গবেষণার ধাঁচ এভাবে বদলে ফেলা দরকার

পাঠ প্রতিক্রিয়া : ঘাট গির্জা বন্দর ও অন্যান্য বিস্মৃতি

‘একটু শুনবেন স্যার? আচ্ছা মহাপ্রভু চৈতন্যদেব কি আমার চেয়েও লম্বা ছিলেন?’ ভরা বাজারে এই ছিল খ্যাপাটে মানুষটির প্রশ্ন। যাঁকে উদ্দেশ্য করে বলা সেই অধ্যাপক এবং চলচ্চিত্র বিশেষজ্ঞ মানুষটি অবশ্য তাকে অবজ্ঞা করলেন না। বাড়িতে বসে তাঁর কথা শুনলেন। শেষপর্যন্ত জানা গেল ভদ্রলোক চৈতন্য-জীবনী অনুসরণ করে নবদ্বীপ থেকে নীলাচল গেছেন তিনবার। যাওয়ার পথে চৈতন্যদেব যেখানে যেখানে বিশ্রাম নিয়েছিলেন সেখানেই তিনি বিশ্রাম নেন। কিন্তু চৈতন্যদেবের যতদিন লেগেছিল তার চেয়ে বেশি সময় লেগেছে তাঁর। তাই তাঁর প্রশ্ন চৈতন্যদেব কি তার চেয়ে লম্বা ছিলেন? কথাটা পৌঁছে ছিল সুকুমার সেনের কানে। ভদ্রলোককে প্রণাম করতে চেয়েছিলেন তিনি। তাঁকে সমস্ত ঘটনা তিনি লিপিবদ্ধ করে ফেলতে বলেন। সেই সঙ্গে সুকুমার সেনের শ্লেষ গবেষকদের নিয়ে – ‘ঘরকুনো সব। পথে বেরোয় না। মানুষের কাছে যায় না কেউ। খালি লাইব্রেরিতে বসে টোকে। সব হল টোকা পণ্ডিত। না না গবেষণার ধরনটা একেবারে বদলে ফেলা দরকার।’ এই মানুষটির নাম ভূপতিরঞ্জন দাস। কাছাকাছি একটি স্কুলের ইতিহাসের মাস্টারমশাই, ভ্রমণরসিক এবং আঞ্চলিক ইতিহাস সম্পর্কে আগ্রহী। (ঘাট গির্জা বন্দর ও অন্যান্য বিস্মৃতি)

এই গ্রন্থে এসেছে আদি গঙ্গার আদিকালের অনুসন্ধান, বিটি রোডের জন্ম ইতিহাস, কামারহাটি অঞ্চলের ইতিহাস, পরিচালক জ্য রেনোয়াঁর ছবি ‘দ্য রিভার’ সূত্রে স্থাপত্যের কালান্তরের বিভিন্ন চিত্র। বলা যায় সবক্ষেত্রেই ডকুমেন্টেশন নিখুঁত।

