ির সঙ্গে প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুরের গভীর সংযোগ। যে বাড়ির আদল জ্বলজ্বল করছে অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আঁকা একটি ছবিতেও। অথচ, সরকারি ঘোষণায় বলা হয়েছিল, বিবাদী বাগ চত্বর বাঙালির নতুন হেরিটেজ-ঠিকানা! তেমনই বীরভূমের লাভপুরে, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্মভিটে প্রায় ধূলিসাৎ। অথচ এ-রাজ্যের হেরিটেজ সাইটের তালিকায় জ্বলজ্বল করছে। ভার্চুয়ালি। যা-কিছু ছুঁয়ে ছুঁয়ে অতীতে ফিরে যাওয়া সম্ভব ছিল, ঘনঘোর অসময়ে বাঙালির বহুস্তরীয় ইতিহাসের রিভিশান প্রয়োজন ছিল, প্রয়োজন ছিল একটি সহজ প্রশ্নের: ঠিক কোন কোন প্যারামিটারে বাঙালি জাতি হিসেবে অনন্য? মৌলিক? আন্তর্জাতিক? সেই সবকিছুই হেরিটেজ ট্যাগ পেয়ে পেয়ে ক্ষয়ে যাচ্ছে। শ্যাওলা জমছে সেই সব আত্মগরিমার পাঁচিলে। আমরা কালচারালালি খুব এলিট—এই একটা মাত্র বাক্যেই সর্বনাশ! দায়িত্ববোধে? ফক্কা।

অতএব, হ্যাঁচকা টান পড়েছে অস্তিত্বে। কেউ প্রশ্ন করতে পারেন, হেরিটেজ কি কেবল বিখ্যাত মানুষেরই প্রাপ্য? সাধারণের ইতিহাস কি এ-প্রসঙ্গেও অবহেলিত? না। সাধারণের ওপরে আজীবনের মতো দায়িত্ব বর্তেছে। হেরিটেজ বহনের। সমগ্র কলকাতা শহরেই আছে অগুনতি অট্টালিকা। বনস্পতির মতো। নির্মাণ করেছিলেন কোনও সাধারণ মানুষ। এহেন অট্টালিকা-সমূহই, অন্য শহরের তুলনায় কলকাতাকে করে তুলেছিল আরও নান্দনিক এবং অসাধারণ। বটগাছের ঝুরি ঘন হয়ে নেমেছে এখন। সামনে সাইনবোর্ড: বিপজ্জনক বাড়ি। নিয়তিও কি তাই?

এতক্ষণ যেটুকু পড়লেন, নেতিবাচক কথাই বেশি লেখা হল। আসলে উদ্দেশ্য একটিই, সরকার এবং আমজনতা—দুজনেরই শিরদাঁড়াটা ধরে একটু ঝাঁকিয়ে দেওয়া। ফাঁপা নস্টালজিয়ায় না ভুগে, হয়তো একটা অব্যর্থ মোচড়! বাঙালি হেরিটেজের কিয়দংশই অবশিষ্ট—সেটুকুই উপযুক্তভাবে সংরক্ষিত হোক। নইলে, প্রতিদিনই তো ইতিহাসের পুনর্নিমাণ হয়ে চলেছে মশাই!

আর তারই বিপরীতে, দাঁড়িয়ে আছে কিছু হেরিটেজ ওয়াক। সম্প্রতি, কলকাতা শহরেরই দুটি হেরিটেজ ওয়াকের কথা বলি। এক, ‘হেঁটে দেখা অ্যাংলো জীবন: বো ব্যারাক পেরিয়ে’। অন্যটি, ‘বিদ্রোহীর কলকাতা’। নজরুল ইসলামের সঙ্গে যে-সকল স্থান ওতপ্রোত জড়িয়ে। আয়োজনে, ‘কলকাতা ফুটনোটস’। সেই উদ্যোগের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত, প্রিয়ক মিত্র বলছেন, “বো ব্যারাকের যে অ্যাংলো পাড়া, সেখানে হেঁটে বেড়ালে, কলকাতা শহরের কসমোপলিটানিজমের পরতগুলো একটু একটু করে খুলে যায়। পাশাপাশি, একটি ডেমোগ্রাফিক ধারণাও জন্মায়। সেখান থেকেই আসলে তৈরি হয় ইতিহাসের প্রতি যত্নশীল হওয়ার বোধ। আমাদের দ্বিতীয় ওয়াকের উদাহরণ দিই। নজরুল ইসলাম ও মুজফফর আহমেদের যুগ্ম সম্পাদনায় একটি দৈনিক পত্রিকা প্রকাশিত হত। নাম, নবযুগ। সেই পত্রিকার দপ্তর ভেঙে ফ্ল্যাট উঠেছে। তাই বলে কি ইতিহাস বদলে যায়? আমরা সেই না-থাকাকেই ছুঁয়ে ছুঁয়ে নজরুল পর্যন্ত পৌঁছনোর চেষ্টা করেছি।” ‘ফুড ওয়াক’ কিংবা ‘ঘোস্ট ওয়াক’-এর মতো তরুণ প্রজন্ম কি হেরিটেজ ওয়াকে একইরকম আগ্রহী? প্রিয়ক মিত্র জানিয়েছেন, “আমাদের দুটো ওয়াকেই তরুণ প্রজন্মের প্রতিনিধিত্ব লক্ষণীয়। কলকাতাকে একটা অন্য চোখ দিয়ে দেখতে আগ্রহী তারা। হয়তো নিত্যদিনের যাতায়াতের মধ্যেই পড়ে রাসবিহারী অ্যাভিনিউ। ‘কবিতা ভবন’ অর্থাৎ বুদ্ধদেব বসুর বাড়িটিও নজরে পড়েছে, কিন্তু ঘেঁটে দেখা হয়নি কখনও। কারণ সে-বাড়ি ভগ্নস্তূপে পরিণত হয়েছে বর্তমানে। অথচ এ-ইতিহাস জানার পরে, তারা রোমাঞ্চিত হয়। সেখানে নবীন-প্রবীনের ভেদাভেদ নেই।”

একটি মজার উদাহরণ দিয়ে লেখাটি শেষ করি। আপনারা ২২১বি বেকার স্ট্রিট চেনেন নিশ্চয়ই? শার্লক হোমসের বাড়ি। আদ্যপান্ত কাল্পনিক চরিত্র। কাল্পনিক ঠিকানা। তবু সেখানে, প্রায় ২০০ বছর পুরনো একটি টাউনহাউসে গড়ে উঠেছে, ‘দ্য শার্লক হোমস মিউজিয়াম’। হুবহু আর্থার কোনান ডয়েলের বিবরণ অনুযায়ী। বাস্তবের ঠিকানা? উইকিপিডিয়া বলছে, ২৩৭ থেকে ২৪১ বেকার স্ট্রিটের মধ্যবর্তী কোনও এক অঞ্চল! অর্থাৎ, হেরিটেজের ধারণা বিশিষ্ট ব্যক্তি, সাধারণ মানুষ ছাপিয়ে কল্পনায় বিস্তৃত। আচ্ছা, ২১, রজনী সেন রোড, কলকাতা: ৭০০০২৯—আপনি কখনও হেঁটে দেখেছেন?

____________ 
মতামত লেখকের নিজস্ব

Developed by DXDasia