মাঝে মাঝেই ভাবি মাথার পোকা খানিক নড়ে বলেই এমন কয়েকজন আঞ্চলিক গবেষককে আমরা পাই যাঁদের ইতিহাস কদর দেয় না, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাধি দেয় না। কিন্তু অনেক বিস্মৃতির হাত থেকে তাঁরা আমাদের ইতিহাসকে রক্ষা করেন। ভূপতিবাবুর কথা আবার না হয় পরে আসবে। আপাতত যে বইটি হাতে নিয়ে এই কথাগুলি মাথায় এলো, তার কথা বলা যাক। সম্প্রতি ‘তবুও প্রয়াস’ প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হয়েছে তন্ময় ভট্টাচার্য রচিত একটি গবেষণা গ্রন্থ। ঘাট গির্জা বন্দর ও অন্যান্য বিস্মৃতি। তন্ময় ভট্টাচার্য মুখ্যত কবি এবং প্রধানত গবেষক। সম্পাদক হিসেবেও তিনি নজর কেড়েছেন আমাদের ছোটো পত্রিকার জগতে। আঞ্চলিক ইতিহাস নিয়ে তাঁর যে আগ্রহ আছে তার পরিচয় ইতিপূর্বে আমরা পেয়েছিলাম ‘বেলঘরিয়ার ইতিহাস সন্ধানে’ (২০১৬) নামক গ্রন্থের মাধ্যমে। কিন্তু সাত বছর পর যখন তিনি বাংলার কাব্য ও মানচিত্রে উত্তর ২৪ পরগনা ও হুগলি জেলার ‘গঙ্গা তীরবর্তী জনপদ’ ( ১৪৯৫-১৮৭৩) গ্রন্থটি রচনা করলেন, আমরা বুঝলাম এ তো কবি কবি নয় গবেষক নিশ্চয়। বুঝলাম তাঁকে আর আঞ্চলিক ইতিহাসকার হিসেবে কোনো ছোটো পরিসরে আটকে রাখা যাচ্ছে না। বিষয়টি আঞ্চলিক, দর্শনটি কবির কিন্তু চেতনাটি ইতিহাসের সুদূর গতিপথ লক্ষ্য করে এগিয়ে চলেছে। কোথাও পরিশ্রমের বিকল্প তিনি নেননি। আর তাই এই গ্রন্থটি প্রকাশের পর আমাদের গ্রন্থ-জগতে কোনো যে বিস্ফোরণ হলো না, সেই দীনতা আমাদের ছোটো করে দেয় প্রতিমুহূর্তে। হয়তো এই গ্রন্থটির মধ্যে লুকিয়ে ছিল আরেকটি গ্রন্থের সম্ভাবনা। তারই ফসল বর্তমান গ্রন্থটি। পূর্ববর্তী গবেষণাগ্রন্থের গর্ভ থেকে জন্ম নিয়েছে ‘ঘাট গির্জা বন্দর ও অন্যান্য বিস্মৃতি’র মতো গুরুত্বপূর্ণ গবেষণাগ্রন্থ। বিপুল নিষ্ঠায়, ফিল্ড ওয়ার্কের পাশাপাশি বিভিন্ন ম্যাপ ও দলিল পর্যালোচনা করে যে কাজটি তন্ময় করেছেন তার জন্য কোনো বাহবা যথেষ্ট নয়। শুধু বলবার কথা এই গ্রন্থ নীরস কোনো গবেষণা নয়, এই গ্রন্থ কাল্পনিক কোনো গল্পমেলার আনুমানিক আসর নয়। কিন্তু আশ্চর্য ভাষায় তন্ময় যে গ্রন্থটি রচনা করলেন তা প্রথম থেকে শেষপর্যন্ত স্বাদু এবং সহজাত। পাঠকের কৌতূহল প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত ধরে রাখতে পারে এমনই এর ভাষা। কৌতূহল নিরসনে তথ্যের কচকচানি গতিপথ রুদ্ধ করে না। বরং পাঠককেও এক অজানা ভ্রমণ পথের সঙ্গী করে নেয়। তাই এই বই ইতিহাসের পথে এক ভ্রামণিকের জীবন্ত দলিল মনে হয়। গবেষণা গ্রন্থের প্রধান অন্তরায় যে ভাষা, তথ্যের পুন:পৌনিক বিবৃতি তাকে সম্পূর্ণ এড়িয়ে তন্ময় যে গ্রন্থটি রচনা করেছেন তা আমাদের স্মৃতির সম্পদ। ইতিহাসের দলিল। বিস্মৃতির বিরুদ্ধে সোচ্চার পথযাত্রা। (ঘাট গির্জা বন্দর ও অন্যান্য বিস্মৃতি)

আলোচ্য গ্রন্থটিতে রয়েছে ছোটো-বড়ো ১২টি অধ্যায়। সঙ্গে মানচিত্রে গঙ্গা তীরবর্তী জনপদের একটি পরিশিষ্ট। ভূমিকার শুরুতেই গবেষণার সঙ্গে ‘পরিশ্রমলব্ধ’ শব্দটিকে যেভাবে তন্ময় জুড়ে দিয়েছেন তার কোনো অভাব দেখিনি এখানে। যখন লোক গবেষণার ক্ষেত্রে ক্ষেত্র সমীক্ষা একটি হাস্যকর বিষয় হয়ে উঠেছে, শুধু সংগ্রহের, নমুনা বিচারের কোনো মাপকাঠি নেই, তখন দেখছি তন্ময় বিভিন্ন অঞ্চল ঘুরে শুধু ক্ষেত্র থেকে তথ্য সংগ্রহ করছেন না, তাকে অভিলেখ্যাগারের দলিলের সঙ্গে, মানচিত্রের সঙ্গে, নিবিড় অনুসন্ধানের সঙ্গে যুক্ত করে দিচ্ছেন। ফলে আঞ্চলিক ইতিহাসের নড়বড়ে খাতটিতে তন্ময় একটি জোয়ার আনলেন, এই গ্রন্থ সূত্রে তা জোর গলায় বলা যায়। এখানে আলোচ্য মূলত উত্তর ২৪ পরগনা এবং হুগলি তীরবর্তী কয়েকটি জনপদ, ঘাট, গির্জা, বসতবাটি, জন্মভিটে, লুপ্ত নদী, এমনকি ব্যস্ত একটি সড়কের জন্ম ইতিহাস। উঠে এসেছে মিথ এবং পুঁথি অথবা মানচিত্র কিংবা স্মৃতিকথার সূত্রে। তন্ময় যথাস্থানে তাদের স্বীকৃতি দিয়েছেন। (ঘাট গির্জা বন্দর ও অন্যান্য বিস্মৃতি)

শুরু হচ্ছে বালি সিপ্লেন বেস দিয়ে। দমদম বিমানবন্দরের পাশাপাশি কলকাতার উত্তরে বালিতে এক সময় গড়ে উঠেছিল সিপ্লেন বেস। যেখানে গঙ্গা বক্ষে বিমান অবতরণ করতো একদা। যা একসঙ্গে আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ব্যবস্থারও অন্যতম সংযোগসূত্র হয়ে উঠেছিল। বিভিন্ন নামের পাশাপাশি জলবিমান ঘাঁটি কথাটিও ছিল প্রচলিত এর সম্পর্কে। দক্ষিণেশ্বরের দেউলপোতা নিয়ে একটি চমৎকার নিবন্ধ রয়েছে। যেখানে চারপাশে উঁচু টিপি এবং কথিত মাটির নিচে লুকিয়ে আছে প্রাচীন প্রাসাদ, মন্দির। সেই মিথের সম্ভাবনাটিকেই যথাযথ ইতিহাসের সাহায্যে তন্ময় তুলে ধরেছেন। কোনো অলৌকিক কল্পনার হাত ধরেননি। তৃতীয় নিবন্ধটি আগরপাড়া মিশন কেন্দ্রিক। আঞ্চলিক ইতিহাস যে কত গভীরে চর্চার বিষয় হতে পারে তার একটি নিদর্শন সপ্তম নিবন্ধ পলতা ঘাট। যেভাবে এই ঘাটটিকে তন্ময় ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত করে দেখেছেন, তা এক আশ্চর্য দলিল। এছাড়াও এই গ্রন্থে এসেছে আদি গঙ্গার আদিকালের অনুসন্ধান, বিটি রোডের জন্ম ইতিহাস, কামারহাটি অঞ্চলের ইতিহাস, পরিচালক জ্য রেনোয়াঁর ছবি ‘দ্য রিভার’ সূত্রে স্থাপত্যের কালান্তরের বিভিন্ন চিত্র। বলা যায় সবক্ষেত্রেই ডকুমেন্টেশন নিখুঁত। ভৌগোলিক দিক থেকে যতদূর গণনা করা যায় তার সাহায্য নিয়েছেন লেখক। প্রয়োজনে আদি ও বর্তমান ছবি, বিভিন্ন ম্যাপ, নদীর গতিপথ, দলিল দস্তাবেজ, প্রত্নমূর্তি, আদালতের মামলার খসড়া, নানা পুরনো চিত্র, পুরনো সংবাদপত্রের অজস্র কাটিং সবই গ্রন্থিত হয়েছে নিখুঁতভাবে। কোথাও ফাঁকি নেই, ফাঁকটুকু যা আছে তা বিস্মৃতির। সেখানেও তন্ময় যথাযথ ভাবনার ডানা বিস্তার করেছেন। (ঘাট গির্জা বন্দর ও অন্যান্য বিস্মৃতি)

এই গ্রন্থনামের সবচেয়ে জরুরি শব্দ সম্ভবত ‘বিস্মৃতি’। শুধু বাঙালির ইতিহাস বিস্মৃতি নয়, স্মৃতির মর্যাদার প্রতি প্রবল অনীহা কত পথ যে রুদ্ধ করে দিয়েছে তা টের পাওয়া যায় এই বই পড়লে। লুপ্ত হতে হতে কোথাও নেই, কোথাও স্মৃতির ভগ্নাংশ হয়ে রয়েছে বইয়ের পাতায় বা দলিলে। সবচেয়ে বড়ো জয় এখানে তিনি সেই জায়গাগুলির সম্ভাব্য অবস্থান পায়ে হেঁটে চিহ্নিত করেছেন। অনুমান নয় বরং নির্ভরযোগ্য তথ্য বিশ্লেষণের পথ ধরেই তা খুঁজে পেয়েছেন। আঞ্চলিক ইতিহাসের গবেষণা মূলত যেখানে থেমে যায়, তথ্য বা পরিশ্রমের অভাবে, অর্থের আনুকূল্যের অভাবে তন্ময় এখানে তার কোনো ঘাটতি রাখেননি। ইতিহাসের যত রকম সম্ভাবনা নকশা দলিল এমনকি সংবাদপত্রের চিঠি থেকে প্রয়োজনীয় স্মৃতিচিহ্নটি তুলে নিয়েছেন। তাই নিমতায় সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের মাতুলালয়ের ভিটেটির কোনো খোঁজ না পেলেও সামান্য টুকরো অংশ আর ফলক থেকে খুঁজে পান সেই অবস্থান। সপ্তদশ অষ্টাদশ শতকের মানুষ কবি কৃষ্ণরাম দাস যিনি কালিকামঙ্গল, ষষ্ঠীমঙ্গল, রায়মঙ্গল কাব্য লিখেছিলেন তাঁর জন্মভিটে তন্ময় খুঁজে বার করার চেষ্টা করেছেন। কিছু পেলেন না অবশ্য। তবু পাঁচিলের ভগ্নাংশ, আর পুকুরের চিহ্ন নিয়ে একটি অবস্থান খুঁজে পাওয়া গেল।

বিস্তৃতির অতলে তলিয়ে গেছে আরেকটি জনপদ যার নাম কুচনান। মুকুন্দ চক্রবর্তী রচিত চন্ডীমঙ্গলে ধনপতি সদাগরের যাত্রা প্রসঙ্গে এসেছে কুচিনান নামে স্থানটির কথা। বোঝা যায় ষোড়শ শতকের শেষের দিকে চিৎপুর ও কলকাতার মধ্যবর্তী গঙ্গার পূর্ব পাড়ের একটি স্থান কুচিনান বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল। হাট বসত। লোকের আনাগোনায় সরগরম ছিল। পলাশীর যুদ্ধের পর মীরজাফরের কাছ থেকে কলকাতার বাইরের ১৫টি ডিহির জমিদারী লাভ করে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। সেই ১৫টি ডিহির মধ্যে ছিল ৫৫টি গ্রাম। ডিহি শুঁড়ার অন্তর্ভুক্ত চারটি গ্রাম- শুঁড়া, কাঁকুড়গাছি, কুচিনান ও দত্তাবাদ। ষোড়শ শতকে কাঁকুড়গাছি কুচিনান অঞ্চলটি যৌথভাবে কুচিনান নামে পরিচিত বলে তন্ময় অনুমান করেছেন। বাংলার কাব্যগুলিতে যাত্রাপথ প্রসঙ্গে সাধারণত নদীকেন্দ্রিক জনপদের নামই উঠে এসেছে, একমাত্র ব্যতিক্রম কুচিনান। এই গ্রন্থে সবচেয়ে আশ্চর্য করে কক্সের বাংলো লেখাটি। বর্তমানে যার কোনো চিহ্ন আর নেই। কামারহাটির গ্রাহাম রোড যেখানে বিটি রোডে এসে মিশেছে তার ঠিক বিপরীতেই ছিল কক্সের বাংলো। বর্তমান ভৌগোলিক অবস্থান সাগর দত্ত হাসপাতালের প্রায় উল্টোদিকে। আঠারো শতকের শেষের দিকে কক্সের বাংলোর ব্যবহার শুরু হয়। এর মূল পরিচয় ছিল আস্তাবল সরাইখানা হিসেবে। কলকাতা থেকে দীর্ঘ রাস্তা বি টি রোড ধরে যাওয়ার পথে যাত্রীরা ঘোড়া বদল করতেন এখানে। ছিল রিলে পদ্ধতিতে ঘোড়া পরিবর্তনের রীতি। কলকাতা থেকে কক্সের বাংলো যাওয়ার জন্য ঘোড়া এবং বগি ভাড়া বাবদ দৈনিক ৫ টাকা খরচ, সেই সঙ্গে প্রাতঃরাশ ও রাতের খাবার ধরলে ১২ টাকা। তৎকালে শিকার ছিল সাহেবদের অন্যতম বিনোদন। সাহেবরা সঙ্গীসাথী শিকারি কুকুর নিয়ে কক্সের বাংলোতেই অবস্থান করতেন। প্রচুর শিয়াল সাহেবদের বন্দুকের লক্ষ্য হয়ে উঠতো। এছাড়াও ইংরেজ সৈন্যরা মাঝে মাঝে কক্সের বাংলোতে হাজির হতেন। তবে আরেকটি কারণে কক্সের বাংলোর সঙ্গে ইতিহাসের যোগ আছে। ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহের পরবর্তী ঘটনা প্রবাহের সঙ্গে যোগ পাওয়া যায় তার। সে বছর মার্চ মাসে মঙ্গল পাণ্ডে যখন বিদ্রোহ ঘোষণা করেন, সিপাহীরা যাতে কলকাতায় প্রবেশ করতে না পারে তাই কক্সের বাংলোয় অবস্থান করেছিল ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর তোপশ্রেণী। সময়ের নিয়ম শাসকের ক্ষমতার চিহ্ন এই বাংলোটি নিশ্চিহ্ন হয়েছে।

একটি বিস্মৃত নদী সোনাই-এর কথা বলেছেন তন্ময় সর্বাপেক্ষা দীর্ঘ প্রবন্ধে। বলা বাহুল্য শুধু এই লেখাটিকেই একটি স্বতন্ত্র গবেষণাপত্র হিসেবে উল্লেখ করা চলে। লেখক লক্ষ্যের কাছাকাছি এসে দেখছেন নদীর চিহ্ন নেই। স্থানীয় এক বাসিন্দা জানালেন তিনি যেখানে দাঁড়িয়ে আছেন কিংবা পাশে যে মাঠ এটাই সেই নদী। এখান থেকেই বয়ে যেত সোনাই নদী। বারাকপুর মহাকুমার শিউলি – তেলিনীপাড়া গ্রাম। এখানেই বর্তির বিল থেকে বেরিয়েছে সোনাই নদী। এই নদীর মোহনা আপার বাগজোলা খাল। প্রায় ৩৫ কিলোমিটার দীর্ঘ পথে ১৭টি মৌজা পড়ে যা দমদম পর্যন্ত বিস্তৃত। এককালের যাতায়াত বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান পথ ছিল সোনাই। যার পোশাকি নাম সুবর্ণবতী বা স্বর্ণবতী। এর সঙ্গে সমান্তরালভাবে উচ্চারণ করা হয় যে নদীর নাম, তার নাম লাবণ্যবতী ওরফে নোয়াই। এই নদীর উৎসও বর্তির বিল থেকে মোহনা বিদ্যাধরী। এককালে পাশাপাশি বইত এই দুটি নদী। জলধারা হারিয়ে আজ খালে পরিণত তবু তার জলধারাটি সামান্য হলেও আছে। সোনাইয়ের সেটুকু চিহ্ন নেই। এখানে এসে পড়ে আরেকটি নদীর কথা। সন্ধ্যামতী বা সূক্ষ্মবতী (সুঁতি নদী)। এর উৎস নদিয়া জেলার যমুনা থেকে এবং তারপর দক্ষিণবাহিনী হয়ে বর্তির বিলে প্রবেশ করেছে এবং অবশেষে মিলেছে নোয়াইয়ের সঙ্গে। সামান্য হলেও সুঁতি নদীর অবস্থান এখনও আছে।

বাংলা বইয়ের ক্ষেত্রে অজস্র ছোটো প্রকাশনী দায়িত্ব নিয়ে আঞ্চলিক গবেষকদের লেখা ছাপছেন এবং পাঠক সমাদর করছেন। এই মুহূর্তে বাংলা ভাষায় যাবতীয় গবেষণার শ্রেষ্ঠ কাজগুলি করছেন স্বাধীন গবেষকেরা এ বিষয়ে সন্দেহ নেই।

তন্ময় সোনাই নদী নিয়ে এরপর বিস্তৃত গবেষণা করেছেন। পরবর্তীতে সোনাই নদী আবার আলোচনায় উঠে আসে পরিবেশ সংক্রান্ত একটি আন্দোলনকে কেন্দ্র করে। মামলা গড়ায় আদালতে। কিন্তু তা উপন্যাসের জন্ম দিলেও নদীর স্বাস্থ্যের কোনো উন্নতি হয়নি। কেন সোনাই নদী বিস্মৃত হলো, কেনই বা তার মৃত্যু হলো, তার অনেকগুলি কারণ নানা চিঠিপত্রে যেমন জানা যায়, তেমনি তন্ময় মনে করেন ১৭৩৭ সালের বিধ্বংসী সাইক্লোন ও ভূমিকম্প সোনাই নদীর মজে আসার কারণ। তবে ১৭২৬ সালের মানচিত্রে সোনাই নদীর আংশিক অস্তিত্ব দেখা গেলেও, ১৭৬৪ সালে সোনাই অনুপস্থিত। কিন্তু নোয়াইয়ের গতিপথ স্পষ্ট। ১৯২১ খ্রিস্টাব্দে ‘কুশদহ’ পত্রিকায় প্রকাশিত একটি সংবাদ থেকে জানা যায় নোয়াই ও সুঁতি নদী মজে আসছে এবং সরকার থেকে সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। সেখানেও সোনাই নদীর উল্লেখ নেই। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের ফ্লাড ইনকোয়ারি কমিটি ১৯৬৯ সালের রিপোর্টে জানাচ্ছে ‘The Sonai Khal is completely dead’. তন্ময় অবশ্য বলেননি আরেকজনের কথা। তিনি দীন মহম্মদ। ১৭৯৪ সালে আয়ারল্যান্ডের কর্ক থেকে প্রকাশিত হয় দীন মহম্মদের ভারত ভ্রমণ নামে বইটি। প্রথম পাতায় বইটির নাম লেখা ছিল ‘দ্য ট্রাভেলস অফ দীন মহম্মদ’। মিস্টার বেকারের তত্ত্বাবধানে কোম্পানির একজন সেপাই থেকে পরবর্তীতে কোম্পানির সৈন্য দলের একজন গুরুত্বপূর্ণ মানুষ ছিলেন দীন মহম্মদ। এটিই ভারতীয় লিখিত প্রথম ইংরেজি ভাষায় প্রকাশিত গ্রন্থ। এখানে কলকাতা থেকে পাটনা বারানসী ঢাকা অন্তত দশ বছরের নদী যাত্রাপথ, মানুষের জীবন উঠে এসেছে। শ্রীরামপুর চুঁচুড়া এমনকি বর্তি বিল সংলগ্ন কাউগাছি অঞ্চলটিকে চিহ্নিত করেছিলেন দীন মহম্মদ। গড় শ্যামনগরের কথাও আছে। সম্ভবত নদীটি অনুমান করা যায় নোয়াই। এছাড়াও একজন আঞ্চলিক গবেষক নিকুঞ্জবিহারী ভৌমিক মূলাজোড়, আতপুর গঙ্গার তীরবর্তী অঞ্চল নিয়ে গবেষণা করেছিলেন এবং নিজের বই নিজের পয়সায় ছাপিয়ে বিলি করেছিলেন, কিন্তু প্রতিষ্ঠা পাননি।

আজ থেকে কুড়ি বছর আগে শ্যামনগর অঞ্চলের একটি স্কুলের একদল ছাত্র-ছাত্রী বর্তি বিল সংলগ্ন সোনাই নদীর উৎস সন্ধান নিয়ে কাজ করেন। তখনও যে পরিমাণ আঞ্চলিক তথ্য হাতে মজুদ ছিল আজ আর তা নেই। নব্বই দশকে দীর্ঘদিন এই অঞ্চলে আমি নিজে উপস্থিত থেকে নদীর যে অস্তিত্ব টের পেয়েছি আজ তার কোনো লক্ষণ নেই। গত ১৫ বছরে খুব দ্রুত বদলে গেছে অঞ্চলের ভূগোল। সিন্ডিকেট, প্রোমোটার, দালাল রাজ, অবৈধ নির্মাণ, রাজনৈতিক দুর্নীতি আর কিছু অবশিষ্ট রাখেনি। এই আক্ষেপ, এই সতর্কতা তন্ময় বারবার উচ্চারণ করেছেন কোনো কাজ হবে না জেনেই। শুধু আজ অবস্থা কিছুটা বদলেছে আঞ্চলিক ইতিহাস প্রকাশনার ক্ষেত্রে। অন্তত বাংলা বইয়ের ক্ষেত্রে অজস্র ছোটো প্রকাশনী দায়িত্ব নিয়ে আঞ্চলিক গবেষকদের লেখা ছাপছেন এবং পাঠক সমাদর করছেন। এই মুহূর্তে বাংলা ভাষায় যাবতীয় গবেষণার শ্রেষ্ঠ কাজগুলি করছেন স্বাধীন গবেষকেরা এ বিষয়ে সন্দেহ নেই।

কথা প্রসঙ্গে আবার ফিরে আসি আঞ্চলিক গবেষক ভূপতিরঞ্জন দাসের কথায়। পুরনো নথি থেকে তিনি হালিশহরের পূবের সীমা ধরতে পারছেন না। দক্ষিণে নবরায়ের খাল বা নোয়াই। পশ্চিমে গঙ্গা উত্তরে যমুনার মরা খাত। হালিশহরের একটি ম্যাপ আঁকতে পূর্ব দিকের সীমানা জানা দরকার। আবার পূব দিক বরাবর মাইলের পর মাইল হাঁটা শুরু হল সেই দু’জন মানুষের। দেখা মিলল নাবাল জমির। তারপর এক বৃদ্ধের বাড়িতে পৌঁছানো গেল। প্রয়োজনীয় কথার পর দেখা গেল একটি মাচা যেখানে নৌকোর সরঞ্জাম বৈঠা গলুইয়ের ভাঙা টুকরো। জানা গেল ভদ্রলোকের দাদাসাহেবের দাদাসাহেবরা নৌকায় যাতায়াত করতেন। মানে ছপুরুষ আগে। অর্থাৎ নদী ছিল। সে হলো সুঁতি নদী যার বুক ধরে এতক্ষণ হেঁটে আসা হলো। এখন বিস্তীর্ণ জমি। নদীর চিহ্ন নেই। এত বড়ো নদী হারিয়ে গেল? জানা গেল হালিশহরের পূর্ব পার উখরা পরগনার সুঁতি নদী। আরও কিছুক্ষণ হাঁটার পর আরেকজনের বাড়ি পৌঁছে তাঁদের চোখ গেল একটি লাউয়ের মাচায়। সেখানে একটি দীর্ঘ কুমিরের কঙ্কাল। নানা সময় জমিতে উঠে আসা কুমিরের টুকরো টুকরো জোড়া দিয়ে এই অবয়বটি তৈরি। নদী থাকলে কুমির তো থাকবেই। মিলল হাতে কলমে প্রমাণ। ইতোমধ্যে ভূপতিবাবু গেছেন হরিণঘাটায় সরকারের রিভার রিসার্চ ইনস্টিটিউটে। ভূতলের জলবিন্যাসের ম্যাপ থেকে পাওয়া গেল নদীর অন্তঃসলিলা প্রবাহ। ওরা বলেছেন ‘ও নদী দক্ষিণে মাতলায় পড়তো আর বর্তি বিল সত্যিই ওই মজে যাওয়া নদী থেকে জন্মেছে।’

আজ বিদ্যায়নিক পরিসরে গবেষণার নামে উঞ্ছবৃত্তি, স্তাবকতা, কত গোপন চুক্তি অবৈধ সম্পর্ক, দালালি চলেছে। স্বাধীন গবেষণার কোনো মূল্য নেই। এখনও কি বিশ্ববিদ্যালয় চুপ করে থাকবে! তারা কি নির্ধারিত গবেষণার বাইরে এই সব স্বাধীন গবেষণাকে স্বীকৃতি দেবেন না? মধ্যমেধা, রাশি রাশি আবর্জনার ঠিকাদার হিসেবে যারা কুক্ষিগত করে রাখে, তারা হয়তো স্বাধীন গবেষকদের মেধার মর্যাদা দেবেন না। কিন্তু ইতিহাস ও গবেষণার হিসেব এবার বদলে ফেলা দরকার। যেমন বলেছিলেন সুকুমার সেন, এবার গবেষণার ধরনটা বদলে ফেলা দরকার। তন্ময়ের মত স্বাধীন গবেষকেরা উত্তরসূরী হিসেবে সেই দায়বদ্ধতা ও গভীর সম্ভাবনা চাক্ষুষ দেখিয়ে দিলেন। এই সুযোগে মনে হল, সুকুমার সেন যেমনটি চেয়েছিলেন ভূপতিবাবুর ক্ষেত্রে, সমবেত উদাসীনতা ও বিস্মৃতি পেরিয়ে আমিও কি অগ্রজের প্রণাম জানাতে পারি?

____________ 
গ্রন্থ: ঘাট, গির্জা, বন্দর ও অন্যান্য বিস্মৃতি | লেখক ও গবেষক: তন্ময় ভট্টাচার্য | প্রকাশক: তবুও প্রয়াস | প্রথম প্রকাশ: জানুয়ারি ২০২৬ | মুদ্রিত মূল্য: ৫৫০ টাকা

Developed by DXDasia